শামীম; বাংলার ক্রিকেটে এক নতুন ধ্রুবতারা

বিস্তীর্ণ পদ্মা, মেঘনা কিংবা ডাকাতিয়ার বুকে ছোট ছোট জেলে নৌকা। ঢেউয়ের তালে দুলে দুলে কেউ জাল টানছে, কেউ আবার টানার জন্য অপেক্ষায়। কেউ আবার শক্ত হাতে ধরে আছেন হাল। রুপালি ইলিশ জালে আটকাতে পেরে কারও কারও মুখে আনন্দের হাসি। কোনো একটি নৌকার দিকে একটু সময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলে সদ্য পানি থেকে তোলা জীবন্ত ইলিশের ছটফটানিও চোখে পড়বে। এতোক্ষণে হয়তো খানিকটা হলেও আঁচ করতে পেরেছেন আমি কোন জায়গার কথা বলছি। হ্যাঁ, ইলিশের শহর চাঁদপুরের কথাই বলছি…

‘ক্ষুধার্ত নদীর মতো তীব্র দু’টি জলের আওয়াজ
তুলে মিশে যাই চলো অকর্ষিত উপত্যকায়,
চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ
উগোল মাছের মাংস তৃপ্ত হোক তোমার কাঁদায়…’

কবি আল মাহমুদের কবিতার মতোই এক ক্ষুদার্ত বাঘের গল্পই জানাবো আপনাদের। ইলিশের শহর চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া আ. রহমান পাটোয়ারী বাড়ির ছেলে আবদুল হামিদ পাটোয়ারী। পেশায় ছিলেন একজন ঠিকাদার। আবদুল হামিদ পাটোয়ারী ও রিনা বেগমের আদরের দুলাল পাটোয়ারী বাড়ির ভবিষ্যৎ কর্ণধার শামীম হোসেন পাটোয়ারী। একজন সচেতন বাবা-মায়ের মতোই তাদেরও ইচ্ছে ছিল ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা সরকারী চাকুরীজীবি হবে। কিন্তু, বাড়ির ছোট পাটোয়ারীর যেন প্রেম অন্য কিছুর সাথে বইয়ের থেকেও বেশি।

ক্রিকেট…

বাবা-মা ছেলেকে রেডি করে স্কুলে পাঠালেও ছেলেকে দিনশেষে খোঁজে পাওয়া যেত ক্রিকেটের মাঠে। তার ধ্যানে, জ্ঞ্যানে, মনে যেন শুধু ক্রিকেটেরই বসবাস। রোমিও-জুলিয়েটের প্রেম যেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হার মেনে যায় তার ক্রিকেট প্রেমের কাছে। চোখে মুখে শুধু ক্রিকেটের নেশাই খেলা করে ছোট পাটোয়ারীর। কথায় আছে, যে রত্ন ফুটার সে তো কোন না কোন ভাবে ফুটতেই হবে। বাবা মায়ের সমর্থন খুব একটা না থাকলেও শামীমের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসেন চাচা আনোয়ার পাটোয়ারী। পাশাপাশি চাচাতো ভাইদের সহযোগীতায় ভর্তি হয়ে যান স্থানীয় ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে। সেখান থেকেই ক্রিকেটের ব্যাকরণ বুঝতে শুরু করেন শামীম।

ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমির অনূর্ধ্ব-১৪ থেকে অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যন্ত খেলেন শামীম হোসেন পাটোয়ারী। এরপর ২০১৫ সালে ঠিকে যান বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবথেকে বড় কারখানা হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে। বিকেএসপির কোচরা রত্ন চিনতে ভুল করেন নি। সেখান থেকেই আর পিছনে তাকাতে যেন ভুলেই গিয়েছেন শামীম। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের ফল স্বরূপ ২০১৯ অ-১৯ বিশ্বকাপ দলে ডাক পেয়ে যান এই তরুণ অলরাউন্ডার। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জয়ের একজন সম্মুখযোদ্ধা ছিলেন তিনি।

একসময় এই ক্রিকেটের জন্য ছেলেকে ক্রিকেটের অনুরাগ থেকে বিরত রাখতে চাইলেও দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পর ছেলেকে সিদ্ধান্তকেই সঠিক বলে জানিয়েছিলেন সিনিয়র পাটোয়ারী সাহেব। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি সংবাদ মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে যেয়ে বলেছিলেন, ‘আমি খুবই খুশি। কারণ ছেলেকে স্কুলে পাঠাতাম। কিন্তু সে স্কুলে না গিয়ে শুধু খেলাধুলা নিয়ে এদিক সেদিক চলে যেত। আজ বুঝতে পারলাম সে গিয়ে ভালোই করেছে। আমাদের সম্মান বাড়িয়ে দিয়েছে।’

২০১৭ সালে ২০১৭-১৮ জাতীয় ক্রিকেট লিগে চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির আত্মপ্রকাশ করেছিলেন শামীম। এরপর ২০১৯ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হয়ে অভিষিক্ত হন তিনি। এরপরে শামীম খেলেছেন বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট কাপে থেকে দেশের ঘরোয়া সকল টুর্ণামেন্টেও। প্রত্যেকটি টুর্ণামেন্টেই শামীম সবাইকে চমকে দিচ্ছিলেন নিজের নৈপুণ্যে। ব্যাটিং, বোলিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন শামীম। তার ফিল্ডিংয়ের ধরণ দেখে অনেকেই তাকে বিশ্বনন্দিত ফিল্ডার জন্টি রোডসের সাথেও তুলনা করে বসেছেন।

অবশেষে এলো সেই কাঙ্কিত দিনক্ষণ। বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টির ৬৭তম ক্যাপটি উঠে শামীম হোসেন পাটোয়ারীর মাথায়। স্বপ্নের বাংলাদেশ দলের জার্সি পরে স্বপ্নের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের হাতে ক্যাপটি পরেন শামীম। প্রথম ম্যাচে দল জিততে না পারলেও নিজের নামের সুবিচারটাই করেছেন তিনি। নিজের স্বভাবসুলভ আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ১৩ বলে ২৯ রানের ইনিংস খেলে সাজঘরে ফিরেছিলেন। জয়ের আক্ষেপটা অবশ্য নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচেই পূর্ণ করেছেন চাঁদপুরের ছেলে শামীম। ১৫ বলে ৩১ রানের ক্যামিও ইনিংস খেলে দলকে পৌঁছে দিয়েছেন জয়ের বন্দরে।

ক্যারিয়ার মাত্রই শুরু। এই বাংলাদেশকে তার এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, ক্রিকেটপ্রেমীরা যে কারণে তাকে নিয়ে আশা করেন সেই আশার বাস্তব রুপান্তর তাকে দিতেই হবে। পঞ্চপান্ডবের রিপ্লেসমেন্টে নিজেকে দারুণ ভাবে প্রস্তুত করতে হবে। যেই পঞ্চপান্ডব দেশের ক্রিকেটকে একটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন সেই ধারাবাহিকতায় শামীমরা দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বহুদূর। শামীমদের চোখেই তো কোটি কোটি ক্রিকেট প্রেমী স্বপ্ন দেখে একটি সোনালী ক্রিকেট ভবিষ্যতের। সেই স্বপ্নে জোয়ার আসুক, লাল সবুজ ক্রিকেট ভেসে যাক কোটি ক্রিকেট প্রেমীর সোনালী ভবিষ্যৎ ক্রিকেটে।

ডেইলিরূপান্তর/আরএফ/এইচ.

  • 373
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ