তরুণ লেখক মইনুল হাসান আবির’র ছোট গল্প “শীতের পিঠা”

 

জেমি ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্রী। সে ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখায় বেশ চৌকস। আজকে জেমির বার্ষিক পরিক্ষার শেষ দিন। শীতের ছুটি কাটাতে এবার পরিবারের সবাই গ্রামের বাড়িতে যাবে। তাই জেমি পরিক্ষা ভালোভাবে শেষ করে বাসায় আসলো। বাবা ট্রেনের তিনটা টিকিট কিনেছে। বাবা-মা আর জেমি রাতে একসাথে বসে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সব রেডি করল। সকাল ৭ টায় জেমি ও তার বাবা-মা একসাথে ট্রেনে করে বাড়িতে যাচ্ছে আর চারদিকে কুয়াশা গাঁ ঢেকেছে। তাতে বেশ আনন্দিত জেমি। বাড়িতে পৌঁছেই দাদির কাছে চলে গেলেন জেমি। এদিকে মজার মজার সব খাবার রান্না করে রেখেছে ছোট চাচি। তাই খাবার টেবিলে সবাই একসাথে বসল। মা ও চাচি সবাইকে খাবার খেতে দিচ্ছে। আহ্! কি মজা ছোট মাছ রান্না করেছে। সবাই খাবার খাওয়ার পর বিশ্রাম নিচ্ছে। জেমিও খাবার খেয়ে এবার দাদির সাথে গল্প করছে।

ছোট চাচি এই বাড়ির নতুন বউ। জেমিকে একটু বেশিই আদর করে। তাই ছোট চাচিও ছুটে এসেছে জেমির কাছে। -মা.. তোমার পরিক্ষা কেমন হয়েছে?অনেক ভালো হয়েছে চাচি। এবার শীতের ছুটি কাটাবো তোমাদের সাথে তাই আমরা সবাই চলে এসেছি। -সে তো খুশির খবর মামুনি। তোমাকে আমি মজার মজার পিঠা বানিয়ে খাওয়াবো। আচ্ছা চাচি। -তুৃমি বসে তোমার দাদুর সাথে গল্প করো আমি কাজগুলো সেড়ে আসছি। দাদি তোমার গল্পগুলো অনেক মিস করি। তুমি এবার আমাদের সাথে ঢাকা চলে যাবে তোমাকে নিয়ে আমি স্কুলে যাব। -কি বলিস জেমি, আমার কি স্কুলে যাওয়ার বয়স আছে এখনো! আরে আমি তোমাকে নিয়ে শুধু আমার সকল বান্ধবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিব তারপর সবাই তোমাকে দেখলে অনেক খুশি হবে।

দাদি চলো এবার আমরা ঘুরতে যাই। -হ্যাঁ চলো, জেমি আমার চশমা টা কোথায় জানি রেখেছি মনে নেই। আমি পালংকের পাশে দেখেছি দাদি, তুমি বসো আমি তোমার চশমা টা নিয়ে আসছি। এই নাও দাদি তোমার চশমা। চলো এবার ঘুড়তে যাই। আমরা হাটতে হাটতে বাড়ির পাশে আমার দাদার পুকুরের পাশে এসে দাড়ালাম দাদি দাদি… পুকুরে কি কি মাছ আছে। -হ্যাঁ, জেমি পুকুরে তোমার ছোট চাচা রুই মাছ চাষ করেছে। আগামীকাল তোমার জন্য এই পুকুর থেকে সবচেয়ে বড় রুই মাছটা ধরা হবে মাছের মাথাটা তুমি খাবে। হুড় রে.. অনেক খুশি হয়েছি দাদি। -জেমি চলো এবার আমাদের সবজি ক্ষেত থেকে তরকারি তুলে নিয়ে আসি। দাদি চলেন।

অন্তঃপর সবজি ক্ষেতে এসে দেখি অনেক রকম সবজি চাষ করা হয়েছে। দাদি এই সবগুলো সবজি ক্ষেত কি আমাদের? -না জেমি, এখানে আমাদের চার কাঠা জমি। বাকি জমিগুলো বিভিন্ন মানুষের। দাদি আমাদের জমিতে কি কি চাষ করেছে? -শীতকালীন সবজি চাষ করা হয়েছে যেমনঃ লালশাক, মুলাশাক, লাইশাক, ডাটাশাক, শিম ও ফুলকপি। জানো দাদি, আমি আমার বিজ্ঞান বইয়ে শীতকালীন সবজির নামগুলো শিখেছি। এবার নিজের চোখের সামনে দেখলাম আমি অনেক খুশি হয়েছি। লালশাক ও শিম নিয়ে বাড়িতে গেলাম।

মা ও বাবা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মা হাত-মুখ ধুয়ে দিল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ছোট চাচা বাজার থেকে আমার জন্য অনেকগুলো চকলেট নিয়ে এসেছে। বাড়ির চারপাশে কুয়াশা ঢেকে দিছে, শীত একটু বেশী অনুভব করছি। তাই শীতের জামা পড়ে দাদির সাথে গল্প করছি। নানান রকম মজার মজার গল্প শিখলাম। রাত দশ’টার দিকে আমরা সবাই একসাথে খাবারে বসলাম লালশাক আমার প্রিয় তাই পেট ভরে খেয়েছি। খাবার শেষে এবার ঘুমানোর পালা আমি দাদির বিছানায় দাদির সাথে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে গেলাম।

ভোর ছয়’টা বাজে। ঘুৃম ভেঙ্গেছে দাদির ডাকে। -জেমি জেমি উঠো এবার। আমি দাঁতব্রাশ করে উঠুনে গিয়ে চমকে গেলাম! আমার জন্য দাদি ভাঁপা পিঠা বানাচ্ছে আর চাচি উনুনে আগুন দিচ্ছে। আমি তো মহাখুশি এতো মজার পিঠা আজকে দাদির হাতে বানাচ্ছে। বাবা, মা ও চাচা চেটাই বসে বসে খাচ্ছে। আমি দাদির কাছে বসে দুটি পিঠা খেয়েছি। দাদিকে প্রশ্ন করলাম, দাদি ভাঁপা পিঁঠা বানাতে কি কি লাগে… দাদি বলল, চালের গুঁড়ো, নারকেল ও খেজুর গুড়। আমি এবার ঢাকা গিয়ে এই পিঠা তৈরি করব। উটুনের পূর্বদিকে চাচি বড় একটা হাড়িতে কি যেন রেখেছে সেখানে তিনি যাচ্ছেন। যাই আমিও গিয়ে দেখি। চাচি কি করেন, -জেমি এইতো তোমার জন্য ফাঁত পিঠা বানাবো তাই রেডি করছি। আচ্ছা চাচি এই পিঁঠা বানাতে কি কি লাগে… চাচি বলল, চালের গুঁড়ি, অঙ্কুরিত বীজধানের চালের গুঁড়ো ও খেঁজুরগুড়। ফাঁত পিঠা গ্রামের মানুষের জন্য খুব মজাদার পিঠা। হালকা রোদ উঁকি মারছে সবাই উঠুনে বসে রোদ্দুর পৌঁহাচ্ছে। বাবাকে গিয়ে বললাম বাবা আমি দুটি পিঠা বানাতে শিখে গেছি। ভাঁপা ও ফাঁত পিঠা বানাতে আমি পারব।

এবার শীতের ছুটিতে গিয়ে খুশিতে কাঠিয়েছি দিনগুলো। শীতকালীন সবজি গ্রামের যেমন ফরমালিন মুক্ত পাওয়া তেমনি যদি শহরে পাওয়া যেত তাহলে সবাই সুস্থ্য থাকতে পারতো। আর গ্রামীন জীবনের সহজ সরল মানুষের মনের মতো আনন্দগুলো পরিষ্কার হতো। গ্রামের ঐতিহ্যবাহী অনেক পিঠা গুলো এখন প্রায় বিলুপ্ত। আগে কার দিনে শীত আসলেই ঘরে ঘরে ফাঁত পিঠার ধুম পড়লেও এখনকার দিনে আর তেমন পিঠার উৎসব আর দেখা যায় না।

লেখকঃ মইনুল হাসান আবির, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ, এম.সি কলেজ, সিলেট।

  • 21
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ