তিন কারণে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড -ইয়াহিয়া নয়ন

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক মহলে সোচ্চার। ঠিক তখনই ঘটল এক হত্যাকাণ্ড। ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যা করা হয়। প্রত্যাবাসনে সোচ্চার থাকা রোহিঙ্গাদের শীর্ষনেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর তোলপাড় সৃষ্টি হয় দেশে-বিদেশে। কারা কী কারণে তাকে হত্যা করেছে তা নিয়ে চলে নানা রকম যুক্তি উপস্থাপন। সেই সঙ্গে সন্দেহ করা হয় আরসা ও আল ইয়াকিন নামের সংগঠনকে। এবার আলোচনায় এসেছে ‘সাহাবা’ নামে একটি নতুন সংগঠন। ‘রিয়েল ভয়েজ অব রোহিঙ্গা’ নামের ওয়েবপেজের একটি অডিও বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, দলে ভেড়াতে না পেরে মুহিবুল্লাহকে হত্যা করে সংগঠনটির সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এই সংগঠন থেকেই মুহিবুল্লাহকে হত্যার ১৫-২০ দিন আগে থেকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল।

অডিওটি বিশ্লেষণ করে বাস্তবে এ ধরনের সংগঠন আছে কিনা- তা খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সাহাবার সদস্যরা মিয়ানমার থেকে এসে মুহিবুল্লাহকে হত্যা করে আবার মিয়ানমারে পালিয়ে গেছে।

রিয়েল ভয়েজ অব রোহিঙ্গা নামের ওয়েবসাইটের ওই অডিওতে শোনা যায়, সাহাবার এক নেতা বলছেন, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে ডেকে জানতে চেয়েছি, কেন সে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ ছাড়া করতে চায়। কেন রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠাতে চায়।

অডিওর শেষের দিকে বলা হয়, দলে ভেড়াতে না পেরে মুহিবুল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে। মুহিবুল্লাহও মৃত্যুর আগে সাহাবা গ্রুপের ডাক আসার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। মুহিবুল্লাহকে এক অডিওতে বলতে শোনা যায়, ‘৯৫ ভাগ রোহিঙ্গা আমাদের পক্ষে, কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলে কথা বলতে পারছেন না। এখন আমাদের কী হবে? ওরা দু-একবার ডেকেছিল।’ মৃত্যুর আগেও মুহিবুল্লাহর কাছে অডিওবার্তা এসেছিল বলে জানা গেছে। এমনকি পরিবারের কাছে তাকে হত্যা বা গুম করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। ভিন্ন আরেকটি অডিওবার্তায় মুহিবুল্লাহকে বলতে শোনা যায়, সবাই এখন কাঁধে ও কোমরে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে। পুরো ক্যাম্পজুড়ে সন্ত্রাসীরা ছড়িয়ে পড়েছে। আমাকে হুমকি দিচ্ছে।

মুহিবুল্লাহ হত্যার পেছনে সাহাবা গ্রুপের হাত আছে কিনা- জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হাসানুজ্জামান মিডিয়াকে জানান, সাহাবা নামে একটি সংগঠনের নাম শুনেছি। তদন্তের স্বার্থে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়, তবে তদন্ত চলমান রয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যা, গুম বা অপহরণ করা হতে পারে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন দেয়া হয়েছিল। সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের তিন সপ্তাহ আগে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন দেয়া হয়। ৮ সেপ্টেম্বর দেয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহর প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খুনিরা এর আগেও বেশ কয়েকবার তাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। যে কোনো সময় তাকে হত্যা করা হতে পারে।

জানা গেছে, একটি সংস্থার গোয়েন্দা তথ্যে দায়ী করা হয়েছে আরসাকে। সংস্থাটির একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ছিল মিয়ানমার। এ চাপ সামলাতে এবং বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে আরসা সদস্যদের দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। মুহিবুল্লাহ হত্যার পর থেকে সন্দেহভাজন ১২ রোহিঙ্গা পলাতক। তাদের সবাই আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির (আরসা) সদস্য। মিয়ানমারই তাদের পাঠিয়েছিল। মিশন শেষে তারা মিয়ানমারেই পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মিয়ানমার সরকারের শত শত এজেন্ট রয়েছে। ওই দেশের সরকারই তাদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠায়। তারা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে মিয়ানমার সরকারকে সরবরাহ করে। মাদক এবং অবৈধ চোরাচালানের টাকা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে যায় পণ্য ও হুন্ডির মাধ্যমে। এছাড়া মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও সিভিল পোশাকে ক্যাম্পে অবাধে যাতায়াত করে।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে তৈরি করা একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, মুহিবুল্লাহ হলেন- মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনে সোচ্চার কণ্ঠ। তার ডাকে রোহিঙ্গারা একজোট হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তিনি দেখা করেছেন। প্রত্যাবর্তনে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের জন্য তিনি হয়ে ওঠেন আশা-ভরসার মূর্ত প্রতীক। আরসাসহ কয়েকটি গ্রুপের টার্গেটে আছেন তিনি। আরসা মূলত মিয়ানমার সরকারের পক্ষে কাজ করছে। প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান মিয়ানমার সরকারের বিরোধী হলেও তারা মূলত সরকারের এজেন্ট হয়েই কাজ করছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশের ক্ষেত্রেও আরসার বড় ভূমিকা আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এআরএসপিএইচের এক শীর্ষনেতা মিডিয়াতে বলেন, মুহিবুল্লাহ সব কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সব ব্লকে এআরএসপিএইচের অফিস খোলার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এতে সন্ত্রাসী গ্রুপ হয়তো ভেবেছিল, মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন। তিনি ছিলেন শিক্ষিত এবং মার্জিত। সবাই তাকে পছন্দ করতো।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গা হত্যার পেছনে তিনটি কারণ থাকতে পারে।

প্রথমত, যারা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় রাজি নয় তারা মুহিবুল্লাহর ভূমিকায় অসন্তুষ্ট। সুতরাং অসন্তোষ থেকে তারা খুন করতে পারে মুহিবুল্লাহকে। স্পষ্ট করে বললে এই হত্যায় মিয়ানমার জান্তা সরকারের হাত থাকতে পারে।

দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গারা বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করলেও মুহিবুল্লাহই একমাত্র ব্যক্তি যার যোগাযোগ ও যাতায়াত ছিল বিশ্ব দরবারে। মুহিবুল্লাহর মতো নেতাকে সরিয়ে রোহিঙ্গাদের ঐক্যে ফাটল ধরানো এবং তাদের নেতৃত্বশূন্য করার ক‚টচালের অংশ হতে পারে এ হত্যাকাণ্ড।

তৃতীয়ত, আল ইয়াকিন বা আরসার নিজেদের মধ্যে দ্বন্ধের বলি হতে পারেন মুহিবুল্লাহ।

তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। সব সত্য বেরিয়ে আসবে। ইউরোপ-আমেরিকা সোচ্চার এই হত্যার তদন্ত ও বিচারে। বাংলাদেশও বলছে, তদন্ত হবে বিচার হবে কেউ ছাড় পাবেনা।

লেখক : সাংবাদিক।

 

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 19
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ