‘ফেস টু ফেস শিক্ষার বিকল্প নেই’

দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এই ক্ষতি বহুমাত্রিক ও অত্যন্ত জটিল। চলমান করোনাভাইরাস (কোভিট-১৯) অতিমারির কারণে যে শিক্ষা সংকট তৈরী হয়েছে, সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বছরব্যাপী শিক্ষা দুর্যোগকেও ছাড়িয়ে গেছে।

এখন করেনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। কঠোর লকডাউনে বন্দি থাকা মানুষগুলো যেভাবে হুমরি খেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে তাতে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি। যদি আসে তাহলে কতটা ভয়াবহ হবে তা কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু এভাবে আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যায় না। সরকারকে অবশ্যই স্কুল কলেজ খোলার সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে এটা চরম বাস্তবতা। জাতি মেধাশূণ্য হয়ে যাচ্ছে। যে শিক্ষার্থী ৫ম শ্রেণির বই পড়েনি সে না পড়েই ৬ষ্ঠ শ্রেণিও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ৭ম শ্রেণিও যে অটোপাশে চলে যাবে না তা বলা মুশকিল।

সরকার সংসদ টিভিতে পাঠদান ও অ্যাসাইনমেন্ট সহ বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় মনোযোগ ধরে রাখতে চাইছে। কিন্তু সে তুলনায় ভাল আউটপুট আসছে না। আসার কথাও না। যেখানে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক টানা ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট পাঠদানের পরও শিক্ষার্থীদের হোম টিউটর নির্ভর হতে হয়; সেখানে অনলাইনে পাঠদান ভালো ফিডব্যাক আসার কথা না। কারণ ফেস টু ফেস শিক্ষার বিকল্প নেই। আর আমাদের দেশে অনলাইনে পাঠদান পদ্ধতি মানসম্পন্ন নয়। অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কোনো ধারণা নেই। প্রশিক্ষণও নেই।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইনে পাঠদান কার্যক্রমের কথাই বলি। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিষয় শিক্ষক ম্যাসেজ দিলেন- প্রিয় শিক্ষার্থীরা, তোমরা —- নং অধ্যায়ের এই প্রশ্নটি বাসায় ভালো করবে পরবে। ধন্যবাদ।

পরের দিন আবার ম্যাসেজ দিলেন, তোমরা নিশ্চয়ই গতকালের পড়া ভালো করে পড়েছে। আজকে এই অধ্যায়ের এই প্রশ্নটি পড়বে। ধন্যবাদ। এই ধরণের পাঠদান কতজন শিক্ষার্থী সাড়া দিবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গ্রামের ৬ষ্ট শ্রেণি পড়ুয়া এক শিক্ষর্থীর মায়ের কাছ থেকে শুনলাম স্কুলে নাকি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বাজার থেকে প্রশ্ন আনতে যাচ্ছেন তিনি। পরীক্ষার প্রশ্ন বাজারে মিলে বিষয়টা শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। বললাম আমাকে দেখাবেন প্রশ্নটা। বাজার থেকে প্রশ্ন আনার পর খুব আগ্রহ করে হাতে নিয়ে দেখি এটা অ্যাসাইনমেন্ট। এই অ্যাসাইনমেন্ট বাজার থেকে কিনে আনতে ২০ টাকা দিতে হয়েছে দোকানীকে। আবার ‘পরীক্ষা দিতে’ (জমা দিতে) স্কুলেও ফি দিতে হয়েছে ১০০ টাকা।

শিক্ষায় আমাদের অনেক সীমাদ্ধতা আছে। শিক্ষার এই সংকট শুধুমাত্র করোনাকে কেন্দ্র করে নয়। বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংকট দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি, মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব, শিক্ষা উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সংকট। এতো এতো সংকট চেপে রেখে শুধুমাত্র করোনার ভাইরাসের সংকট দেখিয়ে এভাবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন এভাবে নষ্ট করতে পারিনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবে আর বন্ধ রাখা যায় না।

করোনা মহামারি এতো দ্রুত বিদায় নেওয়ার মত না। করোনাকে সঙ্গে নিয়ে চলার পথ খুঁজতে হবে। স্বাভাবিক জীবন বহমান রাখতে হবে। সারাদেশে একই সাথে স্কুল কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্রয়োজনে করোনা সংক্রমণ কম এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত স্থায়ী ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে।

 

 

লেখক
মো. কামরুল ইসলাম, (সংবাদকর্মী)
ইমেইল – mahipress44@gmail.com

  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ