দু:সময়ের বন্দীদশা-এক

বাংলাদেশে রীতিমত এখন দু:সময় চলছে। এসময়ে গোটা বাংলাদেশ বন্দীকাল অতিক্রম করছে। সারাদেশের জনগণ ভোট দিয়ে সরকার গঠন করে দেয়। প্রতিবারই রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে জনগণকে ঠকে। তারা সরকারী চাকুরীজীবিদের বেতন বাড়ায়, বোনাস দেয়, রেশন দেয়। শুধু তাই নয় দুর্নীতির সুযোগও করে দেয়। আর সরকারী চাকরদের বাইরের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য বরাবর থাকে ঘোড়ার ডিম। রাজনীতি এখানে পঙ্গু হয়ে যায়।

আপনি হয়ত বলবেন, সরকার তো উন্নয়ন করে। এই সেই কতকিছু। রাস্তা উন্নয়ন হলে রাস্তা দিয়ে বোধ হয় সরকারী চাকরিজীবী কিংবা মন্ত্রী -মিনিস্টার যান না। যায় শুধু আম পাবলিক।

করোনায় বিশাল এক দরিদ্র মানবগোষ্ঠী ইতোমধ্যে সৃষ্টি করে ফেলেছে।করোনার নেতিবাচক প্রভাবে এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। সম্প্রতি ‘দ্য পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার’ এবং ‘ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের’ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশে ৩ কোটি ২৪ লাখ লোক নতুন করে দরিদ্র হয়েছে।

আমাদের দেশের অর্থনীতি ব্যবস্থায় লুটপাট চলে। ধনী আরো ধনী হয়। গরীব আরো গরীব হয়। নাগরিক মৌলিক অধিকার বরাবর ক্ষুন্ন হয়। আমাদের দেশে জ্বালানী তেলের দাম বেড়েছে।অথচ পাশের দেশ ভারতে কমেছে। আমরা সরল অংক বুঝি। জটিল সমীকরণ বুঝি না। জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট ডাকল। সরকার ক্ষমতায় থাকতে পরিবহন ভাড়া বাড়িয়ে দিল তার চেয়ে বেশি।সাথে পেট্রোল চালিত গাড়ীগুলোও যাতায়াত ভাড়া বাড়াতে লাগলো।এ যেন হরিলুটের কারবার। ক্ষতির সম্মুখীন হল জনগণ।তাহলে জনস্বার্থ কোনটি। সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে বার বার জনগণকে বলির পাঁঠা দেয় রাজনৈতিক সরকারগুলো।

আমাদের বিচার বিভাগ পকেট চোরদের বিচার করে। পুলিশও পকেট চোরদের পিটায়। কিন্তু যারা লুটপাট করে বড় চেয়ারে বসে এদের কিছু হয় না। পুলিশ ফোর্স কে ক্ষমতা দিয়ে প্রত্যেক বড় কর্তার কর্মঘন্টার সময় নজরদারি রাখতে হবে। একবার পিয়াজ, একবার খাবার তেল, একবার সবজি, একবার চাল,একবার জ্বালানী তেল আরও কতকিছু লাফিয়ে বাড়ছে তার ইয়ত্তা নেই।দাম বেড়েছে ডিজেলের। কিন্তু পেট্রোল ও সিএনজি চালিত বাস- মিনিবাসও ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। কে দেখবে এসব?

এক দশকের মধ্যে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও জানিয়েছে, গত বছর বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বেড়েছিল শতকরা ৩০ ভাগেরও বেশি। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটি বিশ্বের খাদ্যশস্য ও ভেজিটেবল অয়েলের মূল্যকে তুলে ধরেছে। অক্টোবরে বিশ্ব বাজারে ভেজিটেবিল অয়েলের দর প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। সরবরাহে বাধা, কারখানা বন্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো কারণে বেড়েছে মূল্য বলছে এফওএ। খাদ্য সূচকে দাম বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে গম। কানাডা, রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন কম হওয়ায় গত ১২ মাসে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে গমের দাম।

বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লাকী আক্তার তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, তেলের দামও তারা বাড়িয়েছে। আবার একটা নাটুকে ধর্মঘট করে, জনগণকে ভোগান্তি দিয়ে, সিন্ডিকেট করে তারাই আবার ভাড়া বাড়িয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে। আপনারা কি মনে করেছেন , এর ফলে শুধু পরিবহনের ভাড়া বেড়ে গেল? নিশ্চয়ই না, পত্রিকা মারফত জানলাম, ইতিমধ্যেই চালের দাম বাড়ার ইংগিত দিয়েছেন রাইস এজেন্সির লোকেরা। ঘটনা খুব পরিষ্কার , ট্রাকের ভাড়া বেড়ে গেছে। মানে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারের উপর এর স্পষ্টতই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সংসার চালানোতে আরও হিমশিম খেতে হবে সাধারণ মানুষকে। মৌলিক চাহিদা পুরণে আবারও কাটছাঁট করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

কৃষকের অবস্থা তো আরও বেশি শোচনীয় । কেননা কৃষকদের কৃষি উৎপাদনের একটা বড় খরচ হল সেচ কাজ। সেচের জন্য ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পণ্য পরিবহনের খরচও বেঁড়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই।বিদ্যুতের উপরও প্রভাব পড়বে। আর আমরা যারা আপামর ভোক্তা আমাদের উপর অতিরিক্ত একটা চাপ তৈরি হয়ে গেলো কারণ সাধারণ মানুষের বেতন বা মজুরি কোনটাই তো বাড়েনাই। আর করোনা তো গরিবকে আরও হতদরিদ্র করে ফেলেছে।

এগুলো স্রেফ জুলুম। এই জুলুমের বিরুদ্ধে আপনি প্রতিবাদ করবেন নাকি মেনে নিয়ে আরও জুলুমের পথ করে দিবেন সে প্রশ্নটাই রাখলাম। জনগণের উপর এই জুলুমের বিরুদ্ধে সকলকেই, নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রতিবাদ করা দরকার।

দাম কমাও , জান বাঁচাও।

এখন নিশ্চয়ই সকলে পরিস্কার যে, তেলের দাম কমানোর জন্য এই ধর্মঘট ছিলোনা, এটা ছিলো বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে। খবরে পড়লাম, নতুন সমন্বিত ভাড়া অনুযায়ী, দূরপাল্লার বর্তমান বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি যাত্রীকে বাড়তি ৩৮ পয়সা গুনতে হবে। এছাড়া বড় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা, মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া মহানগরে বাসের বর্তমান ভাড়া কিলোমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা, সেটা ২ টাকা ১৫ পয়সা করা হয়েছে। কিলোমিটারে ভাড়া বেড়েছে ৪৫ পয়সা। মহানগরে মিনিবাসের বর্তমান ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৬০ পয়সা। সেটি বাড়িয়ে ২ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে। কিলোমিটারপ্রতি ৪৫ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ আর মহানগরে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভাড়া বাড়লো। কি ভয়ংকর সিন্ডিকেট আর মাফিয়ারা দেশ চালাচ্ছে একবার ভাবুন! করোনার পর এখনও মানুষ দিশেহারা। মানুষের আয় কমেছে। হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে জীবন চালাতে।পুরোপুরি সিন্ডিকেটের খপ্পরে আমরা দেশের সাধারণ মানুষ! এই জুলুমের কি কোন শেষ হবে না?

এই জুলুমের শেষ চাই
তেলের দাম কমাতে হবে
ভাড়া কমাতে হবে
দাম কমাও, জান বাচাও।

সরকার লাগামহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও দলীয় লোকদের সুবিধা দেয়ার জন্যই সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে ডিজেল, কেরোসিন ও এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানীর দাম কমানো হলেও আমাদের দেশে বারবার মূল্যবৃদ্ধি গণদুর্ভোগ সৃষ্টির অনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জনজীবন ইতোমধ্যেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় বিনা কারণে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য লিটার প্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি করে জ্বালানো আগুনে ঘি দেয়া হয়েছে। এমনকি প্রায় প্রতিমাসেই এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ানো সরকারের রীতিমত ট্রাডিশনে পরিণত হয়েছে। এমনিতেই নিত্য-প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। উপর্যুপরি তেল ও গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে অতিপ্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী, সেচ, কৃষিপণ্য ও পরিবহন ভাড়াসহ সকল ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যা সাধারণ মানুষের জন্য ‘মরার উপর খাড়ার ঘাঁ’। এমতাবস্থায় দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যেমন খুবই অযৌক্তিকএবং জনস্বার্থবিরোধী তেমনি বাস ভাড়া বাড়ানোও অযৌক্তিক ও অনাকাঙ্খিত।

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ