মিশ্র ফল চাষ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন শেরপুরের হযরত আলী

এক সময় শেরপুরের কৃষকদের জীবন জীবিকা ধান আর পাট চাষের উপর নির্ভর করতো। পরিবর্তীত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে তারা শুরু করেন নানা শাকসবজীর চাষবাস। এতে জেলার কৃষকদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসতে থাকে। শেরপুরে চাষকৃত এসব ফসল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে, কৃষক আর্থিক সংকট কাটিয়ে লাভবান হচ্ছে। এখন শেরপুরে শুরু হয়েছে ফলের চাষের নিরব বিপ্লব। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে মাল্টা চাষ। শেরপুরের কৃষকরা জানতেন‌ইনা তাদের সমতল এই জমি এবং পাহড়ি উঁচু ভূমিগুলো মাল্টা, আঙ্গুরসহ বিদেশী ফলের চাষের জন্য উপযোগী। এমনি এক সফল চাষির নাম হযরত আলী, তিনি মাল্টাসহ বিদেশী উন্নত ফলের চাষ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন । তার মিশ্র ফল বাগানের সৌন্দর্য এখন বিনোদনের খোরাক হয়ে দাড়িয়েছে জেলার মানুষের কাছে।

শেরপুর জেলা সদরের হাজী মোঃ ইব্রাহিম খলিলুল্লাহর তিন ছেলের সবার বড় হযরত আলী ঢাকার যাত্রবাড়ীতে ব্যবসা করেন। এক সময় ব্যবসার ফাকে তিনি চিন্তা করেন নিজ এলাকায় ফলের বাগান করার। সেই চিন্তা থেকেই বিভিন্ন কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাছে পরামর্শ নিয়ে শেরপুর সদর উপজেলার রৌহা ইউনিয়নের রৌহা গ্রামে একশ বিঘা জমিতে ২০১৯ সালে মাল্টা, কমলা, আঙ্গুর, ড্রাগন, লটকন, পেপে, পেয়ারা, লেবু, কুল , সৌদী খেজুরসহ ১২টি প্রজাতির ফলের বানিজ্যিক চাষ করে শুরু করেন হযরত আলী। বর্তমানে তিনি বিদেশী উন্নত জাতের এমকাটো, ফ্রাই ছবেদা, মালবেরি, থাই সরিষাসহ আরো ২শ ৭১টি জাতের ফসলের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে তিনি শেরপুর সদর উপজেলার রৌহা, ভাতশালা, কামারিয়া ও বলায়েরচর ইউনিয়নে প্রায় আটশ বিঘা জমিতে ১২টি ফল ও চারা উৎপাদন বাগান সৃজন করেছেন। তন্মধ্যে একশ বিঘা নিজের জমি আর বাকীটা ২০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন তিনি।

সরেজমিনে দেখতে গিয়ে সাক্ষাত হয় হযরত আলীর সাথে। কথা প্রসঙ্গে হযরত আলী জানান, “আমি ব্যবসার ফাকে চিন্তা করি বিষমুক্ত ফল উৎপাদনের এবং দেশেই বিদেশি ফল উৎপাদন করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে। এ চিন্তা থেকেই আমি চেলেঞ্জ নিয়ে ২০১৯ সালে ফল চাষ শুরু করি। ফল চাষে সাফল্য পেয়ে প্রকল্পটির সম্প্রসারণ করে আমি এখন ১টি নার্সারী, ও ১১টি ফলের বাগান করেছি। এখানে এখন নিয়মিত দুইশর বেশী শ্রমিক কাজ করছেন। সামনে আরো বেশী শ্রমিক কাজ করতে পারবেন। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আমার বাগানে ফলের উৎপাদন বেশীই হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে এবং রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হচ্ছে আমার ফল। আমার দেখা দেখি অনেকেই ফলচাষে উদ্বোদ্ধ হচ্ছেন। আমি আগ্রহীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছি এবং এতে আমার খুব ভালো লাগে। প্রতিদিনই অনেকেই এ ফল বাগান দেখার জন্য আসেন। দেখে তারা খুশি হন, ফল কিনেন, আবার কেউ কেউ ফল বাগান করতে সহায়তা চান। আমরা ছাদ বাগান‌ও করে দিয়ে থাকি। ইতিমধ্যে ১শরও বেশি ছাদ বাগান করে দিয়েছি। ফল বাগানের পাশাপাশি এখন আমি মাছ চাষ, মুরগী, কবুতর ও গরু পালন করে আসছি।”

হযরত আলীর বাগানের মাল্টাসহ অন্যান্য ফল ফরমালিন ও বিক্ষমুক্ত হ‌ওয়ায় এখানে উৎপাদিত ফলের চাহিদাও বেশী। তার চলতি বছরে শুধু ফল বিক্রি করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৪ কোটি টাকার। ইতিমধ্যে ১০ কোটি টাকার ফল বিক্রি করা হয়েছে বলে জানান বাগানের ম্যানেজার, আবু সাঈদ। তিনি জানান, “আমাদের বাগানে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ক্রেতা আসতে থাকায় ফল বিক্রি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব হবে।”

তার এ ফল বাগানে দুই শতাধিক শ্রমিক সারা বছর কাজ করে আসছেন। ধীরে ধীরে এসব ফল বাগানে এক হাজারেরও বেশী শ্রমিক কাজ করতে পারবেন বলে বাগান মালিক জানান। ফল বাগানের শ্রমিকরা মজুরিও পান ভালো। এ ব্যাপারে বাগানের শ্রমিক শাহিন আলম জানান, “আমরা এ বাগানে কাজ করতে পেরে নিয়মিত আয়ের পথ পেয়েছি। এখন আমাদের ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া করানোসহ সংসার চালানোর ব্যয় নিয়ে চিন্তা কমে গেছে।”

এদিকে হযরত আলীর সফলতা দেখে এখানকার কৃষকরাও উদ্বোদ্ধ হচ্ছেন মাল্টাসহ অন্যান্য ফল চাষে। অনেকেই শুরুও করেছেন। এ ব্যাপারে কৃষক আলহাজ্ব মো: হবিবুর রহমান জানান, আমি হযরত মিয়ার বাগান দেখে নিজস্ব ১০ কাঠা জমিতে মাল্টার চাষ করেছি। আমার মাল্টার বাগান অনেক ভালো হয়েছে। সামনে আরো বেশী জমিতে ফল বাগান করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

হয়রত আলীর ফলবাগান দেখার জন্য প্রতিদিনিই ভিড় করছেন এলাকার নানা পেশার মানুষ। দেখে মুগ্ধও হচ্ছেন তারা। এ ব্যাপারে এখানে ঘুরতে আসা মানুষের সাথে কথা বললে তারা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, আমাদের এলাকায় এত সুন্দর ফল বাগান হতে পারে তা ধারণার মধ্যেই ছিল না। নিজে চোখে দেখে আমরা অভিভূত। এখানে না আসলে কোনদিনও বিশ্বাস করতে পারতাম না।

শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবাইয়া ইয়াসমিন জানান, আমরা তাদেরকে নানাভাবে পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছি। তিনি জানান, “আগে আমাদের ধারনাই ছিলো না শেরপুরের সমতল ভূমিতে মাল্টা চাষ হবে। হযরত আলী সাহেবের মাল্টা চাষে সফল হওয়ায় উজ্জল সম্ভাবনা দেখছি আমরা। এখানকার মাল্টাসহ অন্যান্য ফল চাষে বিদেশী ফল আমদানী অনেকাংশেই হ্রাস পাবে বলে আমরা আশা করছি। সফল চাষী হযরত আলী ফল চাষের পাশাপাশি শুরু করেছেন মাছ চাষ, কবুতর, মুরগী ও গরু পালন। তার এসব উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে উদ্বোদ্ধ হচ্ছেন আরো অনেকেই। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শেরপুরে কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটে যাবে।

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 29
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ