কার হাতে হেফাজতের নাটাই?

ত্রিমাত্রিক ধারার অসম অশুভ লড়াই; খেই হারিয়েছে গণমানুষের রাজনীতি!

বাংলাদেশে গণমানুষের রাজনীতি খেই হারিয়েছে। এখানে ত্রিমাত্রিক ধারায় অসম অশুভ লড়াই চলছে। ক্ষমতা,স্বার্থ,কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং নিজেদের আঁখের গোছাতেই ব্যস্ত উত্তর ও দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো। বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, সামন্তবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর গন্তব্যহীন যাত্রা এবং আদর্শিক দলগুলোর (ইসলামপন্থী, আধা ইসলামপন্থী ও সাম্যবাদী দল) অপরিপক্কতা ও দেউলিয়াপনায় জাতি দিশেহারা। মোটা দাগে উত্তর ও দক্ষিণপন্থী ঠিকানায় ভাগ করলেও কিছু কিছু রাজনৈতিক দলগুলোকে বাম ডান কিছুতেই ফেলা কষ্ঠকর। আর নির্বাচনী জোট আদর্শিক নয়, স্বার্থসিদ্ধির হয়ে থাকে। হেফাজতের মত বৃহৎ অরাজনৈতিক দলও রাজনীতিতে বালখিল্যতা দেখিয়েছে। এভাবে তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে জাতি-গোষ্ঠী। গণমানুষের কল্যাণ কিংবা জনমানুষের রাজনীতির মুখ থুবড়ে পড়েছে এখানে।

অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার বাংলাদেশ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে জেগে উঠা কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজত সেসময়ে প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে মিছিল শ্লোগান করে প্রথমে দৃশ্যপটে আসে। সময়ে সময়ে হেফাজতের বিপ্লবী কিংবা রুদ্রমুর্তি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সুসংগঠিত কিংবা অসংগঠিত, সুশৃংখল কিংবা বিশৃংখল যাই বলেন; হেফাজত একটি শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিণত হয়েছে একটি রেডিমেইড দিকদর্শনহীন পলিটিক্যাল পার্টিতেে। ফলে ত্রিমাত্রিক রাজনীতির গ্যাড়াকালে পড়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু জনমনে বিশাল প্রশ্ন কার হাতে এসময়ের আলোচিত সংগঠন হেফাজাতের নাটাই?

রাজনীতিতে একটি কথা আছে সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়। বাংলাদেশে এটি নেই বললেই চলে। পার্শ্ববর্তী দেশের প্রতি সৌজন্যতা আর ‌শিষ্টাচার বোধ থেকেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।সরকারের এ সিদ্ধান্ত ভালোভাবে নেয় নি বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলো। তবে এটিকে বদান্যতা দেখিয়েছে পলিটিক্যাল পার্টিগুলো। আধিপত্যবাদ বিরোধী রাজনীতির ক্রীড়নক হিসেবে খ্যাত বিএনপি জামায়াত ভারত বিরোধী রাজনীতি থেকে সরে এসেছে। বিএনপি মোদী সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। জামায়াত নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর অভিনন্দন জানিয়েছে। আমেরিকার মতো দেশ মোদীর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। হেফাজত এবং প্রগতিশীল সংগঠন গুলো এ শিষ্টাচার অর্জন করতে সক্ষম হয়নি এখনো।

আমাদের দেশের লোকজন কেউ একটা হুংকার দিলেই তার পেছনে ছুটে। প্রকৃত পক্ষে হুংকার কিংবা গর্জন দিয়ে গণমানুষের আস্থা যেমন করা যায় না। তেমনি গণবিপ্লবও সম্ভব নয়। এদেশের মানুষ আশি’র দশকে সিপিবি জাসদের হু়ংকার দেখেছে, নববই’র দশকে জামায়াত জাসদের তর্জন-গর্জন দেখেছে। কালের হাওয়ায় এগুলো হালে পানি পায়নি। জল ঘোলা হয়েছে মাত্র। মামুনুল হক গং গর্জন দিয়েছে বলেই তার পেছনে ছোটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। হেফাজত মামুনুল হকের নাটাই কোথায়,কার হাতে? এ প্রশ্ন আজ সচেতন জনতার মুখে মুখে।

কেউ বলে হেফাজতের পেছনে থেকে সরকার সমুদয় নাটক মঞ্চস্থ করছে। আবার সরকার বলছে বিএনপি জামায়াত ক্ষমতায় যেতে হেফাজত কে ব্যবহার করছে। যাই হোক হেফাজত একটি গুটি তা হেফাজতের লোকজন কয়জনই বা জানে। ঔপন্যাসিক মীর মোশাররফ হোসেন যথার্থ বলেছেন, এ রাজচক্র (রাজনীতি, রাষ্ট্র ব্যবস্থা), ইহার মর্মভেদ করা বড়ই কঠিন। আজ থেকে দু’যুগ আগে বাংলাদেশে জঙ্গী বাহিনীর উদ্ভব হয়েছিল। দৈনিক প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকা সাহসিকতার সহিত জঙ্গী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর স্বরুপ উদ্ঘাটন করে প্রতিবেদন প্রকাশ করত। অপরদিকে কতিপয় মৌলবাদি দর্শনে বিশ্বাসী গণমাধ্যম বাংলা ভাই ও জাগ্রত জনতার পক্ষে রিপোর্ট প্রকাশ করত। প্রথম আলোর বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চ্যালেঞ্জ করে তারা বলত, দু:শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা জনগণের স্বতস্ফূর্ত আন্দোলনের নাম জাগ্রত জনতা। বাংলা ভাই বা জাগ্রত জনতা অন্য কিছু নয়। পরবর্তীতে বাংলা ভাই ও জাগ্রত জনতার উগ্রবাদী কার্যক্রম কে রাষ্ট্র শক্ত হাতে দমন করেছে। প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশের রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে যেমন নেই, তেমনি ইহা নিয়ন্ত্রিত হয় অন্য কোথাও থেকে।

এমন ধারণা বিজ্ঞ জনের। ভাবতে অবাক লাগে, স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে গিয়ে কাউকে কাউকে ধর্ণা দিতে হয়। পেন্টাগন আর ক্রেমলিনকে গিয়ে খুশি করতে হয়।

হেফাজতের রাজনীতির নাটকের কাহিনীর দূর্বল দৃশ্য হলো মামুনুল হক এর সোঁনারগা কান্ড। সাম্প্রতিক কালে হেফাজতের উনিশ জনের প্রাণহানি, তাদের পরিবারে শোকের মাতম, দলের অপর অংশের নায়েবে আমীরের ইন্তেকাল, লকডাউন ও বিপর্যস্ত জনজীবন ফেলে পিকনিক করার স্বাদ কেন জাগল এ নেতার? দলীয় কর্মীদের রক্তের দাগ মূছার আগেই আমোদ প্রমোদে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে দেশের রেল লাইন উপড়ে ফেলা, ভূমি অফিসের কাগজপত্র জ্বালিয়ে দেয়া, ডিসি অফিস, এসপি অফিস, থানা ভাংচুর, স্বাধীনতা দিবসে মিছিল, হামলা ও অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনার নাটক মঞ্চায়নের সাথে জড়িত পরিকল্পনাকারী রাঘব বোয়ালদের সাথে হেফাজতের ঐ নেতার যোগসূত্র আছে।

এটি অমুলক নয়। ইতিহাসে অনেক বড় বড় নেতারা গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন। জায়নবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছেন। এর ভুরি ভুরি নজির আছে। ইরানের বিপ্লবের পর সেখানে একজন গুপ্তচর প্রধানমন্ত্রীও হয়ে গিয়েছিল, শহীদ ইয়াসির আরাফাতকে সরিয়ে ফিলিস্তিনের নেতা হতে চেষ্টা করেছিল ইসরাইলি এজেন্ট দাহলান। তার চেষ্টায় আমিরাত বাহরাইন মরক্কো সুদানসহ বহু মুসলিম দেশ এখন ইসরাইলমিত্র। সে জায়গায় বাংলাদেশের ইসলামী নেতাদের সন্দেহজনক কার্যক্রমকে অন্ধের মতো সমর্থন করা আহাম্মকি ছাড়া আর কিছুই নয়। একের পর এক বিতর্কিত কাজ দেখে বরং আশঙ্কা করা যায় যে, ইসলামী দলগুলো শত্রুপক্ষের খপ্পরে পড়ে গেছে। দলের লোকজন সরল ও ক্রিটিক্যাল চিন্তাহীন। ফলে তাদের পক্ষে নেতৃত্বের যে কোন কাজ স্বাভাবিকই মনে হয়। কিন্তু যারা গভীরভাবে অবলোকন করেন তারা বুঝতে পারে যে কিছু একটা ঘটছে।বিভিন্ন গ্রুপ উপগ্রুপের নামে অনেকেই দালালী করছে। দেশ যদি ফিলিস্তিনের পরিণতিও বরণ করে তখনও এদেশের মুসলমান ওয়াজ আর বইপড়ার মাস্তি নিয়া থাকবে।

ক্ষমতাসীনরা সব সময় অপরাপর শক্তিগুলো কে কাছে রাখতে চায়। কাছে না পেলে খড়গহস্ত হয়। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। সরকার কওমীর স্বীকৃতি দিয়ে হেফাজত আওয়ামীলীগের কাছের কিংবা কওমী জননী উপাধি পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন হয়ে গেছে হেফাজত নেতৃত্ব। এগুলো মনে করা ভূল। ইহা পপুলার পলিটিক্স কিংবা ভোট রাজনীতির কৌশল মাত্র।রাজনৈতিক নেতার পক্ষে দলীয় কর্মীরা ডিফেন্ড করবে স্বাভাবিক। কিন্তু যে কোন ঘটনায় মহান ইসলাম ধর্মকে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়া ঠিক নয়। ইসলাম কোন গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত দলীল নয়। অথচ ইসলাামপ্রিয় জনগণ এখানে প্রায়ই ভূল করে ফেলে বলে অনেকের ধারণা।

ইতিহাসে চরম বিপর্যয়কারী ও দুনিয়ার সব জায়গা থেকে বিতাড়িত জায়নবাদী গোষ্ঠী বিশ্ব রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রক ও অনুঘটকের কাজ করছে। তারা সমগ্র পৃথিবীর রাজনীতি, ব্যবসা, মিডিয়া, মিলিটারী ও সংস্কৃতিকে করায়ত্ত করে রেখেছে। ইহুদিদের বিশ্বকে শাসন করার পরিকল্পনা স্বরূপ বিখ্যাত বই (১৯০১ সালে লেখা হয়) ‘The Protocols of the Elders of Zion’ যাতে চব্বিশটা প্রোটকল রয়েছে। এটির আলোকে গোপন সংগঠনের মাধ্যমে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তারা। একদিকে ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সর্ম্পকের টানপোড়েন, উত্তেজনা, দ্বন্দ-সংঘাত নতুন আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে, অন্যদিকে অব্যাহত উত্তেজনা ও আশঙ্কার মধ্যেও অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজা এলাকায় নতুন নতুন ইহুতি বসতি ও স্থাপনা গড়ে তোলার গতি বাড়াচ্ছে। এটাই ইহুদি জায়নবাদি সম্প্রসারণবাদ। ইঙ্গ-মার্কিনীদের প্রত্যক্ষ মদদে গত ৭০ বছর ধরে এটা চলছে।

আন্তর্জাতিক আইন, বিশ্বসম্প্রদায়ের মতামত ও সিদ্ধান্ত, আইনের শাসন, সাম্য-মৈত্রী ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার মূল্যবোধ এখানে যেন অচল। দশকের পর দশক ধরে চলা ইসরাইলী দখলদারিত্ব ও সম্প্রসারণবাদী তৎপরতায় মার্কিন মুল্লুকের নির্লজ্জ পক্ষপাতের কারণে বিশ্বসম্প্রদায় কখনো নিরব, কখনো অসহায়। আজকের বিশ্বব্যবস্থায় যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও ভঙ্গুরতা দেখা দিয়েছে তার পেছনে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি জায়নবাদের সম্প্রসারণবাদি পরিকল্পনা ও পশ্চিমা মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্সের স্বার্থ। রক্তপাত, দখলদারিত্ব ও কোটি কোটি মানুষের মানবিক অধিকার ও মর্যাদা হরণের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো এ স্বার্থ রক্ষা করছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট, ইরান-ইরাক ও প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধ পর্যন্ত গত তিন দশকে মধ্যপ্রাচ্যে যে সব যুদ্ধ-সংঘাতের জন্ম দেয়া হয়েছে তাতে পশ্চিমাদের সামরিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বিজয় কিংবা স্বার্থ জড়িত আছে।

দুনিয়ার মানুষকে সর্বপ্রথম এ বইটি সম্পর্কে অবহিত করে অধ্যাপক সারকিল এ নাইলাস নামক জনৈক গোঁড়া রুশীয় পাদ্রী। ১৯০৫ সালে অধ্যাপক নাইলাস নিজে উদ্যোগী হয়ে বইটি প্রকাশ করে। বইয়ের ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘ইহুদী ফ্রি-ম্যাসন ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রস্থল’ ফ্রান্সের একটি ফ্রি-ম্যাসন লজ থেকে জনৈক মহিলা (সম্ভবত হিব্রু ভাষায় লিখিত) মূল বইটি চুরি করে এনে তাকে উপহার দেয়।

উল্লেখ্য যে, এ ঘটনার পর কোনো মহিলাকেই আর ফ্রি-ম্যাসন আন্দোলনের সদস্য করা হয় না। সামাজিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে মহিলারা ফ্রি-ম্যাসন লজে যাবার অনুমতি পেলেও বৈঠকাদির সময় তাদের বের করে দেয়া হয়।

১৯১৭ সালের জানুয়ারি মাসে অধ্যাপক নাইলাস এ বইয়ের একটা নয়া সংস্করণ তৈরি করে এবং বাজারে বের হবার আগেই ওই বছর মার্চ মাসে রাশিয়ায় কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত হয়। জার সরকারকে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা দখলকারী কীরিনিস্কী সরকার প্রটোকলের সকল কপি বিনষ্ট করে ফেলে। কারণ এ বইয়ের মাধ্যমে রুশ বিপ্লবের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাবার আশঙ্কা ছিল। নাইলাসকে গ্রেফতার করে জেলে নিক্ষেপ করা হয় এবং অমানুষিক দৈহিক নির্যাতনের পর তাকে রাশিয়া থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। ১৯২৯ সালের ১৩ই জানুয়ারি সে ভ্লাদিমিরে মারা যায়।

কিন্তু তা সত্ত্বেও বইটির এত চাহিদা হয়েছিল যে, ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এর ৪টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ছাপানো পুস্তক ছাড়া পাতলা কাগজে টাইপ করেও এটি প্রকাশ করা হয়েছিল। ধান পাতার তৈরি এক প্রকার কাগজে লেখা একটি প্রটোকল পুস্তক সাইবেরিয়া অঞ্চলে প্রচার করা হয়েছিল। এরই এক কপি ১৯৩৯ সালে আমেরিকায় পৌঁছে এবং সেখানে এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

প্রটোকলের ইংরেজি অনুবাদক ছিল ভিক্টরই মারসডেন। সে একজন ইংরেজ সাংবাদিক। দীর্ঘকাল রাশিয়ায় বসবাস করে এক রুশ মহিলাকে সে বিবাহ করে। ‘মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকার রুশীয় সংবাদদাতা হিসেবে সে কাজ করতো। ১৯৩৭ সালের বিপ্লব সে স্বচক্ষে দেখে এর রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ সংবাদপত্রে প্রেরণ করে। এজন্য তাকে গ্রেফতার করে দু’বছর ‘পিটার পল’ জেলে রাখা হয় এবং সেখান থেকে মুক্তির পর ইংল্যান্ডে ফিরে এসে সে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বসে প্রটোকলের তরজমা করে। বলশেভিক বিপ্লবের পর রাশিয়া থেকে পালিয়ে যে সব লোক আমেরিকা ও জার্মানিতে আশ্রয় নেয়, তারাও অধ্যাপক নাইলাস অনূদিত প্রটোকলের কিছু কপি সঙ্গে নিয়ে আসে।

অধ্যাপক সারকিল এ নাইলাস ধর্মে খ্রিস্টান ছিল। সে স্বীয় ধর্মকে ইহুদী ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই এ বইটি বিশ্ববাসীর কাছে পেশ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। প্রটোকল বইটি গুপ্ত চক্রান্ত মারফত বিশ্ব সমাজ গঠনের ইহুদী পরিকল্পিত একটি নীল নকশা। এ নীল নকশায় যে ধরনের বিশ্ব রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করা হয়েছে আজ হতে প্রায় ৩০০ বছর আগে ইহুদীরা প্রনয়ণ করে এক মাস্টার প্ল্যান; যা ইহুদী প্রটোকল নামে পরিচিত। যার প্রধান লক্ষ অ-ইহুদিদের দুনিয়া হতে চিরতরে মিটিয়ে দেয়া কিংবা গোলামে পরিণত করা।

জ্যান্টাইলদের (ইহুদিরা অ-ইহুদিদেরকে “জ্যান্টাইল” বলে সম্বোধন করে থাকে।) শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ইহুদীদের ষড়যন্ত্রগুলো কতটা গভীর ও হিংস্র তা তাদের প্রটোকলগুলো পড়লেই অনুধাবন করা যায়।

বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচিত সেই ফাঁস হয়ে যাওয়া ইহুদীদের ৩০০ বছরের মাস্টার প্ল্যান নিয়ে লিখিত The Protocols of the Elder of the Zion বইটির ৯ম প্রটোকলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে- “জ্যান্টাইল যুব সমাজের বুদ্ধিবৃত্তি, নৈতিকতারোধ ও স্বাধীন চিন্তাশক্তি ধ্বংস করতে এক মিথ্যা বানোয়াট শিক্ষাব্যবস্থা ইতিমধ্যে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা যদিও নিজেরা এই শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করব না।”

শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করে কীভাবে পারিবারিক বন্ধনে ফাঁটল ধরানো সম্ভব, তা ১০ম প্রটোকলে বলা হয়েছে- “আমাদের প্রতিনিধি শিক্ষাব্যবস্থাকে তাদের যোগ্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠিতে পরিণত করবে। কর্মজীবনে প্রবেশের পূর্বে এই শিক্ষা পদ্ধতি দ্বারা যোগ্যতা মূল্যায়নের পদ্ধতি প্রতিনিধি করেই ছাড়বে। এক সময় এই শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের মাঝে অহমিকা ও অহংকারের জন্ম দেবে। যা পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে উসকে দিবে। যতদিন না কাঙ্খিত সময়টি হাতের মুঠোয় আসছে। ততদিন পর্যন্ত তাদের বিভিন্ন আমোদ-প্রমোদে ডুবিয়ে রাখব।

ডারউইনবাদ মার্কসবাদ, নাৎসিবাদ ইত্যাদিকে প্রগতিশলতার উপায় হিসেবে তাদের সামনে উপস্থাপন করেছি। এসব তত্ত্বের উপর ভর করে থাকায় তাদের নৈতিকতাবোধ ধ্বংস করেছি এবং সামনের দিনগুলোতে-এর কোন ব্যতিক্রম ঘটবে না।” হয়তবা প্রটোকলগুলো পড়তে বেশ অবাক লাগবে। মনে হয় যেন, প্রটোকলগুলোর মধ্যেই বর্তমান বিশ্বের বাস্তব চিত্রগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আসলেও তাই; যেমন বলা তেমন কাজ। আজকের যুগে ডিভোর্সের হার বেড়ে গিয়েছে। বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক, অবৈধ সন্তান, গর্ভপাত, মাদক সেবন, আত্মহত্যা, পরকীয়া, বেকারত্ব, হতাশা, বৃদ্ধ বাবা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা, ছেলের বৌ এর সাথে শ্বশুরের অবৈধ সম্পর্ক, শ্বাশুড়ির সাথে মেয়ের জামাইয়ের অবৈধ সম্পর্ক….. ইত্যাদি তো আজকের নিয়মিত চিত্র! এসব কি তাহলে ইহুদীদের ষড়যন্ত্রের ফল নয়?

সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, পৃথিবীতে যে কয়টি বড় ধরনের ঘটনা বা দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার সব কয়টিই প্রটোকল পুস্তকে ভবিষ্যত বাণীর মত লিখা আছে। গুপ্ত ইহুদীবাদ আন্দোলনের কাগজপত্র থেকে জানা যায়, ইহুদী পন্ডিতগণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমগ্র বিশ্বজয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। এজন্য তারা সাপের মত ধূর্ত কৌশলকে অবলম্বন করেছেন।দেশে দেশে তারা দালাল গোষ্ঠী নিযুক্ত করে ষড়যন্ত্রের সর্বমুখী জাল বিস্তার করেছে। রাজনীতি ও নৈতিকতাকে পরস্পর বিরোধী করে উত্তেজিত জনতা, উশৃংখলতাকে পূঁজি করে নাগরিক সমাজে উদারতাকে হাইলাইট করে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কাজ তারা করছে। তারা মনে করে শক্তিই ন্যায়,তাই শক্তিকে সকল কিছুর উপরে স্থান দিয়ে জোর যার মুল্লুক তার নীতি গ্রহণ করতেও কুন্ঠাবোধ করে না তারা।তারা মনে করে জনতা এক অন্ধ শক্তি। জনসাধারণ বর্বর।নৈতিকতা পরিচালিত শাসক দক্ষ রাজনীতিবিদ নয়।তাই মানুষের ব্রেইনওয়াস করে ভিনজগতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে তারা।এক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের মাদ্রাসাগুলো তাদের বড় টার্গেট।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব মূলত জাতির কান্ডারী। মুল চালক।নারী আর অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ভিনদেশী গোপন সংস্থাগুলো আপনাকে কাজে লাগাতে পারে। এ ধরনের ষড়যন্ত্র পৃথিবীর হাজার বছরের ইতিহাসেরই অংশ। আপনি ফাঁদে পা দিচ্ছেন কেন? আটকে যাওয়া সিংহের গর্জনের যেমন কোন মূল্য নেই তেমনি আপনি কাকে আগামী দিনের কান্ডারী বলছেন তা একবার ভেবে দেখুন। এগুলো বলে কোন লাভ হবে না। গত এক যুগের বাংলাদেশ আমাদের এই বার্তা দিচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর হযবরল অবস্থা এর জন্য দায়ী।

রাজনীতির শূন্য গোয়াল নিষ্ঠুর রাজনীতির এক মরণ ব্যাধি। দ্রব্যমূল্য ও তার সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেে আছে কি না তা ভাবনার বিষয়। শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় আটমণ চাল পাওয়া যেত।এটি যেন রূপকথার গল্পের মত। ঠিক দশ টাকা চালের কেজিও একসময় এই প্রজন্মের রাজকুমারী রাজপুত্রের গল্প রচিত হবে পরবর্তী ইতিহাস। ইতিহাসের চরম বাস্তবতা। সরকারী চাকরিজীবীদের উচ্চ বেতন ভাতা আর বাংলাদেশের সকল পেশাজীবি ও শ্রমজীবীদের আয়ের প্রকৃতপক্ষে কোন সামঞ্জস্য নেই। এটাই প্রকট অর্থনীতির সংকটের মুল কারণ।

এদেশের রাজনীতিবিদদের এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। সব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদা পুরণ করতে সকলের নাভিশ্বাস। এটি রাজনৈতিক সমস্যা। এজন্য নেতৃত্বের চরম অবিশ্বাস ও আস্থার সংকট তৈরী হয়েছে।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, হেফাজত নেতা মামুনুল হক পার্লারের নারী নিয়ে রিসোর্টে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ওই নারীকে মামুনুল হক বউ হিসেবে পরিচয় দিলেও নিজের বউয়ের কাছে বলেছে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিচয় দিয়েছেন। রোববার(৪ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনের সমাপ্তি ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথাগুলো বলেন। রিসোর্টে হেফাজত নেতা মামুনুল হক এক নারী নিয়ে অবস্থান এবং সেখানে হেফাজতের ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদের চরিত্রটা কী তা বলতে চাই না। গতকালই আপনারা দেখেছেন। ধর্ম ও পবিত্রতার কথা বলে অপবিত্র কাজ করে ধরা পড়ে। ‘সোনারগাঁয়ে একটি রিসোর্টে হেফাজতের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ধরা পড়লো। তা ঢাকার নানা রকম চেষ্টা করেছে তারা। পার্লারে কাজ করা এক নারীকে বউ হিসেবে পরিচয় দেয়। আবার নিজের বউয়ের কাছে বলে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমি এটা বলেছি। যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে তারা এরকম মিথ্যা কথা বলতে পারে, অসত্য কথা বলতে পারে? তারা কী ধর্ম পালন করবে, মানুষকে কী ধর্ম শেখাবে। ‘কয়েকদিন আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে, এখন সুন্দরী নারী নিয়ে বিনোদন করতে গেলেন। ইসলাম পবিত্র ধর্ম, সেই পবিত্র ধর্মকে এরা কলুষিত করছে। বিনোদনের এসব অর্থ আসে কোথা থেকে। ’প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি তখন এসব ঘটনা ঘটানো হলো। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এত বড় একটা সম্মান, বিভিন্ন দেশের অতিথিরা আসছেন, শুভেচ্ছা বার্তা দিচ্ছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আসা বিরোধিতা করে তারা। আজ হেফাজতে ইসলাম এটা করছে তারা দেওবন্দ (ভারতে) যায় না? এসব ঘটনা ঘটনা ঘটালো দেওবন্দ যাবে কী করে। আমরা কওমি মাদ্রাসার সনদ দিয়েছি, আমরা সম্মান দিচ্ছি তারপরও তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটালো কী করে। এদের কোনো রাজনৈতিক কোনো আদর্শ নেই, কোনো আদর্শ নিয়ে এরা চলে না।

মামুনুল হক ব্যক্তি যাই হোক নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যায় না। যেখানে প্রচলিত আইন আছে, আদালত আছে সেখানে কতিপয় ব্যক্তিবিশেষ দ্বারা কেউ আক্রান্ত, লাঞ্চিত ও হেনস্তার শিকার হওয়া মেনে নেওয়া যায় না। আইনের শাসনের উপর চপেটাঘাত হয়ে গেল কি না?

তবে সারা বাংলাদেশে আগুন জ্বালিয়ে,সমর্থকদের গুলির মুখে রেখে এভাবে আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত হওয়া রহস্যজনক। রোম যখন পুড়ছে নীরু তখন বাঁশী বাজাচ্ছে দেশবাসী তাই দেখলো। আমরা হ্যামেলিয়নের বাঁশিওয়ালা, যুগোশ্লাভিয়ার শিশু রাজত্ব, গালিভার -লিলিপুটের কাহিনী শুনেছি। এরকম অনেক ভিলেন ইতিহাসে পাওয়া যায়। কাল্পনিক হোক আর বাস্তব হোক এ ব্যাপারে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।

হেফাজতের নাটাই আসলে কার হাতে? কারা তাদের পৃষ্ঠপোষক?তবে তাদের বিশাল জনশক্তি রয়েছে। মাদ্রাসার অবুঝ ছেলেরা আর ধর্মপ্রাণ আবেগী মুসলমানরাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর এই অস্ত্রে মারাত্মক ভাবে আঘাত করেছে মামুনুলের সোঁনারগা কান্ড।অনেকর ধারণা শাপলা চত্বরের ঘটনাও এমন আঘাত করেনি। শাপলার ঘটনা যেখানে মনোবল বৃদ্ধি করছে এ ঘটনার ফলে নৈতিক পরাজয়ের সম্মুখীন দলটি। ধুমকেতুর মতো আবির্ভাাব হওয়া সংগঠনটি উল্কাপিন্ডের মতো পতন হবে না ঘুরে দাঁড়াবে তা সময়ই বলে দিবে। তবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে রক্তাক্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে দুষ্টু রাজনীতির বলি হয়ে প্রাণহারানো মানুষগুলোর হত্যাকান্ডের জবাব চায় বাংলাদেেশ।

 

 

লেখক: প্রধান সম্পাদক, ডেইলিরূপান্তর ডটকম
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট

এ বিভাগের আরো সংবাদ