সিলেটের গোলাপগঞ্জের আনারস বাগান যেন নতুন পর্যটন কেন্দ্র

প্রাকৃতিক সৌন্দ্যর্যের অপরূপ নিদর্শন সিলেট। তারই মধ্যে আনারস বাগান এনে দিয়েছে মনোরোম এক দৃশ্য। উঁচু-নিচু টিলার বুক চিরে সারি সারি সাজানো-গোছানো আনারস বাগান। থোকা থোকা গাঢ় সবুজের ডানা মেলেছে ছোট-বড় হাজারো কাঁচা-পাকা আনারস। বলছি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ দত্তরাইল গ্রামের চাঁন মিয়ার আনারস বাগানের কথা।

সুন্দর আর মনোরম পরিবেশে পাড়াগাঁয়ের ভেতরে গড়ে তোলা দৃ‌ষ্টিনন্দন এ আনারস বাগানের দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন শহর এবং আশপাশের মানুষ ছুটছেন দত্তরাইল গ্রামে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা পরিবার-পরিজন নিয়ে বাগানে ঘুরতে আসছেন। আবার বাগানের ভেতরের ক্যান্টিন থেকে আনারস চাটনি, আনারসের জুসে চুমুক দিচ্ছেন। বাগানের  আনারসের মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাজুড়ে। এ যেন এক নতুন পর্যটন কেন্দ্র।

প্রায় ৬০ বিঘা জায়গা নিয়ে পারিবারিকভাবে এ আনারস বাগান গড়ে তুলেছেন ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের দুইবারের চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার সন্তানরা। বৃহদাকারে গোলাপগঞ্জে এটিই একমাত্র আনারসের বাগান।

জলঢুপী জাতের এ আনারসের বাগানটি দত্তরাইল গ্রামে গড়ে ওঠে ২০১৯ সালে। শখের বশে গড়ে তোলা বাগানে এখন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার আনারসের চারা গজিয়েছে। কোনো ধরনের রাসায়নিক ছাড়া প্রায় ১৮ মাস পরিচর্যা করে এখন শুরু হয়েছে বিক্রি। প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ হাজার পাকা আনারস বিক্রি হচ্ছে। তবে এ আনারস বিক্রি করে আয়ের সব টাকা জমা হচ্ছে মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার নামে গঠিত ‘আব্দুল মতিন চাঁন মিয়া এডুকেশন ট্রাস্টে’, যে ট্রাস্ট শিক্ষাসহ এলাকার অসহায় মানুষের কল্যাণে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে যাচ্ছে।

এ পরিবার শুধু আনারস বাগানই নয়, পূর্বে থেকে পেয়ারা, লিচু, তেজপাতা ইত্যাদি বাগানও গড়ে তুলেছে।

মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার ৮ ছেলে। তাদের কেউ যুক্তরাজ্য এবং কেউ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তারা সবাই প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত এবং বিভিন্ন কমিউনিটির সাথে জড়িত। বড় ছেলে আমিনুর রাজা মারুফ গোলাপগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগানের সভাপতি। দ্বিতীয় ছেলে রুহুল আমিন রুহেল যুক্তরাজ্য প্রবাসী, গীতিকার ও একজন কবি। এছাড়া তিনি আব্দুল মতিন চাঁন মিয়া এডুকেশন ট্রাস্টের সভাপতি। তৃতীয় ছেলে মামুনুর রাজা সাহেল ঢাকাদক্ষিণ সমাজ কল্যাণ সংস্থা মিশিগানের সহ-সভাপতি। চতুর্থ ছেলে রুহুল কুদ্দুছ জুনেদ ঢাকাদক্ষিণ উন্নয়ন সংস্থা ইউকের দুইবারের সাধারণ সম্পাদক। পঞ্চম ছেলে রাসেল আহমদ, ষষ্ঠ ছেলে রুহুল কাদির রাজু, সপ্তম ছেলে রুহুল ইসলাম জাবেদ দেশে ব্যবসার সাথে জড়িত। সর্বকনিষ্ঠ ছেলে রুহুল আবেদ দেশে থাকতে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে ঢাকাদক্ষিণ সমাজ কল্যাণ সংস্থা মিশিগানের সমাজ কল্যাণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়াও ছিলেন সৌখিন বিলাসী। বিশাল বাড়ির আঙিনায় নানা জাতের ফলের বাগান ও মাছ চাষ করে এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। প‍ূর্ব থে‌কেই তার বাগা‌নের খ‌্যা‌তি র‌য়ে‌ছে। ১৯৭৮ সা‌লে স্থানীয় বাংলা‌দেশ তরুণ সং‌ঘের আমন্ত্রণে কানাডা থে‌কে এক‌টি প্রতি‌নি‌ধি দল বি‌ভিন্ন জা‌তের বাগান গ‌ড়ে তোলার বিষয় জান‌তে বাংলা‌দে‌শে এলে আব্দুল ম‌তিন চাঁন মিয়ার বা‌ড়িতে প্রায় ৪ মাস বসবাস ক‌রেন। এরই পথ অনুস্মরণ করে তার সন্তানরাও আনারস বাগান গড়ে তুলে বেকারদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

যেভাবে গড়ে ওঠে আনারস বাগান : আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার পঞ্চম ছেলে রাসেল আহমদ প্রবাসে থাকলেও দেশে অকেজো পড়ে থাকা টিলা কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেই চিন্তা থেকেই গড়ে ওঠে বিশাল আনারস বাগান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ করেন সরফরাজ আহমদ সুমন, কাওছার রাজা রতন ও আরমান আলী। প্রবাসে থাকা পরিবারের সবার সাথে আলোচনা করে আনারস বাগান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। পরে স্থানীয় ব্যাংকার রইছ উদ্দিনের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে বিশাল আনারস বাগান। এছাড়া তাদের সাথে সহযোগী হিসেবে রয়েছেন সামছুল আলম গোলাপ। বিশাল এ বাগানে এখন ১৫-২০ জন শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করছেন। এ বাগান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার আনারস ঢাকাদক্ষিণ বাজারসহ আশপাশের প্রায় সকল বাজারেই বিক্রি হচ্ছে।

বৃহৎ এ ‍আনারস বাগান স্থানীয়সহ আশপাশের মানুষের কাছে দৃষ্টিনন্দন একটি জায়গায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আনারস বাগানটি স্বচক্ষে দেখতে চলে যান দত্তরাইল গ্রামে। অনেকে বাগার ঘুরে ঘুরে দেখে ফেরার সময় সুস্বাদু কয়েক হালি আনারস ক্রয় করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ