রমজানে জনদুর্ভোগ এড়াতে করণীয়

মুসলিম উম্মাহর মাহে রমজান আসন্ন। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র, বরকতময়, সংযম ও ধৈর্যের বার্তাবাহী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস এই রমজান।

বাংলাদেশে রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই বাড়তে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য; যা ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ হচ্ছে পণ্যবাজারে। কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে পাঁচ-সাত টাকা, ডাল ১০-২০ টাকা, ডিম হালি প্রতি পাঁচ টাকা, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম কেজি প্রতি ৫-১০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৫-২০ টাকা, ছোলা কেজি প্রতি ১০-২০ টাকা, মাছ কেজি প্রতি ৩০-৫০ টাকা, মুরগি ২০-৫০ টাকা, গরুর মাংসও ক্ষেত্রবিশেষে ২০-৫০ টাকা। এছাড়া কাঁচাবাজারের ক্ষেত্রেও ৫-১০ টাকা বেড়েছে। অথচ মাসখানেক আগেও দাম সহনীয় পর্যায়ে ছিল।

এখনো করোনার ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পায়নি বিশ্ব, উপরন্তু দ্বিতীয় দফায় করোনা আরো ভয়ংকর হয়ে উঠছে। যে কারণে গোটা বিশ্বেই পণ্যের দাম কিছুটা চড়া হলেও বাংলাদেশে তা কয়েক গুণ বেশি। দ্রব্য উত্পাদনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলেও যোগাযোগের সমস্যা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি, পরিবহন খরচ এখন দ্বিগুণেরও বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া হওয়ায় দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়েনি বরং গড় আয় কমেছে ২০ শতাংশ। কেননা করোনা মহামারিতে অনেকেই তাদের আয়ের উত্স হারিয়েছে।

কলকারখানাগুলো ব্যয় সংকুলান করতে না পেরে কর্মী ছাঁটাই করেছে, যা তাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। নিম্নমুখী আয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নিত্য-নৈমিত্তিক ক্রয়ক্ষমতার ওপর যেখানে দাম স্থিতিশীলও থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রমজানকে উপলক্ষ্য করে সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীরা আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধি করলে সাধারণ মানুষের ওপর তার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রোজার মাসে কেন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে? উত্তরে বলা হবে যে, চাহিদা বাড়ছে তাই জোগান স্বল্পতায় ভারসাম্য আনতে গিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। আদৌ কি তাই? পণ্যগুলো কী পরিমাণ লাগবে এগুলো কি আমাদের অজানা? কোন কোন দ্রব্য কী পরিমাণে দরকার তা জানা থাকলে, কেন পণ্যের জোগান স্বল্পতা দেখা যায়? কেন দাম হু-হু করে বেড়ে যায়? নাকি কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে জোগান স্বল্পতার দোহাই দিচ্ছি আমরা?

চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে পূর্ণমাত্রায় ভারসাম্য বজায় থাকবে। শুধু পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করলেই হবে না, সব পেশার মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর লক্ষ্য রেখে সরকারকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য ঠিক করে দিতে হবে।

রমজানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অধিক মুনাফা লাভের আশায় বাজারে কৃত্রিম সংকট (জোগান কম করে চাহিদা বৃদ্ধি করা) সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে। রমজানে পণ্যের দাম বেড়েছে—এমন অভিযোগ যাতে না ওঠে ও সাধারণ ক্রেতারা বুঝতে না পারে, সে জন্য আগে থেকে নিত্যপণ্যের দাম নীরবে পরিকল্পিতভাবে বাড়ানো হয়।

এ বছরও এ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এখনই কী কী কারণে দাম বাড়ছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত। নয়তো আমাদের টনক নড়ার আগেই পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাবে। কোনো কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়ানো হলে অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এজন্য নজরদারি ও নিয়মিত বাজার মনিটরিং বাড়াতে হবে?। এসব মজুতদার-সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভোক্তারা গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হবে। কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অনিয়ম পেলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

আশার কথা হলো, সুলভ মূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে এবার সরকারি বিক্রয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। আমদানি মূল্যের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের ব্যবধান যাতে বেশি না হয়, তা তারা নজরে রাখবে। এমন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হলে আমরা সুন্দর, সুশৃঙ্খল জীবন ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব। পাশাপাশি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে ও উত্সাহ-উদ্দীপনায় আসন্ন মাহে রমজান পালনে সক্ষম হব।

এ বিভাগের আরো সংবাদ