কোন পথে আফগানিস্তান?

আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিবর্তন গোটা বিশ্বের রাজনীতিকে এলোমেলো করে দিয়েছে। যার প্রভাব দেখতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়াতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ভারত। আর সবচেয়ে লাভবান হয়েছে চীন।

২০ বছরের যুদ্ধ। হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানী। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত। মোল্লা ওমরসহ তালেবানের অনেক নেতাকে হত্যা। প্রথম সারির দু’চারজন পালিয়ে দেশের বাইরে অবস্থান নিয়েছিলেন। এরপরও যারা তালেবানের ঝান্ডা উঁচু করে ধরেছিলেন, তাদেরকে নির্মূলে ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো আফগানিস্তানে হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। আফগানিস্তানের সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তৈরি করেছে ৪৫ হাজার অনুগত বাহিনী (রাজাকার)। ২০ বছরের সেই যুদ্ধ, অর্থ ব্যয়, এত প্রাণহানী, হতাহত, বাস্তুচ্যুত মানুষ- এসবের ফল দাঁড়াল শূন্য।

মার্কিনিরা যে সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, তারা লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। তালেবানরা হাসতে হাসতে জয় করে নিয়েছে কাবুলসহ পুরো দেশ। আর গোপনে নিজের দেশের অসহায় মানুষদের পিছনে ফেলে পালিয়ে গেছেন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি। অভিযোগ আছে সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন ১৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন গণি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। যা হোক, এখন আফগানিস্তান তালেবানের কব্জায়। কেন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছে, কেন তারা এতদিন সেখানে অবস্থান করেছে?

২০০১ সালের কথা। নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে ৯ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলা হয়। এতে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন। এর জন্য দায়ী করা হয় ইসলামপন্থি গ্রুপ আল কায়েদাকে এবং এর নেতা ওসামা বিন লাদেনকে। তখন লাদেন ছিলেন আফগানিস্তানে। সেখানে তালেবানের অধীনে তিনি ছিলেন সুরক্ষিত। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ছিল এই তালেবানরা। তারা লাদেনকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক হামলা শুরু করে। এতে দ্রুতই তালেবানরা হারিয়ে যায়। এ সময় আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। পক্ষান্তরে তালেবানরা তাদের পকেটগুলোতে সরে গিয়ে নতুন করে সংগঠিত হতে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই যুদ্ধে যোগ দেয় ন্যাটো মিত্ররা। ২০০৪ সালে আফগানিস্তানে নতুন এক সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু তালেবানদের হামলা অব্যাহত থাকে। এক পর্যায়ে ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নতুন করে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। এতে তালেবানরা আরো পিছু হঠতে বাধ্য হয়। তবে সে অবস্থা বেশিদিন থাকেনি। ২০০১ সালের পর ২০১৪ সালের শেষের দিকে দেখা যায় এ বছরটি ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত। ন্যাটো বাহিনী তাদের যুদ্ধমিশন সমাপ্ত করে। দেশের নিরাপত্তা আফগানিস্তানের সেনাদের ওপর ন্যস্ত করে। এখান থেকেই তালেবানরা গতি পেতে শুরু করে। আস্তে আস্তে তাদের উত্থান বাড়তে থাকে। দখল করতে থাকে একের পর এক ভূখন্ড।

এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। তবে তার সঙ্গে খুব একটা জড়িত ছিল না আফগান সরকার। এরই মধ্যে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারের রাজধানী দোহা’য় সেনা প্রত্যাহার নিয়ে একটি চুক্তি হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে এই চুক্তি তালেবানদের হামলাকে থামাতে পারেনি। আফগানিস্তানের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বা সাধারণ নাগরিকের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে তারা তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করে। শুরু হয় টার্গেট করে হত্যা। এমনিভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণের এলাকাগুলোর পরিধি বাড়তে থাকে।

সব মিলিয়ে নিষ্ফল এই যুদ্ধে কত প্রাণ বিলীন হয়েছে, তার অবশ্যই সুস্পষ্ট কোন উত্তর নেই। তবে আফগান যুদ্ধে হামলাকারী জোটের সদস্যদের মারা যাওয়ার রেকর্ড যেভাবে রাখা হয়েছে, আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ বা তালেবানের কতজন মারা গেছেন, তার রেকর্ড সেভাবে কেউই রাখেনি। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির হিসাব মতে, আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীর কমপক্ষে ৬৯ হাজার নিহত হয়েছেন এই যুদ্ধে। পক্ষান্তরে ৫১ হাজার বেসামরিক মানুষ এবং ৫১ হাজার মিলিট্যান্ট নিহত হয়েছেন বলে তাদের হিসাব। ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তানে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩৫০০ সেনা। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিনি। আহত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে ২০ হাজার সেনা সদস্য। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সারা বিশ্বে আফগানিস্তান হচ্ছে তৃতীয় বৃহৎ বাস্তুচ্যুত মানুষের দেশ।

২০১২ সালের পর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ পালিয়েছেন। তারা ঘরে ফিরতে সক্ষম হননি। তারা হয়তো আফগানিস্তানের ভিতরেই অবস্থান করছেন অথবা প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এই যুুদ্ধে কি পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে ব্রাউন ইউনিভার্সিটি। এর মধ্যে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে সামরিক ও পুনর্গঠন তহবিলে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৯৭৮০০ কোটি ডলার।

আফগান যুদ্ধের ফল শূন্য হলেও নতুন প্রশ্ন সামনে কি ঘটতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে- তা নিয়ে সারাবিশ্বে আগ্রহের শেষ নেই। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ সারাবিশ্বের টেলিভিশন চ্যানেল, মিডিয়া এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এর কারণ, তালেবানদের পশ্চিমা দেশগুলো ভাল চোখে দেখে না। তাদেরকে পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে কট্টরপন্থি হিসেবে দেখা হয়। এখন তাদের সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক হচ্ছে সেই পশ্চিমাদের। তালেবানের মুখপাত্র সুহেইল শাহিন বলেছেন, তার গ্রুপ ও সংখ্যালঘুদের সম্মান দেখাবে এবং তা হবে আফগানিস্তানের আদর্শ ও ইসলামিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। পুরো দেশের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। তারা আরো বলেছে, তারা চায় নতুন সরকারে নারীরা যোগ দিন। যদিও তা সত্তে¡ও নারীদের কাজ করার স্বাধীনতা নিয়ে ভীতি আছে। তাদের পোশাক বেছে নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ আছে। এমনকি তালেবান শাসনের অধীনে তাদের ঘর থেকে বের হওয়া নিয়েও উদ্বেগ আছে।

তালেবানকে দমন করা এবং সন্ত্রাস প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকার কৌশলগত অবস্থান এই মুহূর্তে আগের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এমনটাই মনে করছেন ইন্দো-আমেরিকান আইনজীবী আর ও খান্না। প্রতিনিধি পরিষদে সিলিকন ভ্যালির প্রতিনিধিত্বকারী খান্না ডেমোক্রেটিক ভাইস চেয়ারম্যান পদে আসীন।

খান্না বলেছিলেন যে তিনি জাতীয় সুরক্ষায় ভারত-মার্কিন অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। কিন্তু এখন ভারতীয়দের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আমরা কী করব? ভারত সরকার জানিয়েছে, আমাদের নীতি, ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’। সত্যিকথা বলতে, ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ ছাড়া অন্য কোনও নীতি গ্রহণের কি কোনও উপায় রয়েছে? আমেরিকা কেন এমন করল? এর সবটাই ভারতের বিদেশমন্ত্রণালয়ের কাছে অপ্রত্যাশিত! ২০২০ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে আফগানিস্তানে ভারপ্রাপ্ত আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি যখন তালেবানের ডেপুটি লিডার মৌলানা আবদুল গণি বরাদরের সঙ্গে দোহাতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, তখন ঠিক হয়েছিল যে, আমেরিকার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। সেই সময় মার্কিন মসনদে বসে আছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। সে কথাই জো বাইডেন বললেন ২০২১-এর ১৪ এপ্রিল, আমেরিকা ৯/১১-র বার্ষিকীর আগেই নিঃশর্তে সেনা প্রত্যাহার করে নেবে।

আসলে, আমেরিকা ভেবেছিল, এই সময়ে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া ভাল। তার কারণ, যে-সরকার আফগানিস্তানে ছিল, তারা দুর্নীতির কারণে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল। আর, আমেরিকাও নানা আর্থিক সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছিল। আমেরিকার নাগরিকরা মনে করেছে, আমেরিকার ইরাক, আফগানিস্তানে নাক গলানোর দরকারটা কী! কিন্তু তালেবানরা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েই, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে, এভাবে রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্য বিস্ফোরণ ঘটাবে- তা বাইডেন প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। এখন তালেবান সরকার কী চরিত্রের হবে, তা নিয়েও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে। এক হতে পারে, প্রচন্ড কট্টরবাদী তালেবান সরকার, যা শুধু পাকিস্তান নয়, চীন ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণেও থাকবে। সবটা দেখতে সময় লাগবে।

লেখক : সাংবাদিক, ইয়াহিয়া নয়ন।

 

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 83
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ