করোনা- লকডাউন; মাইনকার চিপায় জনগণ

বৈশ্বিক সংকট করোনা মহামারী মোকাবেলা, কোভিড সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে বাংলাদেশে দ্বিতীয় দফায় আবারো সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। ফলে করোনা মহামারী, লকডাউন ও ঘরবন্দীকালের দরুণ অস্বাভাবিকভাবে জীবিকার উপর আঘাত হেনেছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। মানুষের ঘরে খাবার নেই। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, গরীব ও অভাবী লোকগুলো অনাহারে, অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। দুয়ারে ঠায় দাঁড়িয়েছে অভাব ও মরণ দুটোই একসাথে। এটি করোনার চাইতেও ভয়াল যন্ত্রণার।

এদিকে দেশে চলছে বিষম রাজনীতি। সরকার করোনা মহামারী মোকাবেলায় কাজ করছে। কিন্তু বিদ্যমান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এখানে নীরব দর্শকের দায়িত্ব পালন করছে। তাদের দাবী সরকার মহামারী মোকাবেলায় ঐক্যের আহবানে সাড়া দেয়নি। উল্টো সরকার বিরোধী দল, মত ও পথের লোকদের হয়রানী করছে বলে তাদের অভিযোগ। তারা বলছে, সরকার কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। সরকার বলছে বিরোধী দল করোনা মহামারীতেও দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। হেফাজতের আন্দোলনে বিএনপি জামায়াতের সংশ্লিষ্ঠতা রয়েছে বলে শাসকদল আওয়ামীলীগের বড় অভিযোগ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ২৬ মার্চ বিএনপির উসকানিতে হেফাজতে ইসলাম তাণ্ডব চালিয়েছিলো। সেদিনের এবং পরবর্তী ঘটনাবলী দেশকে অস্থিতিশীল করার এক গভীর চক্রান্ত ছিলো এবং তা ছিলো পরিকল্পিত। এ পরিকল্পনায় স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে উসকানি দিয়েছে বিএনপি এবং এ তাণ্ডবলীলা বিএনপি ও তার দোসরদের পূর্বপরিকল্পিত। বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) তার সরকারি বাসভবনে নিয়মিত ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, জনগণের জন্যই শেখ হাসিনার প্রতিটি কর্মসূচি। সরকার নয়, বিএনপিই জনগণকে তাদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে। তাদের জনগণ ভোট দেয় না বলে সহিংসতা করে। এখন জনগণের জানমালের ক্ষতি করছে তারা।

তিনি বলেন, এদেশের রাজনীতিতে কে কাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে কোনো লাভ নেই। কারণ জনগণের কাছে সবকিছুই আজ স্পষ্ট।’

করোনা সংকটে রাজনৈতিকভাবে কাউকে আক্রমণ করার চিন্তা নেই জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, পারস্পরিক দোষারোপ করোনা সংকটকে আরো ভয়াবহ করে তুলবে। এ দোষারোপের রাজনীতি থেকে এ মুহূর্তে বের হয়ে আসতে হবে। করোনা নিয়ে এখন কারো রাজনীতি করা সমীচীন নয়। বিএনপি যদি আজ এই মহামারির সময়ে ব্লেম গেমের রাজনীতি থেকে নিজেদের বিরত রাখে, সেটাই জনগণের জন্য শুভ। অহেতুক সরকার বিরোধিতার নামে করোনা সংকটে রাজনৈতিক অপপ্রচার বন্ধ রাখুন।

মন্ত্রী আরো বলেন, টেমস নদীর পাড়ে বসে বাংলাদেশের মানুষের চোখের ভাষা, মনের ভাষা বোঝা সম্ভব নয়। তাই বিএনপির রাজনীতি এখন হাওয়া থেকে পাওয়া জনবিরোধী উপাদান নির্ভর তৎপরতায় পূর্ণ।

অপরদিকে দেশকে বিএনপি শূন্য করাই যেন আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর এখন প্রধান লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

লকডাউনকে কেন্দ্র করে সরকার ক্র্যাকডাউনে নেমেছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ক্রাকডাউনে নেমে তারা আমাদের দলের ও অংগ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী ও অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করছে।

তিনি বলেন, লকডাউনের সুযোগ নিয়ে ভয়াবহ করোনা ও রমজানে গ্রাম-শহর, পাড়া-মহল্লায় বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করতে অভিযান চালানো হচ্ছে। সর্বত্র আতঙ্ক ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের ভয়াবহ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কেউ যাতে টু শব্দ উচ্চারণ করতে না পারে, সেজন্যই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানোকে লক্ষ্য হিসেবে ধরে নিয়েছে সরকার। নির্যাতন- নিপীড়ন, গুম-খুন ইত্যাদি অপকর্মের মাধ্যমে দেশকে এক ভয়াবহ অরাজকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে তারা। এর মাধ্যমে দেশকে তারা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। দেশকে বিএনপি শূন্য করাই যেন আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর এখন প্রধান লক্ষ্য।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, যেহেতু এ সরকার নির্বাচিত নয়, তাদের কোনো গণভিত্তি নেই। অত্যাচার নির্যাতন, গ্রেফতার, হামলা-মামলা দিয়েই তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে, সে কারণে এ পবিত্র রমজান মাসেও তারা এ ধরনের হীন কাজে লিপ্ত রয়েছে। তাদের চক্রান্ত ষড়যন্ত্র হচ্ছে এটাই যে, তারা যে করে হোক, গ্রেফতার, হত্যা, গুম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বিরোধীদলের যে সংবিধানসম্মত অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা- সব কিছুকে দমন করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত করতে চায়।

বাংলাদেশে এখন কোনো গণতন্ত্র নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের যে সরকার আছে, তারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা আজ নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে। প্রশাসনকে সম্পূর্ণ দলীয়করণ করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থাকে দলীয়করণ করা হয়েছে। মিডিয়াকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। এভাবে দেশে একটা অসম্ভব রকমের নিপিড়নকারী কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

সরকারের ডেমকেয়ার মনোভাব আর বিরোধীদলের লেজেগোবরে অবস্থায় জীবন ও জীবিকার জন্য মাইনকার চিপায় পড়েছে দেশ ও জনগণ।

অপরদিকে যদিও প্রজ্ঞাপনে লকডাউন উল্লেখ না করে বিধিনিষেধ, নিষেধাজ্ঞা ও জনচলাচলে কঠোর বিধিমালা জারি হয়েছে। সেটি বিগত ১৪ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়ে চলমান আছে। লকডাউন একটি ইউরোপীয় টার্ম। একেবারে অবরুদ্ধ জীবন যাপন। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন কিংবা সংবিধানের কোথাও লকডাউনের বিস্তর কোন ব্যাখ্যা নেই। এদেশের প্রচলিত আইনে কারফিউ আছে, সংক্রামক ব্যাধি আইন আছে। তবে দুর্যোগ, দু:সময় ও দুষ্কালে সরকার নির্বাহী ক্ষমতা বলে নিত্য নতুন আইন তৈরী করতেই পারে। ডকট্রিন অফ নেসাসিটি অনুসারে এটিই আইন ও আদালতে বলবৎযোগ্য।

রমজানের শুরুতেই লকডাউন শুরু। অবরুদ্ধ জীবন যাপনের অস্বস্তিকর গ্যড়াকলে পড়ে যায় সাধারণ মানুষ। কর্মসংস্থান নির্ভর মানুষ হয়ে পড়ে অনির্ভরশীল। মানুষের চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য, শ্রমজীবি ও কর্মজীবী মানুষের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে পড়ে। ঘরবন্দী মানুষের দুর্ভোগ ও দুর্বিষহ জীবন শুরু হয়। একদিকে কর্মহীন জীবন ও অন্ধকার ভবিষ্যতে যাত্রা, অপরদিকে দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিরীহ সাধারণ জনগণকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে। সরকারী চাকরিজীবীগণ মাস শেষে বেতন পান, কয়েকদিন পর পর বোনাস পান, সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পান। আরো অনেক কিছু। কিন্তু বেসরকারি খাতের লোকজন, ব্যবসায়ী, পেশাজীবি ও শ্রমিক, দিনমজুরগণ কি তার সিকিভাগ ও পায়? এ প্রশ্ন আজ সকলের। কারণ রাষ্ট্র সবার। জনগণ এর মালিক। সরকারী চাকুরেগণ রাষ্ট্রের কর্মচারী মাত্র। সরকারী আর বেসরকারী কর্মচারীদের বেতন বৈষম্য আকাশ পাতাল তফাৎ। কতজন লোক কোন পেশায় নিয়োজিত আছে আদৌ এর পরিসংখ্যান সরকারের কাছে আছে কি?

দেশে এখন রাজনীতি নেই বললেই চলে। ফলে অনিশ্চয়তা, অরাজকতা ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ রাজনৈতিক ভ্যকুয়াম সৃষ্টি হলে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।

সাম্প্রতিক কালের লকডাউন ও চলমান কঠোর বিধিনিষেধ এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত হয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা লাটে, বেসরকারী কোম্পানীগুলো অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হচ্ছে এবং প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান গুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। দিনের পর দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় নতুন প্রজন্ম ধ্বংস হতে যাচ্ছে।

‘মধ্যবিত্ত ও লকডাউন’ সংক্ষুব্ধ সময়ের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন ভারতের যুবা আইনজীবীরা। আচমকাই বিশ্ববাসী সম্মুখীন হয়েছে নভেল করোনা ভাইরাসের। প্রাণঘাতী এই মহামারীর কারণেই জারি হয়েছে দেশে দেশে লকডাউন।‌ কোভিড ১৯ ও লকডাউন পরিস্থিতিতে আমজনতার জনজীবন কতটা বিপর্যস্থ বা প্রভাবিত হয়েছে তাদের কথায়, আমাদের মনে হয়েছে এই লকডাউন তথা কোভিড মহামারীর সবচেয়ে বড় থাবা বসিয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর। মধ্যবিত্ত শ্রেণী করোনা ভাইরাসে প্রত্যক্ষভাবে সেভাবে আক্রান্ত না হলেও, পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চরম অর্থনৈতিক সমস্যার কথা তুলে ধরে ভারতে নির্মিত হয়েছে একটি শর্ট ফিল্ম। সঙ্গে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও লকডাউনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনজীবী সমাজ কি কি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, তাও সুচারুভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই ছোট্ট সময়ের ছবিতে।

কোভিডের কারণে তৈরি হওয়া লকডাউন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে অর্থনীতিকে। সেই ধাক্কায় বার বার আঘাত পাচ্ছে মধ্যবিত্ত সমাজ। সে কথাই এই শর্টফিল্মে তুলে ধরেছেন কলকাতার যুবা আইনজীবীরা। সঙ্গে কিভাবে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল কাজকর্মের প্রতি মানুষের প্রবণতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া লকডাউনে জনজীবনে কি কি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল, তাও ওই নয় মিনিট ১৭ সেকেন্ডের ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কলকাতা হাইকোর্টে কর্মরত আইনজীবীরা। এ প্রসঙ্গে ছবির সহপরিচালক অতনু ঘোষ বলেছেন, “কোনও আর্থিক লাভ বা কোনও বিনোদনের জন্য আমরা এই ছবি তৈরি করিনি। বরং লকডাউনের সময় আমাদের মতো আইনজীবীরা যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি বা সাধারণ মানুষকে যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হতে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে সমাজকে সচেতন করতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।এখানে একটি পেশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বিভৎসভাবে। এভাবে করুণ পরিস্থিতির শিকার আমাদের দেশের বিভিন্ন পেশাজীবি, শ্রমজীবি ও মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ।

বাংলাদেশ আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। আমাদের প্রিয় স্বজন সেই তৃণমূলের জনগণ যাদের রক্ত আর ঘামের ফসল এই বাংলাদেশ। তারা ভালো নেই। কেউ বা কর্মহীন, কেউ বা গৃহহীণ, কেউ বা ভুমিহীন, কেউ বা চাকরীচ্যুত, কেউ স্বামীহারা, কেউ পিতৃহীন, কেউ ঋণগ্রস্ত, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত, কেউ বা মুখ বুজে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছে। আহ! কত কষ্ট লুকিয়ে চাপিয়ে আর কত কান্না?

শত জনের আকুতি ও আহাজারি শুনতে হচ্ছে। সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, অভাবী ও দরিদ্র অসহায় পিছিয়ে পড়া জনসাধারণ এবং এ সময়ে সমস্যাপীড়িত ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবিত্ত লোকজন সহ সকলেই খুব সমস্যায়। আসলে পৃথিবী আজ ভালো নেই। চারিদিকে কান্নার রোল। অসহায় মানুষ। মানবতা বিপন্ন। জনজীবন সংকটাপন্ন। সমাজ ও রাষ্ট্র চরম ক্রান্তিকাল এখন অতিবাহিত করছে। প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস বদলে দিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার সার্বিক চিত্র। অসহায় মানুষজন, অসহায় দেশ ও অসহায় মানবতা।

লকডাউনের ফলে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের লোকগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ছে। অনেকের ঘরেই খাদ্যসামগ্রীর সঙ্কট প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে।আয়ের সবরকম উৎস বন্ধ হতে চলেছে। পরিবার নিয়ে অভুক্ত থাকার উপক্রম অসহায় মানুষজনের। মজলুম মানবতা আজ জীবন-মরণের যুগসন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন। অভাব ও মরণ দুইটাই একসাথে ঠায় দুয়ারে দাঁড়িয়ে।

বামপন্থী দলগুলা বা স্বেচ্ছাসেবক দলগুলা কমিউনিটি কিচেন করে সাহায্য করার চেষ্টা করছে । চ্যারিটি না সলিডারিটি এই ধরনের চমতকার বক্তব্য সামনে নিয়ে মানুষ কে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। এইটা খবুই চমতকার উদ্যোগ, সাধূবাদ জানাই। সারা বছর মানুষের পক্ষে তারা অধিকারের দাবীতে দাঁড়ান, তার পাশাপাশি এই দূর্যোগে মানুষের সাথে থাকার চেষ্টা করছেন। এইটাতো দয়ার বিষয় নয়। চ্যারিটি রাজনৈতিক দলের কাজ না। এইটা অধিকারের বিষয়, যেইটা রাষ্ট্র দিতে বাধ্য থাকবে।

১২ এপ্রিল ঢাকজাতীয় প্রেসক্লাবে লকডাউনে জনগণের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় ৪ দফা দাবিতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সমাবেশ করেছে। তারা বলেছে, কোনো লকডাউনই কার্যকর হবে না যদি মানুষের পেটে ভাত না থাকে, চিকিৎসার নিরাপত্তা না থাকে, জীবনের ও জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকে। গত ১৩ মাস যথেষ্ট সময় ছিলো এই করোনা দূর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার। অথচ এই সরকার ব্যস্ত ছিলো দূর্নীতি-লুটপাট করার কাজে, দেশের পাটকল, চিনিকল লুটেপুটে খাওয়ার বন্দোবস্তে।

গত লকডাউনে দূর্নীতি হয়েছে পিপিই, মাস্ক, স্যানিটাউজারসহ নানান চিকিৎসা সরঞ্জামাদি।শাহপদ-সাবরিনা গংকে জনসম্মুখে আনলেও চাপা পড়ে গেছে আরো হাজার হাজার লুটপাটের চেহারা। এই হরিলুটের সাথে এবারে যুক্ত হয়েছে হাসপাতাল লুটের কাহিনী।

এবারের লকডাউন শুরু হওয়ার খবরে এসেছে ৩১ কোটি টাকা খরচ করে করা ২০০০ বেডের বসুন্ধরায় করোনা হাসপাতাল উধাও! মহাখালীর ডিএনসিসি মার্কেটে ১৩ কোটি টাকা খরচ করা ১৩০০ শয্যার হাসপাতাল খালি পড়ে আছে। অথচ হাসপাতালে সিট ফাঁকা নাই, আই সি ইউ ফাঁকা নাই, অনেক জায়গায় থাকলেও নষ্ট।

আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন- পুরো শহরকে হাসপাতাল বানালেও রোগী রাখার জায়গা হবে না।এটাই হচ্ছে করোনা দূর্যোগে এই সরকারের হিম্মত। তারা বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। তাই জনগণের প্রতি ন্যূনতম দায় এদের নাই। তাই সরকারকে তাদের লুটপাট বন্ধ করতে হবে। জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে।

ইতিহাসের বড় শিক্ষা হল সেখান থেকে জাতি কিছু নিতে চায় না। ১৮৯২- ৯৩ সালের দিকে কাজান প্রদেশের সামারায় ব্যাপক দূর্ভিক্ষ হলে প্রচুর মানুষ মারা যায়। ওখানকার বামপন্থীরা সেসময় তাদের সাধ্যমত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি সরকারের সমালোচনাও করে। লেনিনের বোনেরাও (আন্না ও মারিয়া) ত্রাণকাজে অংশ নেয়। লেনিন শুধু অংশ নেয়া থেকে বিরতই থাকেন নি বরং এই ধরণের ত্রাণ কাজকে অবিপ্লবী কাজ মনে করে সমালোচনাও করেছিলেন এবং এমন ভূমিকার জন্য সামারার বামপন্থী মহল ও আন্না লেনিনকে সমালোচনাও করে। তবে লেনিন অনঢ় ছিলেন এবং দূর্ভিক্ষের কারণ নিয়ে সরকারকে সমালোচনা করে কড়াভাবে লেখেন। তিনি মনে করেছিলেন ‘দূর্ভিক্ষের মধ্যে বিপ্লবী উপাদান আছে’ এবং বামপন্থীদের ত্রাণকাজে অংশ নেয়া মানে একটা জ্বলন্ত ও দগদগে ঘায়ে সামান্য মলম দেয়া এবং সংস্কারপন্থী হিসাবে কাজ করা – যে কাজ সেই সময় লিও তলস্তয় ও আন্তন চেখভ সামারায় নোঙরখানা খুলে করছিলেন।

বর্তমান সময়য়ে হেলথ ক্রাইসিস চলছে। স্বাস্থসেবার উপর চাপ যাচ্ছে। দেশে আইসিইউ সংকট চরমে। জীবন বাঁচাতে সংকটাপন্ন রোগীরা অসহায়। ঢাকার বাইরে ৩৬ জেলায় স্থাপন হয়নি একটিও আইসিইউ। এ সময় শুধু একাডেমিক্যালি সব কিছু করা সম্ভব নয়। অনেকটা রাাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাঢ়নিকও। অথচ এ সময়ে ভারত বিরোধীদের ওপর ক্র্যাকডাউন চলছে বলে অনেকের ধারণা।

বাংলাদেশে মূলতঃ ভারত বিরোধী কণ্ঠস্বরগুলোকে খুঁজে খুঁজে ধরা হচ্ছে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে লোকজন বিষয়টা একদম চেপে যাচ্ছে। কেউ যদি কিছু বলে তাহলে স্রেফ সরকারের কথা বলে। কিন্তু অ্যারেস্টগুলোর মূলে কী আছে তা কেউ বলে না।জামায়াত নেতাদের ফাঁসি, খালেদার জিয়ার কারাদণ্ডের মূলে রয়েছে ভারত বিরোধিতার প্রশ্ন। কিন্তু বিএনপি জামায়াত কখনো এ কথা বলে না।

রাষ্ট্রের কাজ জনগণকে নিরাপদ রাখা। অথচ রাষ্ট্র এখন নিজেকেই জনগণের কাছ থেকে নিরাপদ রাখতে ব্যস্ত। সরকার আর রাষ্ট্রের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্যও আজকাল বিলোপ করে দেয়া হচ্ছে। আপনি সরকারের সমালোচনা করলেই আজকে রাষ্ট্রদ্রোহী। আজকাল রাষ্ট্রের আইনসমূহ নাগরিককে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আর না, বরং সরকারকে নিরাপদে রাখাই এর কাজ। এই অবস্থায় আমরা কী চাই? জান ও জবানের স্বাধীনতা? কিন্তু কার কাছে চাই? যারা আমাদের স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা তাদের কাছে? আমাদের নিরাপত্তাই বা কার কাছে চাইব? যারা স্বয়ং আমাদের অনিরাপদ করে তুলছে তাদের কাছেই?এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের।

রিকশা, ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক চালক সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন ও সদস্য সচিব প্রকৌশলী ইমরান হাবিব রুমন এক বিবৃতিতে ঢাকাসহ সারাদেশে লকডাউনকালে ৫০ লাখ রিকশা, ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক চালকের জীবন-জীবিকা রক্ষায় বিকল্প ব্যবস্থা না করে রিকশা আটক, ভাংচুর ও চলাচলে বাঁধা প্রদানের তীব্র নিন্দা এবং চালকদের হয়রানি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, করোনার হাত থেকে মানুষের জীবন রক্ষায় লকডাউন জরুরি কিন্ত ৫০ লাখ চালকের ও তাদের উপর নির্ভরশীল প্রায় ২.৫ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা তার চেয়েও জরুরি। কিন্ত তাদের জীবন রক্ষায় সরকার কোন আয়োজন না করে রাস্তায় চলাচলে বাঁধা প্রদান ও রিকশা ভাংচুর করা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক।

 

 

লেখক: গোলজার আহমদ হেলাল (সাংবাদিক, কলামিস্ট)
প্রধান সম্পাদক, ডেইলিরূপান্তর ডটকম
সহ সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব

এ বিভাগের আরো সংবাদ