বাংলাদেশের বন্ধু সাংবাদিক সাইমন ড্রিং আর নেই

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু, প্রখ্যাত সাংবাদিক, একুশে টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইমন ড্রিং আর নেই। তিনি গত শুক্রবার রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় মৃত্যু বরণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিলো সহযোদ্ধার। তার প্রকাশিত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলো। বাংলার মাটিতে টেলিভিশনের আধুনিক রুপকার হিসেবে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একুশে টেলিভিশনকে। সে পথ ধরেই এগিয়েছে এদেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো।

সাইমন ড্রিং বাংলার মাটিতে পাকিস্তানী বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী বিদেশী সাংবাদিক।

দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফ এর প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করার সময় ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ কম্বোডিয়া থেকে ঢাকায় আসেন সাইমন ড্রিং। প্রত্যক্ষ করেন সাত মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ; এরপর ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যা। নিজের জীবন বিপন্ন করে সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ করেন; সারা বিশ্বকে জানিয়ে দেন নিরীহ বাঙালির উপর পাকিস্তানি বর্বর হামলার কথা। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে উঠার প্রাথমিক ধাপ ছিলো সাইমন ড্রিং এর প্রতিবেদন।

কলকাতা থেকে মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দিতেন লণ্ডনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। ১৬ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর ট্যাংকে ময়মনসিংহ হয়ে স্বাধীন বাংলায় আসেন সাইমন ড্রিং।

পরবর্তীতে ২০০০ সালে এদেশে প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভি গড়ে তোলার কাজে এসেছিলেন। একুশে টিভির প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশনের আধুনিকতার রুপকার সাইমন ড্রিং; টিভি সাংবাদিকতায় অনন্য মাত্রা যোগ করেছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বন্ধ করে দেয় একুশে টিভি। ২০০২ সালে ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয় সাইমন ড্রিংকে।

সাইমন ড্রিং এর জন্ম ১৯৪৫ সালে। ১৮ বছর বয়স থেকে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। পেশাগত জীবনে ২২টি যুদ্ধ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের প্রতিবেদন তৈরি করে ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টার অব দ্যা ইয়ার নির্বাচিত হন। অজর্ন করেন অসংখ্য পুরুষ্কার।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২৫মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করার আগে ঢাকায় অবস্থানরত প্রায় অর্ধশত বিদেশি সাংবাদিককে আটকে ফেলে তখনকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে । তাদের হোটেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয় যাতে গণহত্যার কোনো খবর সংগ্রহ করতে না পারে বিশ্ব গণমাধ্যম।

তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। পাকিস্তানি সামরিক আইন না মেনে তিনি হোটেলে লুকিয়ে পড়েন। শ্বাসরুদ্ধকর ৩২ ঘণ্টা সময় কাটে হোটেলের লবি, ছাদ, বার, কিচেনের মত জায়গায়।

পরে তিনি ঘুরে ঘুরে প্রত্যক্ষ করেন গণহত্যার বাস্তব চিত্র। ২৭ মার্চ কারফিউ উঠে গেলে সায়মন ড্রিং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘুরে দেখেন।

নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম খবর প্রকাশ করেন ৩০ মার্চ ১৯৭১, ডেইলি টেলিগ্রাফে।

২০১২ সালে সোনারগাঁও হোটেলে স্মৃতি ৭১ শিরোনামে এক অনুষ্ঠানে সেই গল্প শুনিয়েছিলেন সায়মন ড্রিং।

সেই অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালি, যিনি একাত্তরে বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন। তাদের দুজনকেই মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননায় ভূষিত করেছে বাংলাদেশ সরকার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ