বিনা ভোটে ৪৩ ইউপিতে আ.লীগ প্রার্থীদের জয়

সারা দেশে ১৬০টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে আগামীকাল সোমবার ভোট গ্রহণ করা হবে। তবে ভোটের আগেই বাগেরহাট, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ৪৩টি ইউপিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে বাগেরহাটে ৬৬টি ইউপির মধ্যে ৩৮টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। বাকি ২৮ ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

আগামীকাল যেসব জেলায় ইউপি নির্বাচন হবে এর মধ্যে খুলনায় ৩৪টি, বাগেরহাটে ৬৬টি, সাতক্ষীরায় ২১টি, নোয়াখালীতে ১৩টি, চট্টগ্রামে ১২টি এবং কক্সবাজারে ১৪টি ইউনিয়ন রয়েছে। বাগেরহাটের বাইরে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে ৪টি এবং খুলনার ১টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

২০১৬ সাল থেকে ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হচ্ছে। তবে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কথা আগেই জানিয়ে দিয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা ছিল, নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থীরা। এতে সংঘাত ও প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হবে। এ জন্য নির্বাচনে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে ভবিষ্যতে আর নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হতে পারবেন না—দলের কেন্দ্র থেকে এমন কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। তারপরও বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতারা বিদ্রোহী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন এবং বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে বাগেরহাটের বেশির ভাগ ইউপিতে দলের কেউ বিদ্রোহী হওয়ার সাহস পাননি। এ কারণে সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ীর সংখ্যা বেশি বলে দলের নেতারা মনে করছেন।

দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউপিতে কয়েক ধাপে ভোট হবে। গত ৩ মার্চ প্রথম ধাপের ৩৭১টি ইউপির ভোটের তফসিল ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন। কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে ভোট স্থগিত করা হয়। ২১ জুন ২০৪টি ইউপিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় কোভিড পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ১৬৭টি ইউপির ভোট স্থগিত করা হয়। প্রথম ধাপে স্থগিত ১৬৭টি ইউপির মধ্যে ১৬০টিতে কাল সোমবার ভোট হচ্ছে।

বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ১৫৩ আসনে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। এরপর ক্রমে স্থানীয় সরকারসহ অন্যান্য নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা শুরু হয়।

২০১৫ সালের শেষের দিকে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ফেনীর পরশুরামে মেয়রসহ সব কাউন্সিলর পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হন।

২০১৬ সালে সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হয়। ওই নির্বাচনে বাগেরহাট ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ ছিলেন না। ফলে অনেক ইউপিতেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। এরপর জেলা পরিষদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীরা জয়ী হন। তারপর উপজেলা পরিষদসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার খবর ব্যাপকভাবে আসতে থাকে।

এই বিষয়ে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। এ দেশের রাজনীতি হচ্ছে নির্বাচন ঘিরে। এভাবে নির্বাচন হতে থাকলে মানুষের অনীহা আরও বাড়বে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঠে সব রাজনৈতিক দল যদি এগিয়ে না আসে, তাহলে নির্বাচন কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে? আমরা তো প্রার্থী ঘোষণা করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বিদ্রোহী দাঁড়াতে বলতে পারি না।’

বাগেরহাটে প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল বিদ্রোহীরা…

বাগেরহাটে চেয়ারম্যান পদে আগামীকাল মূলত ২৮ ইউপিতে ভোট হবে। তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী হওয়ায় সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে ২৬ নেতা-কর্মীকে। এই পরিস্থিতিতে ভোটের দিন সংঘাতের আশঙ্কা আছে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন।

বাগেরহাট জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, বাগেরহাটে ভোটদানের জন্য ৫৯৯টি কেন্দ্রে ২ হাজার ৮১৯টি বুথ তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৫৯৯টি কেন্দ্রের সব কটিকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) বিবেচনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বাগেরহাট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী ফারাজী বেনজীর আহম্মেদ বলেন, চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বিনা ভোটে ৩৮ জন নির্বাচিত হয়েছেন।

অন্যান্য জেলার চিত্র…

আগামীকাল চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের ১২টি ইউনিয়ন, কক্সবাজারের চার উপজেলার ১৪টি ও নোয়াখালীর দুই উপজেলার ১৩ ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ হবে। তবে সন্দ্বীপের চার ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় সেসব ইউনিয়নে কেবল সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ভোট গ্রহণ হবে।

কক্সবাজারে যে ১৪ ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ হবে, প্রতিটিতে আওয়ামী লীগ এবং একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিদ্রোহী হওয়ার কারণে ইতিমধ্যে ১১ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে আওয়ামী লীগ। তারপরও তাঁরা ভোটের মাঠ ছাড়েননি।

খুলনায় ১০টি ইউনিয়ন বেশি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মনে করছেন নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর মধ্যে দিঘলিয়া উপজেলার সব কটি (ছয়টি) ও পাইকগাছা উপজেলায় চারটি ইউপি রয়েছে।

অতীতে সবচেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। এখন সেখানেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা উঠে গেছে। মানুষ জেনে গেছে যে দিন শেষে জয়ী হবেন সরকারদলীয় প্রার্থীরা। ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে পণ্ডশ্রম ও অর্থের অপচয় মনে করেন অনেকে। এই অর্থহীন নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে চান না অনেকে। তাঁর মতে, প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকার মধ্য দিয়ে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠছে।

সূত্র : প্রথম আলো

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ