চুনারুঘাটে আশ্রয়ণের ৫০০ আসমানী’র গল্প

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার শানখলা ইউনিয়নের পানছড়িতে ২০০০ সালে পাঁচটি টিলার ওপর নির্মাণ করা হয় পানছড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প। সেখানে ৫০টি টিনের ব্যারাকের প্রতিটিতে তৈরি করা হয় ১০টি করে ঘর। তাতে ঠাঁই পায় ৫০০ ভূমিহীন পরিবার। এর তত্ত্বাবধায়নে ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এতো বছরে কোনো সংস্কার না হওয়ায় ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ২০টি ব্যারাক ভেঙে পড়ায় আশ্রয় হারিয়ে এরইমধ্যে অন্তত ২০০ পরিবার প্রকল্প ছেড়ে চলে গেছে। যারা রয়ে গেছেন তারা আছেন নানা সংকটে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধির হিসেবে, এখন সেখানে ৩০টি ব্যারাকের ৩০০ ঘরে বসবাস করে সাড়ে তিন হাজার মানুষ তাদের অভিযোগ ২০ বছরের মধ্যে কেউ ঘর মেরামত করে দেয়নি। এলাকার প্রভাবশালীদের হাতে বেদখলও হয়ে গেছে আশ্রয়ণের কিছু অংশ প্রকল্পের বাসিন্দা রাসেল মিয়া বলেন, আমি যখন ছুট ছিলাম তখন সরকার আমগো ঘর দিছিল কিন্তু দুঃখের কথা, আমি যখন থাকিয়া বুঝ শিখছি, কুনোদিন দেখি নাই সরকার আমগো কুনো খুঁজখবর নিছে। টিনের একচালা ঘরগুলার মেয়াদ আরও আগেই শেষ হই গেছে। তাও সরকার আমরার ঘর মেরামত করছে না। এক বান্ডিল টিনও পাই নাই আমরা।

আরেক বাসিন্দা হালেমা বেগম বলেন আমার ঘরটা একবারে ভাইঙা গেছেগা। হালকা বাতাস আইলে ডর লাগে। টিনগুলা খুইল্লা খুইল্লা পইরা যায়গা। মেম্বর-চিয়ারম্যানরে কতবার কইছি, আমরারে টিন দিবার লাগিয়া, কেউ দিছে না। কিতা করমু। যাওনের যখন জায়গা নাই, ইখানই থাকন লাগব। ১ নম্বর টিলার হাফিজা খাতুন বলেন, কয়দিন আগে আমরার বেরাকের একটা ঘর আগুন লাগছিল। ই সময় আমার ঘরসহ আমরার বেরাকের ১০টা ঘরই পুইরা গেছে। অখন আমি মানুষের রান্ধাঘর থাকি। ইউনু (ইউএনও) স্যার আইয়া কইছলা আমারে একটা ঘর দিবা। অখনও দিছুইন না।

শানখলা ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য তাউছ মিয়া জানান, ২০ বছর আগে পানছড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দ পাওয়া ৫০০ পরিবারে সদস্য ছিল ১ হাজার ২০০। এখন তা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার। বাসিন্দা বাড়লেও ঘর বাড়েনি। স্থানীয় আব্দুল খালেক জানালেন, ২০ বছর আগে যারা ঘর পেয়েছিলেন, তাদের পরিবারে ছিল চার থেকে পাঁচজন সদস্য। সেসব পরিবারের শিশুরা বড় হয়েছে, তাদের বিয়ে হয়েছে, সন্তান হয়েছে। তাতে বেড়েছে পরিবারের সংখ্যা। ছোট একটি ঘরের মধ্যে এমন দুই-তিনটি করে পরিবার থাকছে।

প্রকল্পের বাসিন্দা বুলবুল মিয়া বলেন, ‘আমি যখন ঘর পাই তখন আমরা পাঁচজন আছলাম। আমি, আমার স্ত্রী, দুই পুয়া (ছেলে), এক পুরি (মেয়ে)। তাগো বিয়া দিছি। হেগো ঘরেও পুয়া-মাইয়া হইছে। ছুটো এই ঘরে অত মানুষ কেমনে থাহে (থাকে)। তার উপ্রে মাইয়া নাইওর আইলে আরও বিপদ। চুনারুঘাট শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি এলাকায় এই পানছড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প। সেখানে উপার্জনের কোনো মাধ্যম নেই বলে কাজের জন্য শহরে আসতে হয় বাসিন্দাদের।

সেখানকার সুমন মিয়া জানান, বেশিরভাগই চুনারুঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে রিকশা চালান কিংবা দিনমজুরি করেন। কেউ কেউ আবার পাহাড়ি এলাকায় লাকড়ি কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। প্রকল্পের বাসিন্দা ছবিরা বেগম বলেন, আমার স্বামী লাকড়ি কুড়াই সংসার চালায়। এক বছর ধরি করোনার কারণে লাকড়ি বিক্রি করতাম পারতাছে না। এর লাগি আমরা খুব কষ্টে আছি। খাই না খাই দিন কাটাই এই প্রকল্পে বিশুদ্ধ পানির সংকট এখন তীব্র। প্রতি ৩০টি পরিবারের জন্য সেখানে দুটি করে টিউবওয়েল আছে। পাহাড়ি এই এলাকায় ছড়া বা খাল না থাকায় প্রাত্যাহিক সব কাজ ও পানের জন্য এসব টিউবওয়েলই একমাত্র ভরসা।

প্রকল্পের বাসিন্দাদের জন্য শুরুর দিকে উঁচু টিলার ওপর দুটি পুকুর খনন করা হয়। পানি জমে না বলে সেগুলো এখন খেলার মাঠ। প্রকল্পের একটি কবরস্থান ও শ্মশান বেদখল হয়ে যাওয়ায় কেউ মারা গেলে দূরে নিয়ে শেষকৃত্য করতে হয় বলে জানালেন বাসিন্দারা। প্রবীণ মানিক মিয়া বলেন, আমরার ঘরর লগে একটা কবরস্থান দিছিল কবরস্থানের পাশেই জানাজা পড়ার জায়গা আছিল। কিন্তু উটা অখন দখল করে নিছে এলাকার বড় লুকেরা। কবরস্থান ও শ্মশানের মাঝে গাছ লাগাই দিছে। কিছু কইলেই আমাগো মারপিট করে।

কারা দখল করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন ভাই তারার নাম কওয়ার সাহস আমগো নাই। নাম কইলে আপনেরা গেলেগা আমগো মারপিট করব হেরা আশ্রয়ণের আশপাশে নেই কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। এসব কিছুর জন্য যেতে হয় শহরে। আশ্রয়ণের বাসিন্দা জরিনা আক্তার জানান, ছেলেমেয়েরা দূরে গিয়ে পড়তে চায় না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না বলে অভিভাবকরাও সন্তানদের আনা নেয়া করতে চায় না তিনি বলেন, শুধু স্কুল না আমরার ইখানো দরকার একটা ক্লিনিকও ইখানে কেউ অসুস্থ হইলে অনেক দূরের পথ গিইয়া চুনারুঘাট নাইলে হবিগঞ্জ যাওয়া লাগে আর রাইতে কেউ অসুস্থ হইলে অবস্থা একেবারেই খারাপ।

পানছড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের এসব সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে বলে জানালেন শানখলার ইউপি সদস্য তাউছ মিয়া। তিনি বলেন আমরা ঘর গুলো সংস্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে দেখলাম এগুলা সংস্কারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখন নতুন করে ঘর তৈরির জন্য উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে। এখানে বাস করা মানুষরা খুবই কষ্টে আছে। ঘর নেই, কাজ নেই, পানি নেই। আমি মেম্বার হওয়ার পর থেকে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহযোগিতা করে আসছি।’

চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সত্যজিত রায় দাশ বলেন, পানছড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পটি আমি নিজে পরিদর্শন করে এসেছি। সেখানে মানুষজন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমরা মাস তিনেক আগে নতুন ৩২টি ব্যারাক নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। বরাদ্দ পেলেই কাজ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, সেখানে পুকুরগুলো টিলার ওপরে হওয়ায় পানি ধরে রাখতে পারে না। পানি সংকট দূর করতে টিউবওয়েল বসানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মধ্যেই যাতে একটি ক্লিনিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় করা যায়, তার ব্যবস্থাও করা হবে।

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ