কক্সবাজারের ৩৪ শরনার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে দিন দিন

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। মিয়ানমারের রাখাইনে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগের ফলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪ শরনার্থী শিবিরে বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন।

এই উখিয়া-টেকনাফের শরনার্থী শিবিরের রোহিঙ্গারা দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রত্যাবাসনের পক্ষে ও বিপক্ষে দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ডাকাতি, খুন, অপহরণ, ইয়াবা ও ক্যাম্প ভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ হচ্ছে। সর্বশেষ খুনের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন রোহিঙ্গাদের শীর্ষনেতা মাষ্টার মুহিবুল্লাহ। গত ২০১৭ সালে আগষ্টের পর থেকে ৪ বছরে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ৭২টি হত্যা কান্ড সংগঠিত হয়েছে। প্রতিনিয়ত তাদের সংঘর্ষের কারণে স্থানীয়রা চরম আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

গত বুধবার ২৮ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮ টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১- ইষ্ট সংলগ্ন নিজ অফিসে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছে রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মাষ্টার মুহিবুল্লাহ। এই ঘটনায় বর্তমানে ক্যাম্পের ভেতরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্র মতে, উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি বনভুমিতে ৩৪টি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের রয়েছে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর এক বছর রোহিঙ্গারা নীরব থাকলেও যত দিন যাচ্ছে রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির গুলোতে অপরাধ ততই বাড়ছে। স্থানীয় মাদক ও ইয়াবা কারবারি এবং চোরাচালান কারবারিদের সঙ্গেও তাদের অবাধ যাতায়াত। আর ক্যাম্পগুলোকে মাদক, ইয়াবা, অস্ত্রের মজুতে গোডাউন বানিয়ে ফেলেছে। অপরাধের মাত্রা বেড়ে এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যেই প্রায় প্রতি রাতে ক্যাম্পে সংঘর্ষ চলে। অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন, পুলিশ আক্রমণ, ডাকাতি, হত্যা, মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত রয়েছে রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা দোকানপাট থেকে চাঁদা আদায়, মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসা ইয়াবা ও নানা প্রকার মাদক ও অস্ত্র বাণিজ্য, আরএসও, আরসা, আল ইয়াকিনসহ বিভিন্ন সংগঠন ভিত্তিক এলাকা দখল নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত চলছে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা।

মুহিবুল্লাহ নিহত হওয়ার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু’গ্রুপের মধ্যে এখনও উত্তেজনা চলছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ থাকায় ক্যাম্পের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত তিনজন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে আটক করেছে আর্ম পুলিশ ব্যাটেলিয়ন (এপিবিএন)।আটককৃত রোহিঙ্গারা হলেন, উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্প ১- ইষ্টের বাসিন্দা জকির আহমেদের ছেলে জিয়াউর রহমান (৩২) ও মৃত মকবুল আহমেদের ছেলে আব্দুস সালাম (২৯)। এ পর্যন্ত মুহিবুল্লাহ হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩ জনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

একাধিক সুত্র জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রত্যাবাসনের পক্ষে ও বিপক্ষে রয়েছে একাধিক গ্রুপ। মিয়ানমারে সন্ত্রাসবাদী রোহিঙ্গারা এদেশে এসেও চালাচ্ছে সন্ত্রাসবাদ। আরএসও, আল ইয়াকিন, আরসা নামের সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ।

স্থানীয় প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, গত ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট রোহিঙ্গারা এদেশের চলে আসার পর নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৬টি। আর এসব মামলায় আসামি করা হয় ১৫৯ জনকে। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি করা হয়েছে ৪১৪ জনকে। ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ২৬৩টি। আর এসব মামলায় আসামি হয় ৬৪৯ জনকে। ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা অপরাধীদের বিরুদ্ধে হওয়া ১৮৪ মামলায় আসামি করা হয় ৪৪৯ জনকে।

গত ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের আগষ্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নানা অপরাধে মামলা হয় ৮৫৪টি। ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ৪৪২টি মামলা হয়। ২০১৭ সালের আগষ্ট থেকে গত চার বছরে প্রায় ১৩০০ মামলায় আসামীর সংখ্যা দাড়ায় প্রায় ৩ হাজার রোহিঙ্গা ।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুত্রে জানা যায়, গত চার বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টি মামলা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা হয়েছে মাদক সংশ্লিষ্ট আইন। মামলার সংখ্যা ৭৬২টি। খুনের মামলা হয়েছে ৭২টি। খুনের তালিকায় রয়েছেন রোহিঙ্গাদের শীর্ষনেতা মুহিবুল্লাহ।

অন্যান্য মামলার মধ্যে ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অস্ত্র ও মাদক পাচার, মানব পাচার, সরকারি কাজে বাধাদান। এছাড়া জেলা পুলিশের হাতে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক ৩২ জন মাদক গডফাদারের তথ্য রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কারণে আতংকের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন স্থানীয়রা। তাদের সন্ত্রাস শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আক্রন্ত হচ্ছেন স্থানীয়রাও। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে ইতোমধ্যে খুন, অপহরণ এর শিকার হয়েছেন স্থানীয়রা।

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের লাগাম টানা না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে জেলার অনেক স্থানে। তারা জেলার বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাস, দখলবাজীসহ নানা অপরাধমুলক কাজও করে যাচ্ছে। আমরা স্থানীয়রা সব সময় আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গারা যেভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এতে স্থানীয় লোকজনের চলাফেরাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। মুলত ইয়াবা ব্যবসা বাধাহীন করতেই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা খুন ও অপহরণে মেতে উঠেছে। এরা শুধুমাত্র মাদক নয়, স্বর্ণ পাচারেও জড়িত।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক প্রতিরোধে কাজ করছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে ৩২ জন মাদক পাচারকারী গডফাদারের চিহ্নিত করা হয়েছে। ইয়াবার বড় বড় চালান পাচারে এই গডফাদাররাই জড়িত। সম্প্রতি কক্সবাজারের চৌফলদন্ডি উপকূল থেকে ধরা মাদকের বিশাল চালান প্রচেষ্টায়ও এই গডফাদাররা জড়িত। আমরা যেভাবেই হোক এই চক্রকে আইনের আওতায় নিয়ে আসব। পুলিশ সুপার আরও বলেন, বড় পাচারকারীদের ছত্রছায়ায় থেকে শরনার্থী ক্যাম্পের অসংখ্য রোহিঙ্গা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। আমাদের মুল টার্গেট ইয়াবার গডফাদাররা। তাদের ধরার চেষ্টা চলছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ও উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা ইয়াবার চালানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব নয়। ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ মাদক, অপহরণ, খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী ও শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা মিয়ানমার থেকে সরাসরি ইয়াবা চালান এনে ক্যাম্পে মজুত রাখে। ক্যাম্পে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির মধ্যেও রোহিঙ্গারা ইয়াবা চালান, মজুত এবং লেনদেন করে যাচ্ছে।

কক্সবাজারের ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক নায়মুল হক বলেন, প্রতিদিন কোনও না কোনও ক্যাম্প থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। তবে ক্যাম্পে অপরাধপ্রবণতা বাড়লেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলমান উত্তেজনা, সংঘর্ষের ঘটনার কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কার্যালয়ে অতিরিক্ত কমিশনার সামশুদ্দোহা নয়ন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বর্তমানে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তবে ক্যাম্পের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

 

ডেইলিরূপান্তর/আরএ/এস.

  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ