শিক্ষা নিয়ে কিছু কথা

সাধারণ কথায়, আমাদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ভালো, মন্দ যে জ্ঞান অর্জন করি সেটা হলো শিক্ষা। এ বিষয়টাকে আরেকটু পরিষ্কার করে বুঝতে হলে আগে জানতে হবে জ্ঞান কী? বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে অর্জিত বিদ্যা হলো জ্ঞান। অভিজ্ঞতা হলো বাস্তব সত্যকে বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করা। আর বুদ্ধি হলো অভিজ্ঞতা কিংবা কল্পিত বিদ্যার উপর ভিত্তি করে যে চিন্তা করা হয়, সে চিন্তার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এবং ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা।অর্থাৎ চেতনাকে উপলব্ধি করে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা হলো বুদ্ধি। এ বিষয়গুলোকে বিশ্লেষণ করে যদি শিক্ষা সম্পর্কে জানতে হয় তাহলে সবার আগে বুঝতে হবে, শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? শিক্ষার উদ্দেশ্য কল্যাণ এবং অকল্যাণ দুটোই হতে পারে। তবে প্রতিটি মানুষের শিক্ষার প্রথম উদ্দেশ্য থাকে তার নিজের কল্যাণ।

একেক মানুষের কাছে শিক্ষার উদ্দেশ্য একেকরকম। একেক মানুষের কাছে কল্যাণের অর্থও একেকরকম। কেউ যদি সারা বিশ্বের মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন, তাহলে তার শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে একরকম, আবার কেউ যদি শুধু নিজের কিংবা কোন একটা জাতির কল্যাণের কথা চিন্তা করেন তাহলে তার শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে আরেকরকম। সুতরাং আগে বুঝতে হবে, কে কীভাবে কল্যাণ এবং শিক্ষাকে দেখছেন?

শিক্ষা মানুষ বিভিন্ন জায়গা, বিভিন্ন ব্যক্তি, বিভিন্ন ঘটনা অর্থাৎ বিভিন্ন পরিবেশ থেকে অর্জন করতে পারে। কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য তৈরী হয় পরিবার থেকে। আর এই উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে কল্যাণ এবং শিক্ষার চিন্তাও পরিচালিত হয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষে মানুষে বিভেদ বন্ধ করা, সকল মানুষের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা, কারও ব্যাক্তিস্বাধীনতায় আঘাত না করা, মানুষ জন্মগতভাবে যে ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় সে ক্ষমতাকে স্বীকার করা এবং শ্রদ্ধা করা, তাহলে বুঝতে হবে সেটা শিক্ষা। শিক্ষা হবে সার্বজনীন, শিক্ষা কোন নির্দিষ্ট জাতি কিংবা কারও ব্যক্তিগত কোন বিষয় নয়। কোন শিক্ষা যদি কোন নির্দিষ্ট জাতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় কিংবা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে তাহলে সেটা শিক্ষার অন্তর্ভূক্ত নয়। শিক্ষার প্রথম কথা হলো মানুষে মানুষে বিভেদ বন্ধ করা।

শিক্ষা অর্জনের পদ্ধতি মূলত দু’ধরণের

এক. পারিবারিক পদ্ধতি।
দুই. প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি।

পারিবারিক পদ্ধতিতে সন্তান জিনগত এবং আচরণগত উভয়দিক থেকেই বাবা-মায়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়। বাবা-মায়ের মেধা, প্রতিভা এবং নৈতিক শিক্ষা সন্তানের উপর প্রভাব সৃষ্টি করে, বাবা-মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক, বাবামায়ের শিক্ষা এবং সংস্কৃতি সন্তানের জন্য উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মতো, যা ত্যাগ করা আদৌ সম্ভব হয়না। সন্তানের নৈতিক ভিত্তি পরিপূর্ণরুপে গড়ে উঠে পরিবার থেকে। আর এই পারিবারিক শিক্ষাকে আরেকটু ধারালো, বিস্তৃত এবং সার্বজনীন করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম উদ্দেশ্য হলো সনদপত্র অর্জন, যার ফলে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পদার্পণের জন্য দরজা উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়। একই শিক্ষা এবং ধারার অন্তর্ভূক্ত হয়ে সবাই একে অপরকে বুঝতে পারে, যার ফলে সবাইকে একটা নির্দিষ্ট জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আরও কিছু লক্ষ্য হলো, কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষা দেওয়া, বিশ্বজগৎ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা, বেকারত্ব দূরীকরণ, সময়ের সাথে তাল রেখে নিজের জীবনকে তৈরী করা, সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকা, বড় সমস্যা এবং ছোট সমস্যা সম্পর্কে অবগত হওয়া, সমস্যার সমাধান খুঁজা এবং সর্বোপরি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যদি এমন হয় তাহলে যে শিক্ষার্থী সে শিক্ষা অর্জন করবে তাকে নিশ্চিতভাবে শিক্ষিত মানুষ বলা যায়। জ্ঞান অর্জনের একটা বিশেষ পদ্ধতি হলো বই পড়া, যুক্তিতর্ক করা, লেখালেখি করা। বইয়ের প্রতি যে মানুষের নেশা আছে, যুক্তিতর্ক করার জন্য যার ধৈর্য আছে এবং লেখালেখি করার যার প্রতিভা আছে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নাহলেও চলে। কারণ, সে তার জ্ঞানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উর্ধ্বে চলে গেছে।

যদি তার পারিবারিক শিক্ষার ভিত্তি পাকাপোক্ত থাকে তাহলে সনদপত্র ছাড়াও সে পূর্ণাঙ্গ মানুষ, এতে কোন সন্দেহ নেই। মানুষ প্রথমে জীব হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এজন্য জীববৃত্তি তার মূল বৈশিষ্ট্য। যে বিভেদক লক্ষণ মানুষকে অন্য জীব থেকে আলাদা করে সেটা হলো বুদ্ধিবৃত্তি। বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন জীব হিশেবে মানুষ নিজেকে পরিচয় দিতে হলে তাকে শিক্ষিত হতে হবে। আর শিক্ষা হতে হবে সর্বজন স্বীকৃত। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের পারিবারিক শিক্ষার অবস্থা খুবই নিম্ন শ্রেণীর। কোন রাষ্ট্রে পারিবারিক শিক্ষা মানসম্মত হলে সে রাষ্ট্রে নামমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হলেও সমস্যা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ মানুষকে সুস্থ, সুন্দর জীবন দিতে হলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই পরিপূর্ণরূপে শিক্ষিত করে তুলতে হবে, কেননা এরা পরিবার থেকে যে শিক্ষা পাওয়ার কথা, সেটা পায়নি, যে নৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠার কথা, সেটা গড়ে উঠেনি। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে কাউকে যেকোন ধরণের স্পর্শকাতর দায়িত্ব দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও তিন পুরুষ (বাবা-মা উভয় ক্ষেত্রে) পর্যন্ত স্থায়ী না হলে তার সুফল পাওয়া অনেকাংশে কঠিন হয়ে পড়ে।

শিক্ষাকে সর্বজন স্বীকৃত করার উদ্দেশ্যেই মূলত প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি এবং পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরীক্ষায় যদি কেউ পাস করে সনদপত্র অর্জন করেন তাহলে সে সনদপত্র সর্বজন স্বীকৃত। ধরুন, আমি একজন নিরক্ষর মানুষকে বললাম শিক্ষিত। তাই বলে কি সে শিক্ষিত হয়ে যাবে? অবশ্যই নয়। তবে যে সনদপত্র অর্জন করেছে, সে যে কমবেশি লিখেই সনদপত্র অর্জন করেছে সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত, সে যে নিরক্ষর নয় সেটাও নিশ্চিত এবং তার সনদপত্রকে কারোর অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। উপরের পরিবেশে উঠতে হলে, উপরের প্রতিষ্ঠানে যেতে হলে যে সনদপত্রের প্রয়োজন হয়, সে সনদপত্র কখনোই অর্থহীন নয়। মানুষ শুধু বই থেকে জ্ঞান অর্জন করেনা। পরিবেশ থেকে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান অর্জন করে। একটা মানুষের চিন্তা, চেতনাকে জানলে লক্ষ বইকে জানা হয়ে যেতে পারে। মাত্র একটা মানুষই হয়ে যেতে পারে লক্ষ বইয়ের সমষ্টি। সুতরাং শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, সুস্থ পরিবেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেওয়ার জন্য সনদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বই থেকে মানুষ যতটুকু জ্ঞান অর্জন করে, তারচেয়ে অনেক বেশি অর্জন করে পরিবেশ থেকে।

“সৎ সঙ্গে স্বর্গে বাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ” প্রবাদটি যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে অস্বীকার করার সুযোগ কী?

আপনি যাকে কেবলমাত্র একটা সনদপত্র বলছেন, জড়বস্তু বলছেন সেটা আপনাকে মানুষ হতে সহায়তা করে। এ জড়বস্তু আপনাকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে, মানুষের দাসত্ব করার চেয়ে সনদপত্রের দাসত্ব করা অনেক ভালো। তাগিদ না থাকলে, ত্যাগ না থাকলে সনদপত্র অর্জন করা যায়না। পচনধরা পারিবারিক শিক্ষা থেকেও অনেকসময় মুক্তি দিতে পারে এই সনদপত্রই। সুশিক্ষিত হতে হলে, সুশিক্ষা মানুষের কাজে লাগাতে হলে, অবৈধ মানুষের হাত থেকে চেয়ার দখল করতে হলে সনদপত্রের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার গুরুত্ব কী তা নিজেই ভেবে দেখুন।

 

লেখক: সাংবাদিক, গল্পকার ও শিক্ষানবীশ আইনজীবি। প্রাক্তন প্রভাষক।

  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ