বর্তমান আট চেয়ারম্যানের মধ্যে ৫ জনেরই ঠাঁই হলো না নৌকায়

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর ও রাণীশংকৈল উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এই তালিকায় দুই উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বর্তমান আট চেয়ারম্যানের পাঁচজনই ঠাঁই পাননি।

দুই উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন থাকলেও দ্বিতীয় ধাপে ১১টিতে ভোট হতে যাচ্ছে। এসব ইউনিয়নের ৮টিতে আওয়ামী লীগ দলীয়, ২টিতে বিএনপি ও ১টিতে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান রয়েছেন।

নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ৮৪৮টি ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী ভোট গ্রহণ ১১ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ১৭ অক্টোবর। বাছাইয়ের শেষ তারিখ ২০ অক্টোবর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৬ অক্টোবর।

এদিকে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জেলা কমিটিকে আসন্ন ইউপি নির্বাচনে আগ্রহী প্রার্থীদের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আওয়ামী লীগ। এতে বলা হয়, চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের পরামর্শ নিয়ে আগ্রহী প্রার্থীদের কমপক্ষে তিনজনের একটি প্যানেল প্রস্তাব কেন্দ্রে পাঠাতে হবে।

নির্দেশনা পেয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে বর্ধিত সভা করে আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন আহ্বান করা হয়। হরিপুরের ৬টি ইউপিতে ৩৫ এবং রাণীশংকৈলের ৫টি ইউপিতে ৩০ জন নেতা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আবেদন করেন। পরে সেসব আবেদন উপজেলা আওয়ামী লীগ জেলা কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেয়। এদিকে জেলা আওয়ামী লীগ সভা করে প্রতিটি ইউপিতে তিনজন আগ্রহী প্রার্থীর নাম রেখে তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ড যৌথ সভায় দ্বিতীয় ধাপের দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করে। হরিপুরের গেদুড়া ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ, আমগাঁও ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান পাভেল তালুকদার, বকুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান আবু তাহের, ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি অনীল চন্দ্র দাস, হরিপুর সদর ইউনিয়নে গোলাম মোস্তফা, ভাতুরিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহিমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

রাণীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় ইউনিয়নে আবু কাশেম, নেকমরদ ইউনিয়নে হামিদুর রহমান, লেহেম্বা ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল কালাম, রাতোর ইউনিয়নে শরৎ চন্দ্র ও কাশিপুর ইউনিয়নে আতিকুর রহমানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

হরিপুর উপজেলার ছয়টি ইউপির চারটিতে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান রয়েছেন। তাঁদের ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নে মো. মনিরুজ্জামান ও ভাতুরিয়া ইউনিয়নে শাহজাহান সরকার দলের মনোনয়ন পাননি। মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের চাল আত্মসাতের অভিয়োগ রয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। আর শাহজাহান সরকারের বিরুদ্ধে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করাসহ দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে।

রাণীশংকৈল উপজেলায় যে পাঁচটি ইউনিয়নে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তার মধ্যে চারটিতে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান রয়েছেন। এর মধ্য ধর্মগড় ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, রাতোর ইউনিয়নে আবদুর রহিম, কাশিপুর ইউনিয়নে আবদুর রউফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আবদুর রহিম গত নির্বাচনে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন। আবদুর রউফ দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। আবুল কাশেম বেশি জনপ্রিয় হওয়ার কারণে বাদ পড়েছেন শফিকুল ইসলাম।

হরিপুরের ভাতুরিয়া ইউনিয়নে শাহজাহান সরকার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে গত নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। এবারও তিনি প্রার্থী হতে আবেদন করেন। কিন্তু দল তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সমর্থকদের নিয়ে বসে আলোচনা করে দেখব কী করা যায়। জেলা কমিটির সুপারিশে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, আমি নাকি নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছি। কিন্তু এবার যাঁকে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সেই (আবদুর রহিম) ২০১৬ সালে আমার বিরুদ্ধের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন করেছিলেন। আমি মনে করি, ষড়যন্ত্র করে আমাকে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।’

রাতোর ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহিম বলেন, ‘গত নির্বাচনে আমি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কিন্তু দেওয়া হয়নি। আমার সমর্থকেরা আমাকে জোর করে প্রার্থী করে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। এবারও প্রার্থী হতে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু দেওয়া মনোনয়ন দেওয়া হলো না। নির্বাচনে অংশ নেব কি না, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেব।’

রাণীশংকৈল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সইদুল হক বলেন, ‘যাঁরা ইউনিয়ন, উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন, তাঁদের নামের তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলাম। আর যাঁরা বিভিন্ন নির্বাচনে দলের প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেছেন, তাঁদের কয়েকজন ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে আবেদন করেছিলেন। আমাদের সুপারিশে সেসব অভিযোগগুলো উল্লেখ করে দিয়েছিলাম।’

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার রায় বলেন, ঘোষিত প্রার্থীর তালিকায় আওয়ামী লীগের ৮০ শতাংশ চেয়ারম্যান মনোনয়ন পেয়েছেন। প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশনায় বলা ছিল, দলের বর্তমান চেয়ারম্যান আর গত নির্বাচনে নৌকা নিয়ে যাঁরা পরাজিত হয়েছিলেন, তাঁদের নাম বাধ্যতামূলকভাবে পাঠাতে হবে। গত নির্বাচনে যাঁরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন, যাঁরা দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেছেন ও চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের নামে সুপারিশ করা যাবে না। এসব বিবেচনায় দলের বর্তমান চেয়ারম্যানদের অনেকেই বাদ পড়েছেন।

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ