গল্প: তপুর জন্মদিন

দুপুর পড়ে বিকেল চলে যাচ্ছে, তবু্ও তপুর কোন খবর নেই। সে কোথায় গেল কেউ যানে না। আবার আজকে তার জন্মদিন। মামা তার জন্য যে সাদা আর হলদে রং এর পাখি নিয়ে এসেছিলেন, সেই খাঁচাটিকেও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মা আর ছোট কাকু ঘর সাজাচ্ছেন। অন্বেষা রং তুলিতে তপুকে আঁকার চেষ্টা করছিলো। বাবা তাকে খুঁজতে দাদুর পুরনো বাইসাইকেলটা নিয়ে ছুটে গেলেন। অমিত দাদা তপুর পাঞ্জাবি আর ধূতি নিয়ে এলেন বাজার থেকে। ভারি সুন্দর গলার নকশাটা। তপুর বন্ধুরা মিলে বেলুন ফোলাচ্ছে আর গায়ে নানান নকশা একে দিচ্ছে। ঘরের মধ্যে যখন এতো কোলাহল, তারি মাঝে সামনের রুমে শান্ত ও বৈশাখী মিলে গান ধরেছে হারমোনিয়াম দিয়ে। শান্ত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী গানের সাথে তবলা বাজিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পেরে উঠছে না। আমার পড়ার টেবিলটা ঘিরে আরো বড় একটা ভিড় জমেছে।

তপুর পিসতোভাই সৌরভ দাদা, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তপুর জন্মদিন উপলক্ষে তার জন্য একটি বই উপহার এনেছেন। বইটির নাম ছিল ‘গণিতের ম্যাজিক’। তারি মাঝে সেই বইয়ের পৃষ্ঠা উলট-পালট করছিলো কয়েকটি বইপোকা।সবমিলিয়ে এক ব্যস্ত সময় কাটছিলো তাদের। ওদিকে বিকেল থেকে সন্ধ্যা হতে চললো, তবু তপুর কোন খুঁজ নেই। হটাৎ বাবার ফোন আসে ;বললেন -তপুকে পাওয়া গেছে ওই নদীর পাড়ে। মুহূর্তে ছুটে যাই আমি। দেখি,বাবা গাছের আড়াল থেকে তপুর সবকিছু লুকিয়ে দেখছেন। তপু ছিল প্রকৃতি প্রেমিক। নদীর পাড় তার প্রিয় জায়গা। সূর্য তখন লুকিয়ে যাওয়ার সময়। লাল আলোতে তপুর মুখখানি আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। মামা যে পাখি এনেছিলেন তার খাঁচাটি ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে, পাখি নেই। হাত দিয়ে কাকে যেন ঘুম পাড়াচ্ছে। চোখ বাড়িয়ে দেখা গেলো একটি কুকুর। আরে পল্টু যে! তপু কুকুরটিকে আদর করে পল্টু ডাকতো। তপু যখন দেখতে পেল, পাখিরা বাসায় ফিরে যাচ্ছে, তখন তার মনে হলো এখন ঘরে ফিরতে হবে। তারপর বাবা তাকে আদর করে ঘরে নিয়ে এলেন।

তপু ঘরে ফিরতেই তাকে ঘিরে নানান প্রশ্ন। তপু সেসব উপেক্ষা করে একছুটে ছাঁদে গেলো। সেখানে একটি ভাঙ্গা টবের সাথে ঈশারা দিয়ে কথা বলছে। হটাৎ কেনজানি তার মুখ কালো হয়ে যায়। আবার ছুটে গেল ঘরের দিকে। মনে হয়, কিছু একটা আনতে। দেখতে পাই সেই ভাঙা টবে অনেক গুলো পিঁপড়ের পরিবার। তপু ছুটে এলো হাতে কয়েকটি বিস্কুট নিয়ে। তপু যত্নের সাথে বিস্কুট গুলো গুড়ো করে দিচ্ছিলো। তপু হয়তো পিঁপড়েদের খাবার দিতে ভুলে গিয়েছিল। তখনি মা এসে তাকে ধরে নিয়ে গেলেন নিচে। সন্ধ্যা মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে শুরু হলো জন্মদিনের কার্যক্রম। অমিত দাদা ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছিলেন নানান স্টাইলে। তপুর মনে তেমন একটা আনন্দ নেই।

বেশ কয়েক ঘন্টা কাটলো এমন হৈচৈ পরিবেশে। রাতের খাবার শেষে সবাই যখন ঘুমাচ্ছে, তপু তখন আর্ট পেপার আর রং নিয়ে ছাঁদে ছবি আঁকছিলো। ছবি আঁকছে বলে কেউ তাকে কিছু বলে নি। দীর্ঘসময় পরে আমি যখন ছাঁদে গেলাম, দেখলাম ছবি আঁকা শেষ। তপু ছাঁদের কোনে বসে আছে। তবে হাতে একটা জোনাকি পোকা ধরে তাকে গুনগুন করে গান শুনাচ্ছে। আমাকে দেখতেই সে পোকাকে ছেড়ে দিলো এবং নিশ্চুপ হয়ে ঘরে ফিরে গেল। আমি তার আঁকা ছবিখানা মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। অনেক নিপুনতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছে চাঁদের আলোয় আমাদের ঘরখানি। ঘরের নিচের দিকটা কালো আবছায়া, তবে ছাঁদখানা চাঁদের আলোয় আলোকিত। আমি যখন ঘরে গেলাম তপু তখন ঘুমিয়ে গেছে। আমিও ঘুমিয়ে পড়ি। সকাল হতে না হতেই তপু ঘুম থেকে উঠে যায়। সে আমার গিটারটি নিয়ে চলে যায় ছাঁদে। তপু গিটার বাজানো না পারলেও তার ইচ্ছেনুযায়ি বাজাতো এবং সেসব মনোযোগ দিয়ে শুনতো পল্টু। বাবার পেপার পড়া শেষ হলেই সে কাচি নিয়ে বসতো কার্টুন চিত্র কাঠতে। তার এগুলো যেন প্রাত্যাহিক রুটিন হয়ে গেছে। পড়াশোনার ইচ্ছে তার একদম নেই, তবুও মাঝে মাঝে আমার বই নিয়ে সময় কাটাতো। তপু মাঝে মধ্যে তার বন্ধুদের সাথে খেলতে যেতো, কিন্তু খেলতো না। সে শুধু তাকিয়ে দেখতো। তবে বেশ ভালো করে সাজাতো তার এক-একটি মূহুর্ত।

তাকে আমরা কেউই শাসন করতো না। তার জন্মের পর থেকে সবাই তাকে আদর করে রাখতো। তপুর বয়স যখন তিন বছর, তখন তার ভিষণ জ্বর হয়। চিকিৎসাও চলে যথাযথ। সেই সাথে মা দিন-রাত এক করে তাকে সুস্থ করে তুলেন। কিন্তু সেই জ্বর তপুর কথা কেড়ে নিয়েছে। তখন থেকে তপু আর কথা বলতে পারেনি। তবে তার চোখের পলকেই কথা হিসেবে বুঝে নিতাম আমরা।

পহেলা বৈশাখের জন্য বাবা আমার ও তপুর জন্য দুটি টি-শার্ট এনেছিলেন মেলা থেকে। তপুর কাছে সেগুলো সাদা ক্যানভাসের মতো মনে হয়েছিলো। সে জল রং দিয়ে চমৎকার নকশা এঁকেছিলো টি-শার্ট দুটির উপর। বাবা নকশা দেখে অনেক খুশি হয়েছিলেন।

সেদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো। আমি তখন বিছানায় শুয়ে গল্প পড়ছিলাম। হটাৎ শুনতে পেলাম পল্টুর ডাক। সেই ডাক অন্য দিনের চেয়ে ভিন্ন ছিলো, কিন্তু ডাক যেন থামচেই না। বাবা, মা, সবাই ছুটে গেলাম ছাঁদে। দেখলাম ছাঁদে অস্বাভাবিকভাবে পড়ে আছে তপু। তার হাতের মুঠোয় রং-তুলি। তপু এইসময় ছবি আঁকছিলো বলে আমার অন্য রকম লাগলো। আগে কোনদিন এইসময় ছবি আঁকেনি। শুধু তাই নয়, সেই ভাঙা টবের সামনে পড়ে আছে অনেক গুলো বিস্কুট। সেখানে অযত্নে পড়ে আছে আমার গিটারটিও। তপু যে ছবি এঁকেছিলো, সেটি ছিলো অতি সাধারণ। কাগজটি পরোই কালো রংয়ের আর তার এক কোনে একটি তারা। বাবা তাকে ডাকছিলেন তপু তপু, কিন্তু তখন সে পুরো অচেতন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তখন আমাদের মাঝে তারা হয়ে গিয়েছিলো সে। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। আমি যখন চোখ খুলি, তখন আমি বিছানায় শুয়ে আছি। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম বোধ হয়। সবকিছু শেষে শূন্যতা যেন পুরো ঘরটাকে নিমজ্জিত করে রেখেছে। সেদিন পল্টুও কিছু খায়নি।

সেদিনের পর থেকে পল্টুর সকল কাজ আমি নিয়েনিলাম। প্রত্যেকটি কাজে ভিষণ অসহায় লাগতো। রাতের আকাশে তারা দেখলেই ডেকে ওঠতো পল্টু। একিভাবে কেটে গেলো বছরখানি। আজ তপুর জন্মদিন, তাই তাকে বড্ড মনে পড়ছে।

 

 

লিখেছেন:
পিনাক দাস, সিলেট থেকে।

  • 147
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ