কাজে ফিরব, মামলায়ও লড়ব: কিশোর

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ১০ মাস কারাবন্দী থাকার পর গত ৪ মার্চ জামিনে মুক্ত হন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর। কারাগার থেকে তাঁকে প্রথমেই যেতে হয় হাসপাতালে, চিকিৎসা নিতে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর ওপর নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এর বিচার চেয়ে আদালতে মামলাও করেছেন। এই কার্টুনিস্ট এখন বলছেন, নিজের কাজে ফিরতে চান তিনি। আর এর সঙ্গে আইনি লড়াইও চালিয়ে যাবেন।

সম্প্রতি আহমেদ কবির কিশোরের সঙ্গে কথা বলেছেন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক আলিয়া ইফতিখার। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক এই সংগঠন সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে। তাদের দেওয়া কিশোরের সেই সাক্ষাৎকার গতকাল মঙ্গলবার সিপিজে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সেখানে আহমেদ কবির কিশোর তাঁর কাজ, আটক হওয়ার পর ‘নির্যাতনের’ বর্ণনা দিয়েছেন।

সিপিজে অবশ্য এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশে আগে সংঘটিত হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনার যে বিবরণ সিপিজের কাছে রয়েছে, তার সঙ্গে আহমেদ কবির কিশোরের বর্ণনা মিলে যায় বলে উল্লেখ করেছে তারা।

কারামুক্ত হওয়ার পর আহমেদ কবির কিশোরকে কানের সংক্রমণ, পায়ের আঘাত, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা নিতে হয়। তাঁর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখার নির্দেশ ইতিমধ্যে আদালত দিয়েছেন।

আহমেদ কবির কিশোরকে গত বছরের মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন লেখক–ব্যবসায়ী মুশতাক আহমেদও। পরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে র‍্যাবের করা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আহমেদ কবির কিশোর মুক্তি পাওয়ার কয়েক দিন আগেই কারাগারে মারা যান মুশতাক আহমেদ।

সিপিজেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুরুতেই আহমেদ কবির কিশোর তাঁর কার্টুন আঁকায় ঝোঁক হওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা শিল্পী ছিলেন। তিনি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছেন। বড় ভাইও আমাকে ছবি আঁকতে শিখিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই আমি ছবি ও কার্টুন আঁকতে ভালোবাসি।’

এই কার্টুনিস্ট বলেন, ‘করোনাভাইরাসের মহামারির সময় আমি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছিলাম। যেসব লেখকের লেখায় মহামারি অথবা দুর্ভিক্ষ উঠে এসেছে, তাঁদের কাজে অনুপ্রাণিত হয়েছি আমি। সেসব ঘটনা আমি ছবিতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। করোনাভাইরাস নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির দিকে নজর রাখছিলাম আমি। পরিস্থিতি তখন এমন ছিল যে হাসপাতালে যাওয়ার পথেই মানুষের মৃত্যু হচ্ছিল। আমি সারা দিন কার্টুন আঁকতাম। ঘুমে ঢলে না পড়া পর্যন্ত এঁকেই যেতাম।’

আহমেদ কবির কিশোর বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নিখোঁজ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হওয়া প্রথম রাজনৈতিক কার্টুনিস্টদের মধ্যে আমি একজন। আমি প্রথমে নিখোঁজ হই, নির্যাতিত হই, এরপর কারাবন্দী হই।’ গ্রেপ্তারের আগে কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ব্লগে কিছু হুমকি পেয়েছিলাম। সেখানে বলা হয়েছিল, আমার কাজ অত্যন্ত নেতিবাচক। অথচ আমি তো কেবল বাস্তবতার চিত্রটিই তুলে ধরছিলাম। আমার কোনো পক্ষপাত নেই। আমার সব কার্টুনই বাস্তবভিত্তিক।’

সংবাদমাধ্যমের ওপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রভাব কী—এ প্রশ্নের উত্তরে আহমেদ কবির কিশোর বলেন, ‘সব সংবাদমাধ্যমই যখন চাপে, মানুষ তখন ডিজিটাল ডিভাইসে স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজছিল। কার্টুন আঁকার জন্য, শিল্পের জন্য আপনি যদি হয়রানি করেন, তার অর্থ হলো আপনি মানুষকে, মানুষের অধিকারকে সংকুচিত করছেন।’

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাগুলো দেখেন, ফারাকটি দেখবেন। সরকারি লোকেরা এই আইনের ফলে সুবিধা পাচ্ছেন। আপনি যদি বাকস্বাধীনতার চর্চা করতে চান, আপনাকে এই আইনের আওতায় আক্রান্ত হতে হবে, শাস্তি পেতে হবে। এটা সরকারের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। আপনি যদি এসবের বিরুদ্ধে কথা বলেন, এমনকি ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন, তাহলে অবশ্যই আপনাকে ভুগতে হবে।’

আটকের সময়কার ঘটনা সম্পর্কে কিশোর বলেন, ‘গত ২ মে, ঘড়িতে তখন বিকেল পৌনে ছয়টা। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। সাদাপোশাকে প্রায় ছয়জন আমার বাসায় আসে। তারা দরজা ভেঙে জোর করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা আমাকে বাইরে বের হওয়ার জন্য পোশাক পরে নিতে বলে আমার ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে নেয়। আমি তাদের পরিচয় ও আমার বাসায় আসার কারণ জানতে চাই। এতে তারা রেগে গিয়ে চিৎকার–চেঁচামেচি শুরু করে। বাড়ির বাইরে লোক জড়ো হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারছিলাম, তারা আমাকে আটক করতে এসেছে। আমি জানতে চাই, তাদের কাছে আমাকে আটক করার ওয়ারেন্ট আছে কি না। এতে তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আমাকে লাঞ্ছিত করে। তাদের নির্দেশ মেনে চলতে হুকুম দেয়।’

এই কার্টুনিস্ট বলেন, ‘তারা আমার চোখ বেঁধে ফেলে। হাতকড়া পরিয়ে আমাকে একটি গাড়িতে তোলা হয়। প্রায় ৪২–৪৩ মিনিট চলার পর গাড়িটি থামে। তারা আমাকে একটি ভেজা, স্যাঁতসেঁতে কক্ষে নিয়ে যায়। ওই কক্ষে পেট্রলের তীব্র গন্ধ ছিল। আমাকে সেখানে ছয় ঘণ্টা রাখা হয়। যখনই চোখে বাঁধা কাপড় খুলতে গেলাম, ঠিক তখনই কয়েকজন সেখানে এসে আমাকে মারতে শুরু করে। তারা আমাকে হুমকি দেয়, আমি যদি এমন কাজ আবার করি, তাহলে আমাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। তারা আমাকে পিঠমোড়া করে হাতকড়া পরায়।’

কিশোর বলেন, ‘আরও ঘণ্টা ছয়েক পর তারা আমাকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যায়। এটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছিল। সেখানে আমি সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ পাই। কিছুক্ষণ পর আমার চোখ খুলে দেওয়া হয়। ওই সময় আমার আঁকা কার্টুন একের পর এক দেখানো হয়। প্রশ্ন করে, আমি এগুলো কেন এঁকেছি? কার্টুনে থাকা একটি দুর্নীতিবাজ চরিত্র দেখিয়ে বলে, এটি কে? এরপর আবারও শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন।’

এই নির্যাতনের একপর্যায়ে মাথায় ও ডান কানে আঘাত করা হয় জানিয়ে আহমেদ কবির কিশোর বলেন, ‘তীব্র ব্যথায় আমি কঁকিয়ে উঠি। বুঝতে পারি, গরম কিছু কান বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু হাতকড়া পরা থাকায় স্পর্শ করতে পারিনি। আমি কাঁদতে শুরু করি। অসহায়ভাবে চিৎকার করি। তাতেও তাদের মন গলেনি। বন্ধ হয়নি শারীরিক নির্যাতন। আমাকে বাথরুমে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে সেখানে গিয়ে শার্টে রক্ত দেখতে পাই। বাথরুমের মেঝেতেও তাজা রক্ত ছিল। এর অর্থ, আমার আগে সেখানে অন্য কাউকে নির্যাতন করা হয়েছে। ওই সময় তারা আমাকে প্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল ও ডেভিড বার্গম্যানকে নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করে। ফেসবুকে তাঁরা কীভাবে আমার বন্ধু হলেন, অনলাইনে তাঁদের সঙ্গে আমার কী ধরনের কথা হয়—সেসব জানতে চাওয়া হয়।’

৫ মে মুশতাকের দেখা পেয়েছিলেন বলে জানান আহমেদ কবির কিশোর। তিনি বলেন, ‘৫ মে বিকেল নাগাদ আমি মুশতাক ভাইকে দেখতে পাই। এরপর আমাদের দুজনকে খিলগাঁওয়ে র‌্যাবের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ওই সময় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় আমি বেশ কাতর ছিলাম। মুশতাক ভাই আমাকে হাসিমুখে থাকতে বলেন। তিনি বলেন, “আমরা কোনো অন্যায় করিনি। তাহলে এমন হতাশ থাকব কেন?” পরে মুশতাক ভাই আমাকে বলেন, তাঁকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। ওই সময় আমরা পাশের কক্ষ থেকে আরও মানুষের আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। সেখান থেকে চলে আসার সময় আমরা মেঝেতে রক্ত আর নোংরা পানি দেখেছিলাম।’

কারাগারের জীবন সম্পর্কে এই কার্টুনিস্ট বলেন, ‘মুশতাক ভাই আর আমাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে ছয় বাই আট ফুটের একটি কক্ষে আমাদের ১৫ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়। যদিও ওই কক্ষে আমরা দুজন ছাড়া আরও পাঁচজন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত ছিলেন। আমাদের মনে হচ্ছিল, আমরা এবার নির্ঘাত মারা যাব। কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় আমাদের কক্ষ থেকে বের হওয়ার অনুমতি ছিল না। ওই সময় আমি সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে কার্টুন আঁকতাম। স্কেচ করতাম। তখন আমার স্কেচবুক নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আমি প্রত্যাশায় ছিলাম, একদিন সেটা ফেরত পাব। সেটা আমার কারাজীবনের স্মারক হয়ে থাকবে। কোয়ারেন্টিন শেষে মুশতাক ভাই আর আমাকে আলাদা রাখা হয়। যদিও আমরা একই ওয়ার্ডে ছিলাম। মাঝেমধ্যে কথা বলার সুযোগ হতো আমাদের।’

লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু নিয়ে আহমেদ কবির কিশোর বলেন, ‘তখন আমি হাসপাতালে ভর্তি। ঘুমাচ্ছিলাম। ওখানকার একজন রোগীর কাছে সংবাদপত্র ছিল। তিনি আমাকে ডেকে তোলেন, মুশতাক ভাইয়ের মৃত্যুর খবর দেখান। ওই সংবাদ দেখে আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। কেঁদে উঠি।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সাক্ষাৎকারে এই কার্টুনিস্ট বলেন, ‘আমি আমার কাজে ফিরতে চাই। একই সঙ্গে মামলা চলছে। এটা নিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

আহমেদ কবির কিশোর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন র‍্যাবের দায়ের করা মামলায়। এ কারণে র‍্যাবের বক্তব্য জানতে সিপিজের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সিপিজে বলেছে, তারা কোনো সাড়া পায়নি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সরকারি অন্য দপ্তরেও মন্তব্য জানতে চেয়ে ই–মেইল করা হয়েছিল জানিয়ে সিপিজে বলেছে, তাতেও কোনো সাড়া পায়নি তারা।

 

 

 

ডেইলিরূপান্তর/আরএফ/প্রথমআলো/ডি.

এ বিভাগের আরো সংবাদ