শেরপুরে ড্রাগন ফলের বাণিজ্যিক চাষ বৃদ্ধি, রঙিন স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা

শেরপুরে বিদেশী ফল ড্রাগন চাষের জনপ্রিয়তা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ড্রাগন চাষে কম খরচে লাভ বেশী, খেতে সুস্বাদু মূল্য বেশী। ড্রাগন চাষে সফলতা দেখে অনেকেই এখন এর বাণিজ্যিক চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন। এমনই এক চাষি ঝিনাইগাতি উপজেলা গৌরিপুর ইউনিয়নের কালাকুড়া এলাকায় মো. আল-আমিন। এলাকার শিক্ষিত যুবক আল আমিন ঢাকায় একটি আমদানি-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতেন। ২০২০ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের গ্রামে এসে গড়ে তুলেছেন ড্রাগন চাষের বৃহদ কৃষি খামার। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সার্বিক সহযোগিতায় তাঁদের উদ্ভাবিত লাল রঙের বারী-১ জাতের ৪৫০ টি চারা রোপণের মাধ্যমে তিনি শুরু করেন বাণিজ্যিক চাষ। এক বছরের মধ্যে তার বাগানে ফল উৎপাদন শুরু হয়েছে। তাঁর বাগানে উৎপাদিত একেকটি ফলের উৎপাদন ৪ থেকে ৫ শত গ্রাম। তিনি এখন নিয়মিত চারা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করছেন। তিনি জানান বিদেশি ড্রাগন ফলের তুলনায় বারী-১ জাতের ড্রাগন ফল অধিক মিষ্টি হয়। জেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট পরিসরে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু হলেও বর্তমানে গড়ে উঠেছে বেশকিছু বৃহদ বাণিজ্যিক খামার। নকলা উপজেলায় পোলাদেশী, বাছুর আলগা, মোজার ও রামপুর এলাকার কয়েকজন চাষি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়েক বছর ধরে ড্রাগন চাষ করছেন।

বর্তমানে এসব চাষি ফল বিক্রি ও কাটিং চারা বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকার প্রান্তিক চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের চৈতাজানী গ্রামের সৌদি প্রবাসী মোঃ শাহ আলম বাড়ির সামনে ২০ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন ড্রাগন চাষের খামার এবং পাশাপাশি করেছেন মাল্টা বাগান। তিনিও প্রায় ১ বছর ধরে লাল ড্রাগন (বারি-১) ফলের চাষ করছেন। নকলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ জানান, কৃষকদের ড্রাগন ফল চাষে আগ্রহী করতে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। বাড়ির আঙ্গিনা ও অনাবাদি জমিতে ড্রাগন ফল চাষ করে সহজেই কৃষকরা লাভবান হতে পারেন।

ড্রাগন একটি ফণি মনসা (কেকটাস) প্রজাতির উদ্ভিদ। ড্রাগন ফুল রাতে ফোটে, তাই একে নাইট কুইনও বলা হয়। জেলার কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ড্রাগন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ফল ছিল। দুই দশক ধরে আমাদের দেশে এ ফল আমদানি করা হতো। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফ্লোরিডা, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও চীনে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষাবাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেসব দেশে এই ফলের চাষাবাদ কৃষিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ড্রাগন ফলের চাষ শুরু হয় ২০০৭ সালে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা, ভিয়েতনাম থেকে কয়েক প্রজাতির চারা আমদানি করে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের কোনো কোনো এলাকায় ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করা হয়।

ড্রাগন চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় শেরপুরে এর চাষাবাদ বৃদ্ধি করে কৃষি উৎপাদনে ড্রাগন চাষের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ও নকলা-নালিতাবাড়ীর এমপি বেগম মতিয়া চৌধুরী। তাঁর নির্দেশে ২০১২ ইং সালে জামালপুর হর্টিকালচার সেন্টার কর্তৃক শেরপুর জেলার নকলা উপজেলায় ৩২০ জন প্রান্তিক চাষিকে ড্রাগন ফলের কাটিংকৃত চারা সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি ড্রাগন চাষের উপর প্রশিক্ষণসহ কৃষকদের বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও চারা প্রদান করা হয়। স্থানীয় কৃষি বিভাগের ওই স্বল্প প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়েই নকলা উপজেলার বানেশ্বর্দী ইউনিয়নের মোজারবাজার, পোলাদেশী, বাওসা, চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের রামপুর, বাছুরআলগা এলাকার ১০/১২ জন চাষী বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এবং অনেকেই বসতবাড়ির আঙিনা ও অনাবাদি জমিতে গত কয়েক বছর ধরে ড্রাগন চাষ করছেন।এখন এসব ড্রাগন চাষিদের চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক।

ড্রাগন ফল দেখতে খুবই সুন্দর, খেতে সু-স্বাদু; প্রচুর ভিটামিন সি,মিনারেল ও ফাইবার সমৃদ্ধ। বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ডায়াবেটিস, প্যারালাইসিস ও হার্টের রোগ প্রতিরোধেও ড্রাগন ফলের গুণাগুণ প্রচুর। পুষ্টি ও ঔষধি গুণসমৃদ্ধ এ ফল বিক্রি হয় প্রকারভেদে ৪ থেকে ৫শত টাকা কেজি দরে, অথচ উৎপাদন খরচ কম। নকলা উপজেলার হাবিবুর ও শফিকুল বলেন, ড্রাগন গাছে সামান্য জৈব সার দিলেই চলে। রাসায়নিক সারের তেমন প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না কীটনাশকের‌ও। মাসে একবার ছত্রাকনাশক ছিটাতে হয়। তবে শীতকালে সন্ধ্যার পর আলোর ব্যবস্থা করতে হয়। চারা রোপণের এক/দের বছর পর ফল দিয়ে থাকে। একবার রোপণ করলে টানা ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। পূর্ণ বয়সের একেকটি চারা থেকে প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ কেজি ফল পাওয়া যায়। এ গাছের রোগবালাই এবং মৃত্যুঝুঁকি নেই বললেই চলে। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, শেরপুর জেলার মাটি ও আবহাওয়া ড্রাগন চাষের জন্য উপযোগী। ফলে এ অঞ্চলে ড্রাগন চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে জেলার কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক উন্নতি ঘটবে এবং কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

স্থানীয় চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ড্রাগন চাষে জৈব সার, খুটি ও নিড়ানি মিলে খুব একটা খরচ পড়ে না। সরেজমিনে দেখা যায়, নকলা উপজেলার বানেশ্বর্দী, মোজারবাজার, পোলাদেশী ও রামপুর গ্রামে ড্রাগন ক্ষেতে সাদা-হলুদ বর্ণের দৃষ্টিনন্দন অসংখ্য ফুল এবং লাল রঙের ফল ঝুলছে। ওই ফুলের হাসিতে ড্রাগন চাষীদের চোখে-মুখেও যেন বিরাজ করছে তৃপ্তির হাসি। পোলাদেশী এলাকার চাষী আ. হালিম বলেন, স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহায়তায় ড্রাগন চাষ করে আমরা এখন সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছি। ড্রাগন ফল একবার যে খেয়েছে, বার বার সে খোঁজবেই। রামপুর এলাকার ড্রাগনচাষী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ১৫ শতক পতিত জমিতে ড্রাগন চাষ করেছেন। এখন তার দেখাদেখি অনেকেই ড্রাগন চাষ করছেন। তার বাগানে ড্রাগন গাছ রয়েছে ৩২০টি। বাওসা এলাকার চাষী পারুল বেগম জানান, তার বাগানে গাছ রয়েছে ৮০টি। সংসারের পাশাপাশি তিনি ড্রাগন ক্ষেতে সময় দিয়ে তৃপ্তি পান। তার মতে, ড্রাগন ফুল ও ফল পরিবেশকে নান্দনিক সৌন্দর্য দেয়। এতে খুব একটা বাড়তি ব্যায় নেই, বরং সংসারে বাড়তি আয় হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর খামার বাড়ির উপ পরিচালক ড.মোহিদ কুমার দে বলেন, ২০১২ সালে নকলা উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করা হয়। এখন তা বাণিজ্যিক চাষে রূপ নিয়েছে এবং জেলার সর্বত্র এর চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এজন্য কৃষি বিভাগের তরফ থেকে সব ধরনের টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, এর উৎপাদন খরচ কম হলেও বাজারে চাহিদা ও মূল্য বেশী। বড়ো বড়ো শপিং মলগুলোতে ড্রাগনের কদর বাড়ছে। শেরপুর অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া ড্রাগন চাষের উপযোগী হওয়ায় বসতবাড়ির আঙিনা এবং অনাবাদী জমিতে ড্রাগন ফল চাষ করে যে কেউ লাভবান হতে পারেন। অদূর ভবিষ্যতে জেলায় এর চাষের বিস্তৃতি ঘটলে তা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

 

ডেইলিরূপান্তর/আরএ/এস.

  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ