মেশিনের চাকা ঘুরলেও, ঘোরে না বিধবা রাবেয়ার জীবন চাকা

মূহূর্তের জন্যও থেমে নেই তার সেলাই মেশিনের চাঁকা ।বন বন ঘুরছে আর তার সঙ্গে চলছে ধারালো সূঁচের ওঠানামা। তার চোখগুলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়ে থাকে সেই সূঁচাগ্রের ওঠানামা সেলাই পড়া কাপড়ের দিকে।

এতটুকু হেরফের হওয়ার সুযোগ নেই। একটু পরপরই সূঁচের কাছাকাছি হাত বাড়িয়ে দিয়ে কাপড় সোজা করে দিতে হয়। এই বুঝি গেঁথে যাবে তীব্র গতিতে ওঠানামা করা সুঁই। কিন্তু যায় না। অথবা যায় কখনো কখনো। তাতে তোয়াক্কা নেই… ঝুঁকি নিয়েই চলে তার সেলাইয়ের কাজ।

কথায় কথায় অনেকেই বলেন, তিনি স্বপ্ন বোনে সেলাইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে। সে বুননে তৈরি হয় সভ্যতা টিকিয়ে রাখার পোশাক-পরিচ্ছদ। অন্যের জীবনটাকে রঙ্গীন ও আনন্দময় করতেই তার টানা ঝুঁকিপূর্ণ পরিশ্রম। থ্রি-পিস, শার্ট এবং মেকসি ও ব্যাগ সেলাই করেন।

এসব পণ্য গ্রামে গ্রামে গিয়ে নিজেই বিক্রি করেন তিনি। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি, শীত কিংবা গ্রীস্ম কোন কিছুতেই তার কাজের রুটিনে পরিবর্তন আসে না।
সেলাই কাজ চলে সময়ের কাঁটা সঙ্গে তাল রেখে। কিন্তু এই যে কাজ, সেই কাজের আগেও থাকে তার কাজ। ঘর গেরস্থলীর। সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে সেগুলো সেরে তবেই সেলাই কাজ।

বলছিলাম, একজন বিধবা নারী রাবেয়া বেগমের জীবন গল্প। এটাই তিন সন্তানের জননী রাবেয়ার জীবনচিত্র। এমনটাই তার জীবনযুদ্ধ। দিন, মাস, বছর যায়, অনেক কিছুই পাল্টায় শুধু পাল্টায় না রাবেয়াদের জীবনের গতিপথ। ফলে পাল্টায় না ভাগ্যও।কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডেই পলিথিনে মোড়ানো ঘরেই তিন সন্তানের জননী বিধবা রাবেয়া বেগম (৩০) এর বসবাস৷

গত ২০১৪ সালে সংসারে স্বচ্ছলতা আনার জন্য স্বামী মোহাম্মদ সিরাজ এক ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে রেখে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। স্বপ্ন ছিল অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা আনবে। সুখে জীবন অতিবাহিত করবে। সেই সুখের আশা অধরাই রয়ে গেল রাবেয়ার। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মালয়েশিয়ায় মারা যান স্বামী মোহাম্মদ সিরাজ। এতে করে অনিশ্চয়তায় পড়ে যান পুরো পরিবার। তিন সন্তান নিয়ে বিপাকে পড়ে যান রাবেয়া। দিনে দিনে সন্তানদের বয়স বাড়ে, সেই সাথে লেগে থাকে অভাব অনটন। এ অবস্থায় বিধবা রাবেয়া সন্তানদের আহার জোগাতে অন্যের বাড়ীতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। এতেও নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার। সেই যে শুরু হলো স্বপ্ন ভঙ্গ জীবনের যুদ্ধ , আজও সেই যুদ্ধ চলছে।

জানা গেছে, ইউনাইটেড পারপাসক নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করে হতভাগী রাবেয়াকে।পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম এর অর্থায়নে ইউনাইটেড পারপাসের সহযোগিতায় ইকরা প্রকল্পের আওতায় ৩৫ হাজার নগদ অর্থ অনুদান পান রাবেয়া।

অনেকের মতো তারও সুযোগ মেলে সেলাই প্রশিক্ষণে। সেলাই কাজে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থাও করেন আইওএম এর অর্থায়নে ইউনাইটেড পারপাস। প্রশিক্ষন পেয়ে ক্রয় করেন নতুন সেলাই মেশিন। এতে অসহায় হতদরিদ্র রাবেয়া বেগম ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে কাপড় সেলাই করা অর্থ দিয়ে তার সংসারে খরচ চালিয়ে যাচ্ছে। সেলাই মেশিনের চাকায় স্বপ্ন দেখছে রাবেয়া বেগম।

দিনে দিনে কাজ বাড়ে, নিজেরও দক্ষতা বাড়ে কিন্তু আয় বাড়ে না। সেই যে শুরু হলো ২৫ হাজার টাকায় যুদ্ধ। আজও সেই যুদ্ধ। রাবেয়ার বড় মেয়ে জয়নাব আক্তার বলেন, আমার বয়স যখন ৪ বছর তখন বাবা সাগর পথে মালয়েশিয়া পাড়ি দেয় কিন্তু সেখানে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। কেউ খোজঁ খবর রাখত না। মা তখন পরের ঘরে কাজ করে আমাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেন। মা’ ই এখন আমাদের সংসারের এক মাত্র আয়ের উৎস। সেলাইয়ের কাজ করে, তৈরী পণ্যগুলো গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে যে অর্থ পায় তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে৷

বিধবা রাবেয়া বেগম বলেন, আমার স্বামীর মারা যাওয়ার পরে আমি একা, পরের ঘরে কাজ করে এতবড় সংসার আমার পক্ষে চালানো কঠিন হয়ে যেত, অনেক কষ্ট হতো। বর্তমানে আমি ইউনাইটেড পারপাসের সহযোগিতায় থ্রি-পিস, শার্ট এবং মেকসি ও ব্যাগ সেলাই করি। এসব পণ্য গ্রামে গ্রামে গিয়ে নিজেই বিক্রি করে সংসার চালায়, সন্তানদের ভরণপোষণ করি৷

তিনি বলেন, ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস যখন হারিয়ে ফেলছিলাম, ঠিক তখনই আলোর বার্তা নিয়ে জীর্ণ বাড়িতে হাজির আইওএম অর্থায়নে ইউনাইটেড পারপাস। তিনি আরও বলেন, আমি ২০২০ সাল থেকে ইকরা প্রকল্পের মাধ্যমে শাপলা দলের সদস্য হয়েছি। অনেকের মতো আমিও সেখানে প্রতিমাসে একশত টাকা সঞ্চয় করছি। বর্তমানে এই শাপলা দলে আমরা ২৭ জন সদস্য আছি, যারা আমার মতোই।

স্থানীয় জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মুজাম্মেল হক বলেন, আমার ছেপটখালি এলাকায় রাবেয়া বেগমের মতো আরও অনেক গরীব ও অসহায় মানুষের পাশে ছিলেন আইওএম ও ইউনাইটেড পারপাস। তাদের মানবিক কাজের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। এভাবে যদি অন্যান্যরাও কাজ করলে অসহায় হতদরিদ্র মানুষের উন্নয়ন হবে।

জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল আমিন চৌধুরী বলেন, এ ইউনিয়নে আইওএম অর্থায়নে ইউনাইটেড পারপাস ৩৫ হাজার টাকা সহযোগিতা করেছে রাবেয়াকে। তবে বিধবা রাবেয়া আরো সহযোগিতা পেলে অনেক বড় কিছু করতে পারতেন। রাবেয়ার মতো প্রায় সাড়ে পাঁচশত উপকার ভোগীকে সহযোগিতা করেছেন আইওএম ও ইউনাইটেড পারপাস, তাদেরকে আমার ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামুদ্দিন আহমেদ বলেন, কক্সবাজার জেলায় অনেক এনজিও-আইএনজিও কাজ করছে তবে ইউনাইটেড পারপাসের কর্মকান্ড অন্যদের থেকে ভিন্ন। আমি আশাবাদি রাবেয়ার মতো উখিয়ার হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি সরঞ্জাম, কৌশল ও মূলধন হিসেবে আর্থিক সহযোগিতা করে তাদের উপকৃত করবে এনজিও-আইনজিওগুলো।

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 17
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ