ভাষা আন্দোলনে সিলেট:‘দশ জনী’ মিছিলের প্রস্তাবক ছিলেন সামাদ আজাদ

তিনি ছিলেন বাতিঘরের আওয়াজ

‘যে কবিতা শুনতে জানে না/সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে/ যে কবিতা শুনতে জানে না/সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে/যে কবিতা শুনতে জানে না/সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে’/কবিতা শোনার মানসিকতা যার নেই, তাকে সরাসরি ছুড়ে ফেলেছেন কবি। কবির এই সাহস নি:সন্দেহে অদম্য। খুব সহজ ভাষায়, গভীরের অনুভ‚তি যিনি প্রকাশ করে গেছেন, তিনি আর কেউ নন, তিনি কিংবদন্তি কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কালপুরুষ, একুশের প্রথম সংকলনে এলেখা ‘কোন এক মাকে’ নিয়ে কবিতার কবি, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তিনি লিখেছিলেন।

কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ একাধারে কবি, গীতিকার ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর দুটি দীর্ঘ কবিতা ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ এবং ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অভূতপূর্ব সংযোজন।

সুতারাং এই যখন প্রসঙ্গ তখন,একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আজও তরুণ প্রজন্মও মাঝে ভাষা আন্দোলেনর ইতিহাস ভেসে বেড়ায়। এবং সারাদেশের সাথে সিলেটর যে কয়েকজন কিংবন্তী সিলেটে ছিলেন তার মাঝে একজন আব্দুস সামাদ আজাদ।

আব্দুস সামাদ আজাদ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রামেও তাঁর অবদান নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ ১৯৪০ সালে মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের আঞ্চলিক শাখার সভাপতি হিসেবে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগে শ্রম সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ছিয়ানব্বইয়ের বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্র ও কৃষিমন্ত্রী ছাড়াও ১৯৯৬ সালে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং ১৯৭৩, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।

১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার প্রত্যন্ত অঞ্চল ভুরাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গণমানুষের এই নেতা। ছাত্র অবস্থায়ই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪০ সালে তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হন।

পরে অবিভক্ত আসামের মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি সিলেট এমসি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু সরকারবিরোধী রাজনীতির কারণে মাস্টার্স শেষ পর্বের পরীক্ষা তাঁকে দিতে দেওয়া হয়নি।

ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেটের কৃতী সন্তান আব্দুস সামাদ আজাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন।

সিলেটে এবং ঢাকায় আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঢাকায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্যও ছিলেন তিনি। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার দায়ে তিনি গ্রেপ্তার হন ও কারাবরণ করেন।

জানাযায়,আব্দুস সামাদ আজাদ ১৯৪৮ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে ঢাকায় চলে যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তখন তিনি ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনে যুক্ত হন। সে সময় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সোচ্চার ছিলেন। সভা, সমাবেশ মিছিলসহ সব কর্মসূচিতেই তাঁর উপস্থিতি আমরা লক্ষ করি।

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। আন্দোলন ঠেকাতে তৎকালীন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলেও ছাত্র জনতাকে নিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিছিলে তিনি সম্মুখ সারিতে ছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, রফিক, বরকত ও জব্বার। আহত হন অনেকে। সেদিনের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে গিয়ে অন্য অনেকের সঙ্গে আব্দুস সামাদ আজাদও গ্রেপ্তার হন।

(সূত্র: বদরুদ্দীন উমর, ‘ভাষা আন্দোলনে গাজীউল হক’ । দৈনিক সমকাল ১৯ জুন ২০০৯)

এখানে একটি বিষয় প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখযোগ্য যে, একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা যে মিছিলটি বের করেন তাতে আব্দুস সামাদ আজাদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।

সভায় কয়েকজন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরোধিতা করলেও আব্দুস সামাদ আজাদসহ অন্যরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেন। যখন সেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো তখন কীভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা যায় সেই দিক নির্দেশনাও তিনি দিয়েছিলেন।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ‘দশ জনের’ মিছিল এখন ইতিহাসের অংশ। এই ‘দশ জনী’ মিছিলের প্রস্তাবক ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ। (সূত্র: বদরুদ্দীন উমর, প্রাগুক্ত, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ২৬৯)

বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এই উদ্যোগের সাথেও আব্দুস সামাদ আজাদ সম্পৃক্ত ছিলেন।

দিবসটি পালনে সরকারের সঙ্গে সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে আব্দুস সামাদও প্রতিনিধি দলে ছিলেন। শহীদ দিবস পালনের প্রস্তুতি যখন শেষ পর্যায়ে ঠিক তখন (১৮ ফেব্রুয়ারি) সরকার ছাত্রনেতাদের সচিবালয়ে ডেকে পাঠায়।

সংগ্রাম পরিষদ থেকে আব্দুস সামাদ (আজাদ), মোহাম্মদ সুলতান (ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি), আখতার উদ্দিন, শামসুল হক, জিল্লুর রহমান (মুসলিম ছাত্র লীগ), ইব্রাহিম তাহা (ইসলামিক ব্রাদারহুড) ও গাজীউল হককে প্রতিনিধি করে পাঠানো হয়। সরকার পক্ষে ছিলেন, চিফ সেক্রেটারি মোহাম্মদ ইসহাক, আইজি দোহা এবং জিওসি মেজর জেনারেল আদম।

দুপক্ষে উত্তপ্ত আলোচনা হলেও সবশেষে সমঝোতা হয় যে, সরকার মিছিলে বাধা দেবে না এবং পুলিশও গাড়ি নিয়ে মিছিলের আগে পিছে থাকবে না। ছাত্ররাও আশ্বাস দেয় মিছিল শান্তিপূর্ণ হবে, কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসের কর্মসূচি যথাযথভাবে পালিত হয়।

(সূত্র : ড. মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ১৮৩০ থেকে ১৯৭১, পৃষ্ঠা ১৭৯) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আব্দুস সামাদ আজাদ অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকার গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মুজিবনগর সরকারে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত। এছাড়া তিনি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের সদস্যও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৭১ সালের ১৩-১৬ মে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব শান্তি সম্মেলন। এই সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে আব্দুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।

সম্মেলনে তিনি দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। সেদিন তিনি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট জানিয়ে দেন স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে হাজার বছর যুদ্ধ চালিয়ে যাবে বাংলাদেশের মানুষ। একই সাথে তিনি আন্তর্জাতিক সংহতি এবং জাতিসংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেন।

বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে আব্দুস সামাদ আজাদের দেওয়া এই বক্তব্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনুপম দলিল। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সপ্তমবারের মতো জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য আব্দুস সামাদ আজাদকে ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়।

গতবছর সিলেটের অনলাইন গণমাধ্যম ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে সিলেট সাত ভাষা সৈনিকদেও সম্মাননা দেয়া হয়। এর মধ্যে ছিলেন,  ও রাজনীতির কিংবদন্তী জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ কে নিয়ে।

তবে বলা প্রয়োজন, ভাষাসৈনিক সম্মাননা ২০২০ স্মারকগ্রন্থ ‘শব্দগান রক্তমিতা’য় প্রকাশিত গন্থ থেকে জানাযায়, আব্দুস সামাদ আজাদ একটি নাম,নয় একটি ইতিহাস।একটি প্রতিষ্ঠান বললে ভুল হবে না। তিনি ছিলেন এক কালের রাজনীতির বাতিঘর।

ব্রিটিশ আমলে তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি। পাকিস্তান আমলে তুখোড় রাজনীতিবিদ। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে ছিলেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

তিন পতাকার বাসিন্দা এই মানুষটি তাঁর মেধা ও প্রজ্ঞায় এক সময় ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল পেরিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতির এক মহীরুহে পরিণত হন। আব্দুস সামাদ আজাদ নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই চোখের সামনে ভেসে উঠে এক অনন্ত জীবনের অধিকারী জননেতার প্রতিকৃতি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ