‘ইসলামিক এমিরেট’ আফগানিস্তান ও শরিয়া আইন

তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে চীন। রাশিয়া এবং ইরান আর একটু সময় নেবে। পাকিস্তান এখনও হিসাব মেলাতে ব্যস্ত, তার লাভ-ক্ষতি নিয়ে। সবাই যখন রাজনৈতিক হিসাবে ব্যস্ত, চীন-রাশিয়া তখন অর্থনৈতিক হিসাবে ব্যস্ত। আফগানের মাটির নিচে রয়েছে স্বর্ণসহ তেল-গ্যাস আর নানা মূল্যবান রত্নের সম্ভার। তাই মাটির ওপরে নয় নিচের দিকে চীন-রাশিয়া-ইরানের নজর। ওপর-নিচের হিসাব নিয়ে অন্যদিন লিখব। আজ দেখি রাজনৈতিক পর্বে কি হচ্ছে। তালেবানরা প্রকাশ্যেই ভারত বিরোধী। ভরতীয় কূটনীতিকরা তাই রাশিয়া সাথে যোগাযোগ করছে, একটা সুরাহার জন্য।

আফগানিস্তানকে ‘ইসলামিক এমিরেট’ ঘোষণা দিয়ে নতুন সরকার গঠন করেছে তালেবানরা। তত্ত্বাবধায়ক এ সরকারের প্রধান করা হয়েছে মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ’কে। তাকে প্রধান করে  ঘোষণা করা হয়েছে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মন্ত্রীপরিষদ। তবে নবগঠিত এই সরকারে মন্ত্রী পদে কোনো নারীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কে থাকবেন তাও ঘোষণা করা হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে তালেবান মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ এ ঘোষণা দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, এ সরকারের উপনেতা বা ডেপুটি লিডারের দায়িত্ব পালন করবেন আবুল গণি বারাদার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। তিনি হাক্কানি মিলিট্যান্টদের নেতা। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছে তার নাম। অন্যদিকে তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুবকে দেয়া হয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব। হায়বাতুল্লাহ বদ্রিকে বানানো হয়েছে ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী। কাবুল থেকে আল জাজিরার সাংবাকি চার্লস স্ট্র্যাটফোর্ড বলছেন, এখন পর্যন্ত যাদের নাম ঘোষণা করেছেন মুজাহিদ, তারা সবাই পুরনো মুখ। তিনি আরো বলেছেন, এসব ব্যক্তির বেশির ভাগই প্রকৃতপক্ষে পস্তুন উপজাতির। তবে এক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশগ্রহণ বিবেচনা করা হয়নি বলে সমালোচকরা বলছেন। চার্লস স্ট্র্যাটফোর্ড বলেছেন, পাঞ্জশির উপত্যকা নিয়ে মুজাহিদ যে মন্তব্য করেছেন, তা ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। ওই উপত্যকায় প্রধানত তাজিক সংখ্যালঘু জাতির বসবাস। কিন্তু মুজাহিদ তাদের উদ্দেশে বলেছেন, তাজিকরা যেখানেই থাকুন না কেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমাদের ভবিষ্যত প্রশাসনে তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে মুজাহিদ আবারো বলেছেন, তারা যে সরকার গঠন করেছেন তা শুধু ‘ভারপ্রাপ্ত’ সরকার। তারা দেশের অন্য অংশের জনগণকে এর অংশ করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। এখানে উল্লেখ করার বিষয় হলো, আফগানিস্তানে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণির সরকারকে উৎখাত করে গত মাসে ক্ষমতা দখল করে তালেবানরা। তারা সবার অংশগ্রহণমূলক একটি সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বলেছিল, আফগানিস্তানের সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এমন কি নারীরাও তাতে যুক্ত থাকবেন।

তালেবানদের এই অন্তর্র্বতীকালীন সরকার তাদেরই উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে আবদ্ধ। তবে মোল্লা হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা এই সরকারে কোনো ভূমিকা আছে কিনা এখনও তা বলেনি তারা। এমনকি গত মাসে তালেবানরা ক্ষমতা নেয়ার পর তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এমনকি তার কণ্ঠও শোনা যায়নি। তালেবানদের এই সুপ্রিম কমান্ডার আখুন্দজাদা রয়েছেন দলটির রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় বিষয়ক চার্জে।

ওদিকে ১৯৯৪ সালে চারজন নেতা মিলে প্রতিষ্ঠা করেন তালেবান গ্রুপটি। এর মধ্যে অন্যতম আবদুল গণি বারাদার। তাকে নতুন প্রশাসনের ডেপুটি প্রধান বানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তালেবানদের নতুন শাসনে নেতৃত্বে থাকা কে এই মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ- এ সম্পর্কে জানার কৌতুহল সবার। এ বিষয়ে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন লিখেছে, হাসান আখুন্দ কান্দাহার প্রদেশের। এই প্রদেশটি হলো তালেবান আন্দোলনের জন্মভূমি। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবানদের যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তাতে তিনি পালন করেছেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী এবং কান্দাহারের গভর্নরের দায়িত্ব।

তিনি তালেবান আন্দোলনের সহপ্রতিষ্ঠাতা। তালেবান প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মোল্লা ওমরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন হাসান আখুন্দ। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করেছেন তিনি। হাসান আখুন্দের বয়স ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি বলে মনে করা হয়। তবে তার চেয়েও বেশি হতে পারে তার বয়স। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তার বিরুদ্ধে যে অবরোধ ঘোষণা করেছে তাতে, তাকে ৭৬ বছর বয়সী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তালেবানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তিশালী পরিষদ রেহবারি শুরা বা নেতৃত্ব বিষয়ক পরিষদের প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করছেন হাসান আখুন্দ। বিশ্লেষকরা তাকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখে থাকেন। তার রয়েছে রেহবারি শুরা’র ওপর নিয়ন্ত্রণ। সামরিক বিষয়েও তার সিদ্ধান্ত য়োর এক্তিয়ার আছে। তালেবানের সিনিয়র নেতৃত্বের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি বয়সী। তালেবানের আন্দোলনে আর্থিক এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে থাকেন তিনিই। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন তিনি।

আফগানিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানির নাম রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে এফবিআইয়ের সন্ত্রাসের তালিকায়। তিনি হাক্কানি নামের একটি মিলিট্যান্ট গ্রুপের প্রধান। তালেবানদের সঙ্গে এই গ্রুপটির সখ্য আছে। দু্ই শতক ধরে আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় বেশ কিছু ভয়াবহ হামলায় জড়িত এই গ্রুপটি। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালে রাজধানী কাবুলে একটি ট্রাকবোমা বিস্ফোরণ। এতে কমপক্ষে ১৫০ জন মানুষ নিহত হন। তালেবানদের মতো বিস্তৃত নয় হাক্কানি নেটওয়ার্ক। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই তাদেরকে একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

তালেবান সুপ্রিম নেতা মৌলভী হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদার পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে আফগানিস্তানে শরিয়া আইন বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ইংরেজিতে দেয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ও অন্য সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যোগাযোগের ভিত্তিতে শক্তিশালী ও সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠবে বলে মনে করে তালেবানরা। সতর্কতার সঙ্গে বলা হয়েছে, ইসলামিক আইন এবং দেশের জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ নয়- এমন আন্তর্জাতিক আইন এবং চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবে তালেবানরা।

তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানকে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যের খাদ্য, শীতকালীন বিভিন্ন পণ্য, টিকা এবং ওষুধ সরবরাহ দেবে চীন।  চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘোষণা দিয়েছে। অনলাইন সিএনএন এ খবর দিয়ে বলছে, আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে প্রথম ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং। বলা হয়েছে, এসব সরবরাহ আফগান জনগণের জরুরি ব্যবহারের জন্য পাঠানো হবে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া বলেছে, প্রথম ব্যাচে আফগানিস্তানকে ৩০ লাখ ডোজ করোনার টিকা স্থান করার ঘোষণা দিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। এর আগে চীনের নেতারা বার বার বলেছেন, বিশ্বকে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শেগুলোকে করোনা ভাইরাসের টিকা শেয়ার করবে চীন। কর্মকর্তারা এর আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সামনে থাকবে আফগানিস্তান।

বেইজিং থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ভার্চ্যুয়াল মিটিয়ে বক্তব্য রাখেন ওয়াং ই এ সময় তিনি বলেন, অন্য দেশের চেয়ে আফগান জনগণকে অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা সরবরাহ দিতে অধিক বেশি বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার এবং তার পরপরই তালেবানদের ক্ষমতা নেয়ার প্রেক্ষাপটে ওয়াং ই বলেন, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় আফগানিস্তানকে সাহায্য করে নিজেদের দায়িত্ব পালন শুরু করা উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। তবে এক্ষেত্রে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান খোতে হবে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই তালেবানদের প্রতি আহ্বান জানান সন্ত্রাস মন করতে এবং দেশের সব জাতিগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের প্রতিবেশী শেগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, ইরান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের উচিত সমন্বয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করা। যাতে তালেবানরা দেশকে গড়ে তুলতে পারে। রাজনৈতিক কাঠামোকে গড়ে তুলতে পারে সবার অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে।

উল্লেখ্য, চীনের পশ্চিমাঞ্চল সিনজিয়াংয়ের সঙ্গে চীনের রয়েছে ৫০ মাইল বা ৮০ কিলোমিটার সীমান্ত। আছে এসব অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ। জুলাইয়ে তালেবান নেতাদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠক হয় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। এ প্রসঙ্গে তালেবানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেনাবাহিনী এবং আফগানিস্তানের রাজনৈতিক শক্তি বলে উল্লেখ করেন ওয়াং ই ঘোষণা দেন, আফগানিস্তানে শান্তি, পুনরেকত্রীকরণ এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে চীন। এর প্রতিদান দিতে, চীনকে একটি ভাল বন্ধু বলে মন্তব্য করেছে তালেবানরা। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীনের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডে লিপ্ত কাউকে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে দেবে না তারা।

 

লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক

  • 21
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ