জীবন বনাম জীবিকা

গত ২৩শে জুলাই থেকে পুরো দেশে কঠোর লকডাউন আরোপ করা হয় এবং এর আওতায় সরকার সব ধরনের শিল্প ও কল-কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। তবে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ রপ্তানির স্বার্থে পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছিল। শুরুতে মালিকদের ওই দাবি নাকচ করে দেয়া হলেও শুক্রবার সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত আসে। স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য ১৫টি শর্ত সাপেক্ষে কারখানাগুলো খোলার অনুমতি দেয়া হয়।

এই ঘোষণা এমন একটি সময় এলো যখন দেশের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু সংখ্যা বেড়েই চলেছে।স্বাস্থ্য অধিদফতর চলমান বিধিনিষেধ আরও ১০ দিন বাড়ানোর সুপারিশ করলেও খুলে দেয়া হয়েছে দেশের পোশাক কারখানাগুলো।সর্বশেষ রোববার পর্যন্ত মোট ২২৬২ টি পোশাক কারখানা খোলার ঘোষনা খবর পাওয়া যায়। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয়েছে ঢাকাগামী শ্রমিকদের ঢল।

এদিকে বিজিএমইএ থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চলমান বিধিনিষেধে গ্রামে থাকা শ্রমিকদের কাজে না ফিরতে অনুরোধ জানালেও কিছু কিছু গার্মেন্টস, শ্রমিকদের মেসেজ করে দ্রুত কাজে যোগ দিতে বলায় সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকাগামী শ্রমিকদের থেকে জানা যায়, সংগঠনটি বিধিনিষেধ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ততারা কাজে যোগ না দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না বললেও তাদের ফোন করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, কাজেযোগ না দিলে চাকরি থাকবে না। এজন্য যে যেভাবে পারছেন কর্মস্থলে ফিরছেন।গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যদিয়ে কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়ায় তাদের ফিরতে হচ্ছে। সকাল থেকেই বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে হাজার হাজার মানুষ এসে জড়ো হয় ঢাকা যাবার জন্য। হাতে-মাথায়-কাঁধে ব্যাগ। তাদের মধ্যে অসংখ্য নারী ও শিশুও রয়েছেন। তবে এসময়ে তাদের মধ্যে স্বাস্থবিধি মেনে চলার কোনো বালাই ছিলোনা, বেশিরভাগের সাথেই মাস্ক থাকলেও তা ছিল গলায়, থুতনিতে ঝোলানো।

দক্ষিণের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্যানে, রিক্সায়, পিকআপে, ট্রাকে যে যেভাবে পেরেছে বিভাগীয় সদর বরিশালের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে পৌঁছেছে। কিন্তু শনিবার রাত থেকে মাত্র ১৬ ঘন্টার জন্য কিছু বাস চললেও তাতে জায়গা হয়নি বেশিরভাগেরই। তাই বাধ্য হয়েই সাইকেল, রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যান, হিউম্যান হলার, ট্রাক ও মোটরসাইকেলে করেও তারা বাড়ি থেকে ঢাকা পৌঁছার চেষ্টা করছেন।

বরগুনা জেলার বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় টেকনিশিয়ান পদে কাজ করি। কর্মস্থল থেকে জরুরী ডাক এসেছে।বরগুনা থেকে বরিশাল পর্যন্ত আসতেই দেড় হাজার টাকাখরচ হয়েছে।মোটরসাইকেল, থ্রি হুইলার, মাহিন্দ্র, সিএনজি আর ট্রাকের পিছনে এখন ঘুরছি।জিম্মি করা ভাড়া চাইছে এসব যানবাহনের চালকরা।পোশাক কারখানা খোলার আগে আমরা কিভাবে গন্তব্য স্থলে পৌঁছাবো সেই বিষয়টির দিকে সরকারের নজর দেয়া উচিৎ ছিলো।

তবে দুপুরের পর সিধান্ত হওয়া সোমবার সকাল অবধি লঞ্চ চলার খবরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন অনেকে। শুরুতে লঞ্চ মালিকরা লোকসানের কথা ভেবে লঞ্চ চালাতে না চাইলেও পরে সরকারের নির্দেশ ও বিআইডাব্লিউটিএ-র অনুরোধে তারা কিছু লঞ্চ চালানোর ঘোষনা দেন। এবিষয়ে এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের সুপার ভাইজার সেলিম আহমেদ জানান, ‘লঞ্চ ছাড়ার কোনো ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু সরকারি নির্দেশ এবং ঘাটে আসা পোশাক শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করে মালিক ও কর্তৃপক্ষ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ার সায় দিয়েছেন। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত যে যাত্রী এসেছে তাতে লঞ্চের খরচ ওঠা নিয়ে সংশয় রয়েছে।থ

বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ-র উপ-পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কোম্পানির মালিকরা লঞ্চের ব্যয় সংকুলান না হওয়ার তারা চালাতে চাইছিলো না। কিন্তু সরকারি নিদের্শনা ও আমাদের অনুরোধে তারা এখন লঞ্চ চালাতে রাজি হয়েছে। প্রথমিক পর্যায়ের অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চে যাত্রী উঠানো হচ্ছে। যাত্রীদের চাপ বেশি থাকলে হয় আরও দু’একটি লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেতে পরে। রাত ৮টার দিকে যেকোনো সময়ে সেগুলো ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।

দুপুরের পর ঘাটে থাকা এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের মূলফটক খেলার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চের ডেকে জায়গা দখলের জন্য হুমড়ি খেয়ে পরেন শতশত পোশাক শ্রমিক। মুহূর্তের মধ্যে লঞ্চটির দু’টি ডেক যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। পোশাকশ্রমিক খাদিজা আক্তার বলেন, ‘আগামী সোমবার কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি নিয়ে অসুবিধায় পরতে হবে, তাই আজ যেভাবেই হোক ঢাকায় যেতে হবে। আল্লাহ রহমত করেছে যে লঞ্চ ছাড়বে। আশা করি, নিরাপদেই ঢাকায় পৌঁছাতে পারবো।

ডেইলিরূপান্তর/আরএ

  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ