মাধবপুরে ঔষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ও দালালদের কাছে জিম্মি রোগীরা

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় কিছু ক্লিনিক-প্যাথলজির নিয়োগকৃত শতাধিক রোগী ধরা দালাল এবং বিভিন্ন ঔষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে মাধবপুর উপজেলা ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সাধারণ রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসক কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখলেই ক্লিনিক-প্যাথলজির দালালরা ওই কক্ষের ভেতর থেকেই ব্যবস্থাপত্র কেড়ে নিয়ে রোগিদের টানাহেঁচড়া করছেন।

অপরদিকে ঔষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কয়েকজন চিকিৎসকদের কক্ষে অবস্থান করলেও অধিকাংশরা বাইরে অপেক্ষায় থাকেন। ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বাহির হলেই ওই প্রতিনিধিরা রোগীদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে কেউ মোবাইলে ফটো তুলছেন, এর মধ্যে অনেকেই বিকল্প ঔষুধ কেনার পরামর্শ দিতে থাকেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মাধবপুর উপজেলার মধ্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে। প্রতিদিন প্রায় দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার বেশীর ভাগ রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। এছাড়া উপজেলার সাথে বিজয়নগর নাছিরনগর উপজেলাসহ কিছু অংশের প্রায় দুই লাখেরও অধিক মানুষ নিয়মিত এখানে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসেন। আর এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘিরে গত কয়েক বছরে উপজেলা সদর এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মত যত্রতত্র ভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় দুই ডজন ক্লিনিক-প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাধবপুর হাসপাতাল গেটের সামনে বিভিন্ন ঔষুধ কোম্পানির লোকজন অবস্থান করছেন। রোগীদের মত ওই প্রতিনিধিরা দুইজন-তিনজন করে চিকিৎসকের কক্ষে যাচ্ছেন। এরপর তারা বেরিয়ে আসলে আরেকটি গ্রুপ যাচ্ছেন। এভাবেই চলে পুরোদিন। অপরদিকে ক্লিনিক-প্যাথলজির নিয়োগকৃত দালালরা জোট বেঁধে বিভিন্ন কক্ষের সামনে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে বেশীর ভাগ রয়েছেন পুরুষ। দালালরা জরুরী বিভাগের সামনে ৫-৬ জন অবস্থান করলেও বর্হিবিভাগের প্রতিটি কক্ষের দরজার পাশে দুইজন ও চিকিৎসকের পাশে একজন করে দাঁড়িয়ে আছেন। এর মধ্যে চিকিৎসক কোনো রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে ব্যবস্থাপত্র দেয়া মাত্র দালালরা অল্প টাকায় ভালো পরীক্ষা করিয়ে দেয়ার প্রলোভন দিচ্ছেন।

মাধবপুর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে, চিকিৎসা নিতে আসেন। আদাঐর ইউনিয়নের মিঠাপুকুর গ্রামের রোজিয়া খাতুন বলেন, আমি গত কয়েকদিন থেকে পেটের ব্যথায় ভুগছি। এই হাসপাতালে ডাক্তার কিছু পরীক্ষা দিয়েছেন। আমি ডাক্তারের ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই একজন পুরুষ তাদের প্যাথলজিতে পরীক্ষা করাতে হবে বলে আমার হাত থেকে ওই কাগজ জোর করে নিয়ে যায়। আমি ওইখানে যেতে না চাইলে আমাকে টানাটানি শুরু করে। ওই পুরুষকে বলেছি আমি কোনো টাকা আনেনি গরিব মানুষ এরপর ওই পুরুষটি আমার দিকে কাগজটি ফেলে দিয়ে আবারো হাসপাতালের ভেতর চলে যায়।

চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সাথে আসা একজন বলেন, জরুরী বিভাগ থেকে আমাকে তাড়াতাড়ি কিছু ইনজেকশন ও স্যালাইন আনতে লিখে দিয়েছেন। আমি ওই কক্ষ থেকে বের হতেই তিন-চারজন লোক আমার হাতে থাকা ব্যবস্থাপত্রটি দেখতে চান। ওরা হাসপাতালের চিকিৎসক হতে পারে মনে করে আমি তাদের দিকে কাগজটি এগিয়ে দিয়ে ছিলাম। এরপর দুইজন ফোনে ছবি তুলছেন আরেকজন বলছেন তাদের কোম্পানীর ওষুধ কিনতে। এভাবে তারা আমাকে অনেকক্ষণ আটকে রাখেন। আমাকে দীর্ঘক্ষণ হয়রানির করায় জরুরী বিভাগে জানালে তারা বিষয়টি গুরুত্বই দেননি।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চিকিৎসক বলেন, আমরা বাইরে থেকে এসে এখানে চিকিৎসা দিতে আসি। আর দালালরা স্থানীয় একটি মহলের লোকজন। বিগত দিনে এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক চিকিৎসক তাদের হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেক সময় দালালদের অত্যাচারে রোগীদের সাথে আমরাও বিরক্ত হয়ে উঠি। আর অনেক সময় ওষুধ কোম্পানীর কিছু প্রতিনিধি আসেন। তবে আমরা তাদের রোগী দেখার সময় নয়, অবসর সময়ে আসতে বলি।

এ ব্যাপারে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ এএইচএম ইশতিয়াক মামুন বলেন, মাধবপুর বাজারে কিছু ক্লিনিক-প্যাথলজির দালাল আসে তা আমি জানি। আমাদের সকল স্টাফদের বলে দিয়েছি এখানে যেনো কোনো দালাল আসতে না পারে। তবে রোগীদের টানাহ্যাচড়া হয়রানি বন্ধে ইতিমধ্যে কিছু লোক লাগানো হয়েছে। চিকিৎসকদের সাথে দেখা স্বাক্ষাত না করতে বলা হয়েছে তারপরও বিষয়গুলো আমি ব্যক্তিগত ভাবে দেখবো।

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ