কৃষিজমি বিক্রি করে ৭ বছরে ৩৫ হাজার তালবীজ বপণ

তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশেষভাবে উপকার করে। বিলুপ্তির পথ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রতিবছর ৫ হাজার করে তালবীজ বপন করে আসছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ৭নং চিলারং ইউনিয়নের ৬৭ বছরের ইমাম মো. খোরশেদ আলী। বর্তমানে তার পরিচর্যায় প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি তালের চারাগাছ রয়েছে।

জানা যায়, ইমাম মো. খোরশেদ আলী পেশায় একজন পল্লী-চিকিৎসক। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে চিলারং ইউনিয়নের রেলঘুন্টি থেকে আখানগড় রেলস্টেশন পর্যন্ত বীজ রোপণ করা সাড়ে ৩ হাজার গাছ একটু দৃশ্যমান। এই গাছ রোপণ করতে গিয়ে তিনি তার পৈতৃক কৃষিজমি বিক্রি করেছন। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। তালের আঁটি সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে-ঘুরে তালবীজ সংগ্রহ করতে এতে অনেক শ্রম ও শ্রমিক লেগেছে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পল্লীবিদ্যুৎ বাজার থেকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কাদসূকা ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং কাদসূকা ব্রিজ থেকে চৌরঙ্গী বাজার পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়কের দু’ধারে এ মহাযজ্ঞ চালিয়ে যেতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে জানতে চাইলে তিনি টাকার হিসাব প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করেন।

খোরশেদ আলী বলেন, মানুষের চলার পথে টাকা-পয়সা বড় কথা নয়। মানুষের মধ্যে স্মৃতি হয়ে থাকতে চাই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গত ৭ বছর ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন স্থানে ও রাস্তার পাশে তাল বীজ বপন করেছি। নিয়মিত গাছ পরিচর্যার জন্য তিনি পাহারাদার রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর রাস্তায় ৫ হাজার করে তাল বীজ বপন করেছি। এ কাজে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। পাশাপাশি দুর্যোগ হতে প্রকৃতি ও পরিবেশ ও মানুষকে রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তালবীজ বপনে ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। আমার ইচ্ছে এই বর্ষায় ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ১০টি করে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা বিনা মূল্যে রোপণের জন্য বিতরণ করব। এ লক্ষ্যে প্রায় ৩০ হাজার গাছের চারা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ ছাড়া সবাইকে কমপক্ষে পাঁচটি করে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণের জন্য আবেদন করছি। সেইসঙ্গে সরকারিভাবে বেশি-বেশি গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে জোর দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, খোরশেদ আলীর কাজ সারাদেশে অনন্য নজির হয়ে থাকবে। এ ধরণের আজ আরও কিছু মানুষ করলে দেশ দশ ও পরিবেশ ও প্রকৃতির উপকারে আসবে। খোরশেদ আলীর মতো তালসহ অন্যান্য গাছ লাগাতে সকলকে এগিয়ে আসার আহবান এ বন কর্মকর্তার।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু হোসেন ও সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষ্ণ রায় জানান, তালগাছের অবস্থান প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য অবদান স্বরূপ। তাছাড়া তালগাছ বজ্রপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে রোধে বিশেষভাবে উপকার করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে রক্ষায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ইমাম মো. খোরশেদ আলী। তাকে সাধুবাদ জানানো উচিত। পাশাপাশি তার দেখে তাকে অনুসরণ করে নতুন প্রজন্মের এ ধরণের গাছ লাগানো কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে পরিবেশকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা উচিত বলে না মনে করেন এ দুই কৃষি কর্মকর্তা।

এমন মহৎ উদ্যোগ নেয়ায় খোরশেদ আলীকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও জেলার জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান, এছাড়াও জেলা পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান বলেন, এ রকম শ্রম দিয়ে দেশের সেবা করার মতো মানুষের আজ খুবই অভাব। ইমাম মো. খোরশেদ আলীর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এই কাজে তাকে পুরস্কৃত করা উচিত আমাদের। আর তাকে অনুসরণ করে জেলা প্রশাসনও এ কাজে উৎসাহিত হবে বলেও জানান তিনি।

 

ডেইলিরূপান্তর/আরএ/এ.

  • 129
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ