শেরপুরে বিলুপ্তির পথে মাটির ঘর

এক সময় এলাকাভেদে মাটির ঘর তৈরি ছিল বাসস্থানের একমাত্র অবলম্বন। শীত গরমে ঘরগুলো আরামদায়ক বাসস্থান। দৃষ্টিনন্দন ঘরগুলো ঐতিহ্যও বহন করে। শেরপুরের নকলা, নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলায় বিশেষ করে পাহাড়ী অঞ্চলে মাটির ঘর তৈরি হতো। তবে কালের স্রোতে আজ বিলুপ্তের পথে।

উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে মাটির ঘর নির্মাণে আগ্রহ নেই আর মানুষের। এক সময় উপজেলার পাহাড়ী এলাকার ধনী গরিব প্রায় প্রতিটি বাড়িতে মাটির ঘর ছিল।

জানা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বন-জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ী এলাকায় চোর ডাকাতের খুব উপদ্রব ছিল। বাঘ-ভাল্লুকসহ নানা হিংস্র প্রাণীর ভয়ও ছিল বেশি। ছিল না বিদ্যুৎ সংযোগ। ইট বালু সিমেন্টের ব্যবহার না থাকায় সে সময় নিরাপত্ত্বার জন্য পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষ মাটির ঘর তৈরি করতেন। কোঠাঘরের আরেকটি বিশেষত্ব ছিল। গরমের সময় ঠান্ডা এবং শীতের সময় গরম অনুভূত হওয়া। এছাড়া খুব সহজেই তৈরি করা যেতো এ ঘর। প্রয়োজন হতো এঁটেল দো-আঁশ মাটি। তেমন কোন খরচ হতো না।

কৃষাণ-কৃষাণী ও তাদের ছেলে-মেয়েরা মিলেই অল্প কয়েক দিনেই তৈরি করতেন। মাটিতে কোদাল দিয়ে ভালো করে গুড়িয়ে নেওয়া হতো। তারপর পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে থকথকে কাঁদা বানাতেন। সেই মাটি দিয়েই হয় ঘর। অল্প-অল্প করে কাঁদা মাটি বসিয়ে ৬ ফুট থেকে ৭ ফুট উচ্চতার পূর্ণাঙ্গ ঘর তৈরি করতে সময় লাগতো মাত্র মাস খানেক। সম্পূর্ণ হলে তার উপর ছাউনি হিসেবে ব্যবহার হয় ধানের খড়। এমনভাবে ছাউনি দেয়া হয় যেন ঝড়-বৃষ্টি কোন আঘাতেই তেমন একটা ক্ষতি করতে না পারে।

আবার ধনীদের বাড়ীতে থাকতো বিভিন্ন নকশা করা দুই তালা ঘর। কারো কারো বাড়িতে শত বছরের মাটির তৈরি দু‘তলা বাড়ী লক্ষ্য করা যায়। নলকুড়া ইউনিয়নের সন্ধ্যাকুড়া গ্রামের হুক্কে মজিদ ও নলকুড়া গ্রামের সালাম জানান তাদের বাড়িতে দুতলাসহ একাধিক মাটির ঘর ছিল। আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং এলাকায় ইট ভাটার কারনে বাপ-দাদার আমলের দোতলা মাটির ঘরটিও ভেঙে পাকাঘর তৈরি করেছেন। তবে তাদের এলাকায় এখনও অনেক বাড়িতে মাটির ঘর রয়েছে।

অনেক বাড়িতে শত বছরের পুরনো দোতালা বেশ কয়েকটি মাটির ঘর ছিল। এলাকায় শিল্পকারখানা হওয়ায় লোকসমাগম বেড়ে গেছে। সে কারণে তা ভেঙে পাকাঘর ঘরে সবাই ভাড়া দিয়েছে। যারা ধন-সম্পদের মালিক থাকতো তারাই দোতালা মাটির ঘর করে বাড়ি বানাতো।

জেলার পাহাড়ী এলাকায় ঘুরে মাটির ঘর লক্ষ করা গেলেও পরিমাণে সেটা খুবই কম। যাদের সামর্থ্য একেবারেই নেই তারাই এখনও মাটির ঘরে বাস করেন। ইদানিং নতুন করে কেউ আর মাটির ঘর তৈরি করেন না। ফলে কালে বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত বাংলার মাটির তৈরি।

ঝিনাইগাতী উপজেলার ফাকরা বাদ গ্রামের সাবেক মেম্বার ও প্রভাবশালী ব্যক্তি আশ্রাব আলী জানান, এক সময় প্রায় বাড়িতেই মাটির ঘর ছিল। সে-সময়ে ধনী গরিবের এতো ভেদাভেদ ছিল না। মাটির ঘরে আলাদা স্বস্থি ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, আধুনিক জীবন যাপন ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া মাটির বাড়ি-ঘর ভেঙে সবাই ইটের বাড়ি বানাচ্ছেন।

ডেইলিরুপান্তর/আবির

  • 18
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ