স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সিলেট নারীবান্ধব হতে পারেনি

নারীদের কানে ভেসে আসে বাজে মন্তব্যে

প্রায় কোটি মানুষের শহরের নাম সিলেট। পুরুষের পাশাপাশি এখানে সমান তালে এগিয়ে চলছেন নারীরা। শিক্ষা, দীক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে নারীদের এখন জয়জয়কার। কিন্তু এই নারীরাই ঘর থেকে বের হলে পড়েন নানা সমস্যায়।

মাঠে ঘাটে কিংবা ভিড়ের মধ্যে শরীর টের পায় অযাচিত স্পর্শ, কখনো কানে ভেসে আসে বাজে মন্তব্য। প্রতিবাদ করলেও বেশিরভাগ সময় পান না সহযোগিতা।

কথায় আছে বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর ‘নারী শাসিত সমাজে একটু বের হলেই হলেই অনিরাপত্তায় ভুগতে হয় নারীদের। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি না পড়ার জন্য সতর্ক থাকতে হয় সবসময় এছাড়া বন্ধুসুলভ পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা বা চলতে ফিরতে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের মতো বিষয়ের অভাব তো আছেই। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠে সিলেট কতটা নারীবান্ধব?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এই প্রতিবেদক বিভিন্ন পেশার কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন। সিলেট সরকারী মহলিা কলেজের ছদ্ধনাম তাবাস্সুম তানহা স্নাতকোত্তর পড়ছেন এই কলেজে। তার মতে

সিলেট মোটেও নারীবান্ধব না। আমাকে যদি ২০ এর মধ্যে মার্ক দিতে হয় তাহলে আমি মাত্র ১ দেবো। কারণ একজন নারীকে ঘর থেকে বের হলেই ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হয়, রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে পোশাক নিয়ে কটু কথা শুনতে হয়।” প্রতিটা নারীকেই এখন সিলেটে বেশ সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন নারী শাসিত দেশে কতটা নারীবান্ধব সিলেট?

এই শিক্ষার্থী আরো বলেন, “সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নারীদের অনুকূলে না। সব মিলিয়ে বেশ সংগ্রাম করেই নারীদের সিলেট শহরে চলাফেরা করতে হয়। এই জায়গা থেকে আমি বলবো, যেসব নারীরা ঘরের বাইরে বের হন তারা স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সাহসিকতার পরিচয় দেন।”

এমসি কলেজের শিক্ষার্থী মারিয়া জানান “নারীকে ঘর থেকে বের হলেই বিভিন্ন ধরনের হেনস্তার শিকার হতে হয়। গণপরিবহনে ওঠার সময় হেলপাররা কারণ ছাড়াই অযাচিতভাবে শরীরে হাত দেন। পাশের সিটে বসে থাকা পুরুষ যাত্রীকে একটু সরে বসতে বললেই তারা নানা যুক্তি দেখায়। মাঝে মাঝে রাস্তায় মানুষজন এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যে, মনে হয় চোখ দিয়েই ধর্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়া বাজে মন্তব্য তো নিত্য ব্যাপার। এ নিয়ে এখন আর ভাবিই না।”

ব্যাংকার ফারহানা বেগম জানান, “অফিসে একটু দেরি হলেই একা একা বাসায় ফেরাটা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এই নগরীতেই মাঝে মাঝেই ধর্ষণ বা যৌন হেনস্তার শিকার হন মেয়েরা। তাই রাত হলে নিরাপত্তার কথা ভেবে সহকর্মীকে অনুরোধ করতে হয় একটু বাসায় পৌঁছে দেওয়ার।”

এব্যাপারে সিলেটের জনপ্রিয় নারী সাংবাদিক দৈনিক সবুজ সিলেটের সিনিয়র রিপোর্টার সুবর্ণা হামিদ বলেন, “সিলেটের পরিবেশ এখনো নারীর অনুকূলে আসেনি। সিলেটে সাংবাদিকতার পথে নারীদের সুবিধায় তেমন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা দেখা যায় না। সবজায়গায় নারীদের প্রতিযোগিতা করতে হয়। একটি বন্ধু সুলভ পরিবেশ পেলে নারীরা আরও সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারতো।”তিনি বলেন, আমরা সাংবাদিকতা যখন শুরু করি তখন অনেক হেনস্থার শিকার হয়েছি। এখন যারা আসবে তাদের পথ সুগম হবে।

সুবর্ণা বলেন,সিলেটে নারীদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং জায়গা। নারীবান্ধবের বিষয়টি তো পরে আসবে, আগে নারী সহনীয় কীনা তা দেখা প্রয়োজন। গণপরিবহনে ভিড়ের ভেতর নারীদের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হতে হয় মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, “এ নিয়ে প্রতিবাদ করলেও পড়তে হয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। অনেককেই বলতে শোনা যায় গণপরিবহনে এমন ধাক্কাধাক্কি হয়। যদি এটা সহ্য না হয়, তাহলে নিজের গাড়ি নিয়ে যেনো চলাফেরা করি। আবার সিলেট শহরে নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেটেরও ব্যাপক অভাব রয়েছে।”

এব্যাপারে সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান আফজাল হোসাইন বলেন, সিলেট এখন কিছুটা নারীবান্ধব হয়ে উঠছে। তবে সেটা সকল শ্রেণির জন্য নয়। যাদের টাকা আছে, নিজের গাড়ি আছে তাদের জন্য সিলেট নারীবান্ধব।

কারণ তাদের গণপরিবহনে উঠতে হয় না। তারা যেখানে শপিং বা কাজ করতে যান, সেখানে একটা ভালো পরিবেশ পান। কিন্তু যারা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত তাদের জন্য সিলেট নারীবান্ধব না। তাদের প্রতিদিন একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আবার সকল পুরুষ যে খারাপ তা নয়। অনেক সময় অপরিচিত একজন পুরুষকেও নারীর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দেখা যায়।

নারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে এসএমপির সাবেক অতিরিক্ত জনপ্রিয় উপকমিশনার ও বর্তমান সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা বলেন, নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন তাদের স্বমহিমায় তাদের সৃজনশীলতার কারেন পুরষের চেয়ে নারীরা অনেক ভালো করছেন। তবে আমাদের এখানে নারী পুরুষের কোনো বৈষম্য নেই। তিনি বলেন, “নারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য এখন প্রতিটি থানায় ব্যবস্থা আছে। একজন নারী যাতে তার সমস্যার কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন তার জন্য ব্যবস্থা থাকে। তারপরও পুরুষদের উচিত নারীদের সম্মান করে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। যাতে প্রতিটা নারীই তার চলার পথে কোনো বাধার সম্মুখীন না হন। একটি সুন্দর পরিবেশ পান।

তিনি বলেন,আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে নারীরা স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ৮ মার্চ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। অন্তত একটা দিন গোটা বিশ্ব আলাদা করে মনে করে নারীরাই এই জগতের শক্তি আর প্রেরণার উৎস। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাস গর্বের, এতিহ্যের। আমাদের আজকের যে অবস্থান নারী মুক্তি, শিক্ষায়, পেশায়, সম্মানে নারীরা পৌঁছেছে তার পেছনে নারীদের ভূমিকা কম নয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ