রম্য গল্প : “মশা”

গ্রীষ্ম শেষে বর্ষাকালের আগমন। চারিদিকে সকল শুকনো আবর্জনা পচনধরা শুরু হইলো। বৃষ্টির জলে ভরে গেল পড়ে থাকা পরিত্যক্ত ঘটি-বাটি।আর চারিদিকে উৎপত্তি হইলো ঝাঁক-ঝাঁক সঙ্গীত শিল্পীর। কিন্তুু তাহারা আমার জন্য শত্রু হইলো-তাহা আমি বিন্দুমাত্র বুঝিতে পারিলাম না।

একদিন শয়ন গৃহে বসে পড়িতেছিলাম। কিন্তুু নিদ্রা দেবী আমাকে বস করিলেন। টেবিলে বসে ঘুমাইতেছিলাম। সেই ঘুমটা হটাৎ ভেঙে গেল। শুনিতে পাইলাম কয়েকটি মশার গানের গলা। আহা..কি বাহারি সেই সুর! নয়ন খুলিতেই দেখিতে পাই, কমপক্ষে আটটি থেকে দশটি মশা আমাকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকার পথে ঘুরিতেছে। আরো দেখিলাম তিন থেকে চারটি মশা আমার বইয়ের পাতার উপর বসিয়া আছে।

আমি ডান হাত দিয়ে মশাদের উপর আঘাত করিতে যাওয়ার সময় ঘটিল এক আশ্চর্য কান্ড! যখনি আঘাত করিব,তখনই একটি মশা আমার কানের নিকট আসিয়া বলিলো- জনাব, একি করছেন? আমাদের মহারাজ বই পড়ায় ব্যস্ত যে! তাছাড়া আপনি শুনে খুশি হবেন যে- আপনি যা পড়িতেছেন, মহারাজ তা আনন্দের সহিত বিনা খরচে আপনাকে, প্র্যাকটিক্যালি দেখিয়ে দিবেন। শুনিবা মাত্র না বুঝে আমার মন আনন্দে ভরিয়া উঠিল। পুলকিত মনে নয়ন বড় করিয়া দেখিলাম আমি, “মানবদেহে ম্যালেরিয়ার জীবন চক্র” অংশটুকু পড়িতেছিলাম! মুহূর্তের মধ্যে জীবনে সংশয় দেখা দিতেছিল। আমি তখনই সেই সৈন্য মশাকে বলিলাম- হে মশাব্য, তব বাক্য ইচ্ছে মরিবারে। ছাড় কান, মারিবো তোমাদের। সাথে সাথে মশাদের বধ করিলাম। যাক বাবা প্রাণ রক্ষা হইল। আপাতত এখন আমি মশা মুক্ত।

দিনকয়েক ভালোই যাইতেছিল। অর্থাৎ সেদিনের পর হইতে শয়নগৃহের চারপাশেও মশার চিহ্ন নেই। বিষয়টি ভালো লাগিবার পূর্বে পুনরায় আরেকটি ঘটনা ঘটিলো। একটি মশা আমার সম্মুখে উপস্থিত হইল। বলিল,ক্ষমা করুন জনাব! আপনার আদেশ ছাড়াই আমি এখানে এসেছি। কিন্তু আমি বাদ্য হয়ে এসেছি। নয়নটা একটু বাকা করিয়া বলিলাম- তা আসার কারণটা কি? উত্তরে বলিল, জনাব আপনি আমাদের মহারাজকে হত্যা করার পর হইতে আজ পর্যন্ত আমাদের মহারানী কিছুই খাননি। না খেতে খেতে উনার শরীর এখন বড্ড খারাপ। ডাক্তার বলিলেন রক্ত শূন্যতা। মহারানীর রক্তের গ্রুপ যা আপনার সাথে মিলে যায়। মহল্লার বাকি ঘর-বাড়িতে আমরা মরার কৌশল পাতানো থাকায় রক্ত সরবরাহ করিতে পারিতেছিনা। দয়া করে আপনার শরীর হইতে যদি একটু রক্ত দিতেন, তাহলে মহারানীকে বাঁচানো যেত!

তাহাদের আর্যি শুনিয়া আমার মন বিচলিত হইয়া গেলো। কিন্তু মনকে শক্ত করিলাম এবং ভাবিলাম, এই মোক্ষম সময়- বংশবিস্তারের মূল উৎসকে যদি নাশ করে ফেলি তাহলে তো…..হুম।।

তখন কন্ঠকে সুমার্জিত করিয়া বলিলাম, যাও তোমাদের মহারানী ও বাকি সকলকে নিয়ে এসো। আমি রক্ত দিতে প্রস্তুত। তাহারা আমাকে বিশ্বাস করিয়া, আমার জয়ধ্বনি দিতে দিতে চলিয়া গেল। আমি সেই সুযোগে ঘরের কোণে কোণে কয়েল জ্বলে রাখিলাম। যখনি তারা আসিল..তখন থেকেই শুরু হইলো বাঁচাও, বাঁচাও চিৎকার। অবশেষে সবারি মৃত্যু হইলো।

যাইহোক মাসখানেক সুখে সাচ্ছন্দ্যে চলিয়া গেল। কিন্তু সেই সুখ কপালে থাকিলো না। কেন জানি মশা নিয়ে গবেষণা আমার দিন দিন যেন বাড়িতে লাগিলো। সেদিন জানালার ফাঁক দিয়ে দেখিলাম, ফুল গাছের টবে অনেক মশার আনাগোনা আর উড়াউড়ি। জীবন বুঝি বিষময় হইয়া উঠিল। তখনই আমি সহ্য করিতে না পারিয়া আক্রমণ করিতে গেলাম। সেখানে একটি মশা বিপদ আসিতেছে জেনে চিৎকার করিতে লাগিলো, বাঁচাও, বাঁচাও…এলিয়েন, এলিয়েন। শুনামাত্র সবাই পলায়ন করিল, কিন্তু বেচারা আমার হাতে আটকা পড়িল। তখন তাকে বলিলাম, তুমি বেশ জ্ঞানী বটে, কিন্তু শক্তিশালি নও। তখন মশাটি মাথা নিচু করিয়া বলিল, আমাকে ছেড়েদিন স্যার! প্লিজ স্যার! আপনিতো দয়ালু স্যার…প্লিজ স্যার। তখন তাকে একটু ব্যাঙ্গ করিয়া বলিলাম,  তা বাচা-তুমি এখন কি করো? মশাটি ভয়ে ভয়ে বলিল, আমি ডেঙ্গু নিয়ে অনার্স করিতেছি স্যার। উত্তর শুনিয়া অবাক হইলাম! তাই একটু রসিকতার সহিত জিজ্ঞেস করিলাম, তা জীবন সঙ্গী কি আছে বাচা? মৃদুস্বরে মশাটি বলিল, আজ্ঞে হ্যা। এইতো দুদিন পরে আমার বিয়ে। আমার অনেক স্বপ্ন। দয়া করে আমাকে মৃত্যুদন্ড দিবেন না স্যার! আমি কথা দিচ্ছি আমরা আপনাকে কখনই কামড় দিতে আসিব না।

অতঃপর, সবকিছু ভেবে তার প্রতি দয়া হইল। বলিলাম, ঠিক আছে। তবে তোমরা চিরদিনের জন্য আমার গৃহ হইতে চলিয়া যাইতে হবে। অন্যথা বদ করিতে আমি দ্বিধাবোধ করিব না। তারপর মশাটি আমাকে সম্মান জানিয়ে প্রস্থান করিল, আর যাওয়ার পূর্বে বলিয়া গেল- ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে আপনার গৃহের চারপাশ সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন এবং সুস্থ জীবন যাপন করুণ।

লেখকঃ পিনাক দাস
সিলেট।

 

ডেইলিরূপান্তর/আরএ/ডি.

  • 159
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ