রাজনৈতিক দলবদল, স্নায়ুযুদ্ধে টলিউড তারকারা

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের মাঠে প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তের আগে টলিউড তারকাদের অনেকেই নতুন করে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে। কেউ কেউ আবার পুরানো দল ছেড়ে যোগ দিয়েছেন নতুন দলে। তারকাদের দলবদল আর রাজনীতির রঙ গায়ে মাখানো নিয়ে এই মুহূর্তে বেশ আলোচনা চলছে টলিপাড়ায়। আলোচনার রেশ অবশ্য ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও।
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে টলিউড তারকাদের রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। আদর্শিক জায়গা থেকে কেউ কেউ ভোটের প্রচারে অংশ নিয়েছেন কিন্তু রাজনীতিতে সক্রিয় হননি। মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর টলিউড তারকাদের রাজনীতিতে ঝুঁকতে দেখা যায়।

মুনমুন সেন থেকে শুরু করে রুপা গাঙ্গুলী, দেব, মিমি চক্রবর্তী, বাবুল সুপ্রিয়, নুসরাত জাহান সহ কয়েকজন নাম লিখিয়েছেন রাজনীতিতে। ২০২১ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে অনেকেই যোগ দিয়েছেন রাজনীতিতে। আবার কেউ করেছেন দলবদল। টলিউড অভিনেত্রী কৌশানী মুখার্জি, সায়নী ঘোষ, সায়ন্তিকা চ্যাটার্জি, পরিচালক রাজ চক্রবর্তী, অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিক নতুন করে যোগ দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসে। আর দেব, মিমি, নুসরাতের পাশাপাশি এবার সক্রিয় হয়েছেন সোহম।

ওদিকে এবার দলবদল করেছেন রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ, শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দিয়েছেন তারা। এছাড়া নতুন করে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন অভিনেত্রী পায়েল সরকার। তারকাদের জনপ্রিয়তা কাজে লাগানোর জন্যই রাজনৈতিক দলগুলো তাদেরকে দলে টানছেন বলে মনে করছেন পশ্চিমবঙ্গের অনেকে।

তারকাদের রাজনীতিতে আসা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডানলপের স্বর্ণাভ ভট্টাচার্য সময়নিউজকে বলেন, ‘আমার মনে হয় তারকাদের রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার খুব বেশি প্রয়োজনীয়তা নেই। কারণ দেশ চালানো ব্যাপারে তারা খুব বেশি বুঝবে বলে মনে হয় না।’ বেলঘড়িয়ার সম্রাট রায় একই প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে। গণতন্ত্র সেটাই বলে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ঠিকই আছে। কিন্তু ভেতরের খবর আসলে কী সেটা তো বোঝা যাচ্ছে না। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি আইপিএল খেলার মতো মনে হচ্ছে। এ দল ওকে নিচ্ছে, ও দল একে নিচ্ছে।’

তারকাদের মধ্যে ব্যাপক দলবদল হচ্ছে, বিষয়টি কোন চোখে দেখছেন? উত্তরে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পিনাকি ভট্টাচার্য বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আসার ঘটনা অচেনা নয়। গত প্রায় এক দশক থেকে তারা রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যোগদান করছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন আছেন যারা রাজনীতিতে সফল হয়েছেন। এখন যারা যোগদান করছেন, আমার মনে হয় তাদের অনেকেই টিকতে পারবেন না। এদের মধ্যে ৯৯ শতাংশকেই কয়েক বছর পর দেখা যাবে না। কারণ এরা এখনো অভিনয়ে সক্রিয়। এরা ক্যারিয়ারের দিকেই মনোযোগী হবেন। রাজনীতিতে বিশাল বদল এরা ঘটাতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না।’

তারকাদের দলবদলে টলিউডে বিভাজন তৈরি হবে কি না? জানতে চাইলে অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র সময়নিউজকে বলেন, ‘এক প্রকার বিভাজন তো আছেই। সেটা তলায় তলায়, উপরে সবাই বলবে আমরা বন্ধু, কিন্তু তা নয়। আমার মনে হয় হাতেগোনা কয়েকজন আছে, যারা এখনো ভাবছে আরেকটু দেখি। বামমনস্ক যারা আছেন তারা কাজের নিরাপত্তা না থাকায় কিছু বলছেন না বা কোনো দিকে যাচ্ছেন না। অনেকেই সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য দুই দলে বিভাজিত হয়েছেন। সেটার প্রতিফলন শতভাগ পড়বে। এবারে সেলিব্রেটিরা লাইন দিয়ে যোগ দিচ্ছে।’

মানুষ খুব বোকা উল্লেখ করে শ্রীলেখা আরও বলেন, ‘যারা বর্ষীয়ান, অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং যারা মাঠে নেমে কাজ করেন তাদের ভোট না দিয়ে মানুষ গ্ল্যামারের পেছনে ছুটছে। অভিনেত্রী বা নায়িকা এসে দাঁড়ালেই তারা ভোট দিচ্ছে, মানুষের বোঝার অভাব। সেলিব্রেটিদেরই বা দোষ দেবো কেন? সবাই যার যার সুবিধার কথা ভেবেই ছুটছে।’

এদিকে নির্বাচনের আগে টলিউড তারকাদের ব্যাপক হারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগদানের বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন না পশ্চিমবঙ্গের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক ড. দেবজ্যোতি চন্দ। সময়নিউজকে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি বিরক্ত। কারণ এর কোনো রাজনৈতিক গুরত্ব নেই। এরা পার্টটাইম রাজনীতিও করেন না। যারা আগে নির্বাচিত হয়েছেন অনেকেই সংসদে যান না, সংসদের প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নেন না। তাদের দায়িত্ব পালন করেন না। এরা শুধু একটি সুন্দর মুখ। আর এই মুখ দিয়ে দলগুলো একটি আসনে জেতার চেষ্টা করছে।’

এবারের নির্বাচনকে ‘সিরিয়াস নির্বাচন’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ভোটাররা এতে প্রভাবিত হবেন বলে আমার মনে হয় না। এতে আরো অনেক ইস্যু রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোগত উন্নত, নতুন প্রযুক্তি, শিল্পসহ অনেক ইস্যু রয়েছে। তাই নতুন সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু এই ধরনের নন-পলিটিক্যাল অ্যাক্টর, যারা নির্বাচনের আগে যোগদান করছেন তারা নির্বাচনের পরিবেশকে নষ্ট করে দিচ্ছেন। তাই আমি আবারও বলছি, টলিউড তারকাদের দলে দলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগদানকে আমি গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমি বিরক্ত বেশ।’

টলিপাড়ার বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করছেন, তারকাদের দলবদল এবং গায়ে রাজনৈতিক রঙ লাগানোর প্রভাব এরই মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিতে পড়েছে। হাসিমুখে একে অপরকে স্বাগত জানালেও স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে তারকাদের মধ্যে। যেখানে সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল সেখানে তার চিত্র পুরো উল্টো। তারকাদের উচিত বক্স অফিস নিয়ে যুদ্ধ করা, কিন্তু সেটি হয়ে যাচ্ছে ভোট যুদ্ধ। তারকাদের এ বিভাজন খুব বেশি সুখকর নয়। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে তারকাদের রাজনীতিতে আসার প্রয়োজন রয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ