কে জানত এটাই হবে নন্দন-কাননে হুমায়ূন আহমেদের শেষ রাত!

সকালে ঘুম থেকে উঠে বাইরে এলাম। হুমায়ূন আহমেদ ‘বৃষ্টিবিলাস’-এর সামনের কাঁঠালতলায় দাঁড়িয়ে কী যেন করছেন। এগিয়ে গিয়ে দেখি গতকাল ঢাকা থেকে নিয়ে আসা গাছগুলোকে আলাদা করছেন এবং কোথায় কোন গাছ লাগানো হবে বুলবুলকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। বুলবুল নুহাশপল্লীর ম্যানেজার। দীর্ঘদিন ধরে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আছেন।

গতকাল সকালে ফার্মগেট খামারবাড়ি নার্সারি থেকে তিনি গাছগুলো সংগ্রহ করেন। তার আগে আমাকে ডেকে বলেন তাঁর সঙ্গে নার্সারিতে যেতে। জানান সন্ধ্যায় নুহাশপল্লীতে যাওয়ার কথা। এটাও জানান, নুহাশে যাওয়ার সময় কিছু গাছ নিয়ে যেতে চান। বাধ সাধলেন স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। তিনি বললেন, ৩ জুন নিউইয়র্কে ফিরে যেতে হবে। ১২ জুন তোমার অনেক বড় একটা সার্জারি হবে। বারোটা কেমো নেওয়ায় তোমার শরীরের ইম্যুউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে গেছে। এর মধ্যে নার্সারিতে যাওয়া ঠিক হবে না।

হুমায়ূন আহমেদ কোনো যুক্তি শুনতে নারাজ। তিনি রাগত স্বরে বললেন, সেদিন পাখির হাটে যেতে চেয়েছিলাম, তুমি যেতে দাও নি। তোমার যুক্তি আমি মেনেছিলাম, কিন্তু আজ আমি নার্সারিতে যাবই।

শাওন ভাবি এ বিষয়ে আর কোনো কথা বললেন না।

আমরা খামারবাড়ি নার্সারির উদ্দেশে রওনা হলাম। সঙ্গে আছে বুলবুল। ঘণ্টাখানিক ঘোরাঘুরি করে পছন্দমতো বেশ কয়েকটি গাছ কিনলেন হুমায়ূন আহমেদ। মাইক্রোবাসের পেছনে সেগুলো উঠানো হলো।

আমরা দখিন হাওয়ায় ফিরে এলে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, এখন আর অফিসে গিয়ে কী করবে ? দুপুরে খেয়ে যাও। একসঙ্গে খাবার খেয়ে আমি অফিসে চলে এলাম। ঠিক হলো, বিকেল পাঁচটায় তিনি মা, স্ত্রী ও দুই পুত্রকে নিয়ে নুহাশপল্লী যাবেন। শিখু আপাও (হুমায়ূন আহমেদের বোন) যাবেন তাঁদের সঙ্গে। আমি আর কমল যাব সন্ধ্যার পরে।

রাত দশটায় আমি ও কমল নুহাশপল্লী পৌঁছলাম। মাঝে দুইবার বুলবুল ফোনে জানতে চেয়েছে আমাদের অবস্থান। নুহাশে পৌঁছে বুঝতে পারলাম বুলবুল কেন বারবার ফোনে খবর নিচ্ছিল। হুমায়ূন আহমেদ রাতের খাবার না খেয়ে বসে আছেন। আমরা পৌঁছালে একসঙ্গে খাবেন। খাওয়া শেষ করে জাপানি বটগাছতলায় কিছুক্ষণ গল্প করে যার যার রুমে ঘুমাতে গেলাম।

সকালে কাঁঠালতলায় হুমায়ূন আহমেদকে দেখে এইসব ভাবছিলাম। …এগারটায় অমিয়-অন্বয়কে নিয়ে স্বর্ণা চলে এল। ওদের সঙ্গে ঝর্ণা ভাবিও (আলমগীর রহমানের স্ত্রী) এসেছেন। সকাল এগারোটার পর ঢাকা থেকে বন্ধু ও প্রিয়জনরা আসতে শুরু করলেন। দুপুর সাড়ে বারোটায় আলমগীর রহমান ও শাকুর এলেন এক গাড়িতে। আজ কোনো সাংবাদিক বা টেলিভিশনের ক্যামেরা নেই। তাঁদের আগামীকাল আসতে বলা হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ সব সময় মিডিয়া এড়িয়ে চলেন। কর্কট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় পর কোনোভাবেই মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হন নি তিনি। ১৪ সেপ্টেম্বর আমরা চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্ক রওনা হব। সন্ধ্যার পর থেকে ক্রমাগত সাংবাদিকদের ফোন। তারা যে-কোনোভাবেই হোক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কথা বলতে চান। তিনি রাজি হন নি। শেষে তারা চাইলেন হুমায়ূন আহমেদের চলে যাওয়ার দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করতে। প্রত্যেকে আমাকে ফোন করে অনুরোধ করছেন আমি যেন ব্যবস্থা করে দেই। তিনি তাতেও রাজি হন নি। আমি সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি তাঁর মানসিক অবস্থার কথা। তারপরও প্রতিটা চ্যানেলের ক্যামেরা বিমানবন্দরে উপস্থিত। আমার কাছে জানতে চাচ্ছেন, হুমায়ূন আহমেদ কত নম্বর গেট দিয়ে ঢুকবেন ? শুধু মিডিয়াকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য তিনি ভিআইপি গেট দিয়ে প্রবেশ করেন। সাধারণত তিনি ভিআইপি গেট ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন না। সেই হুমায়ূন আহমেদ আজ আমাকে বলেছেন মিডিয়ার যারা কথা বলতে চায় সবাইকে কাল আসতে বলো। আমি তাঁর এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছি।

দুপুর থেকেই আকাশে মেঘের আনাগোনা। মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন কানে আসছে। চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে ফিরে যাওয়ার আগে আজকের এই একটি রাতই বৃষ্টিপাগল হুমায়ূন আহমেদ এখানে থাকবেন। বিধাতা নিশ্চয়ই তাঁকে বিমুখ করবেন না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বৃষ্টির দেখা নেই। মেঘেরা আরও জমাট বাঁধছে। সন্ধ্যার আগে আগে হুমায়ূন আহমেদ এসে বসলেন আমাদের মাঝে। এক কাপ চা খেয়ে ঘুরতে বের হলেন তাঁর সবুজ উদ্যানে। একা একা হাঁটছেন, কখনো কখনো কোনো গাছের সামনে দাঁড়াচ্ছেন। নুহাশপল্লীর অধিকাংশ গাছ তাঁর নিজের হাতে লাগানো। মনে হচ্ছে ওদের সঙ্গে কথা বলছেন। নিউইয়র্কে ফিরে যাওয়ার আগে সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন।

সন্ধ্যার পর আমরা সবাই হুমায়ূন আহমেদের রুমে এসে বসলাম। শুরু হলো আড্ডা। নানা ধরনের গল্প, রসিকতা হচ্ছে। আকাশে মেঘের গর্জন। যে-কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। আলমগীর রহমান ঢাকা ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেজ তাগাদা দিচ্ছেন গাড়িতে ওঠার জন্য। হুমায়ূন আহমেদ চাচ্ছেন আরও কিছুটা সময় সবাই থাকুক। আমি ইশারায় শাকুরকে রাতে থেকে যেতে বললাম। তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেছেন, কী করবেন বুঝতে পারছেন না। মেঘের গর্জন বেড়েই চলেছে। শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি।

হুমায়ূন আহমেদ বসেছেন রুমের বারান্দার লাগোয়া দরোজার সামনে। দরোজাটা খুলে দিলেন তিনি। এখান থেকে নুহাশপল্লীর মাঠের অনেকটা অংশ দেখা যায়। বিশাল মাঠের মধ্যে বসানো বিদ্যুতের খুঁটিতে মৃদু আলো। বৃষ্টিধোয়া সবুজ মাঠ আর গাছপালায় সেই মৃদু আলো রাত্রির আঁধার ভেদ করে এক অপূর্ব নিসর্গ রচনা করেছে। হুমায়ূন আহমেদ মুগ্ধ হয়ে তা উপভোগ করছেন। আহারে, কী অপূর্ব সেই দৃশ্য!

শাকুর সিদ্ধান্ত পাল্টালেন। পরিবেশটা তাঁকেও ছুঁয়ে গেছে।

বৃষ্টি কিছুটা ধরে এলে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, চলো বাইরে গিয়ে বসি। খালি পায়ে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানিতে আধাভেজা হয়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন তিনি। আমরাও তাঁকে অনুসরণ করলাম। তিনি বসলেন তাঁর প্রিয় লিচুতলায় (যেখানে পরবর্তী সময়ে সাদা শ্বেতপাথরে তাঁর নিজের লেখা এপিটাফ লাগানো হয়েছে)। টিপ টিপ বৃষ্টি ও কর্দমাক্ত মাঠের কারণে মেয়েরা কেউ আসে নি। একপর্যায়ে হুমায়ূন আহমেদ কমলকে পাঠালেন মেয়েদের ডেকে আনতে। শুরু হলো আড্ডার আরেক পর্ব। এক ঘণ্টার বেশি সময় তা চলল।

হুমায়ূন আহমেদ এবার সবাইকে নিয়ে পুকুরপাড়ে রওনা হলেন। বৃষ্টিতে ভিজে মাঠ কাদা কাদা হয়ে গেছে। সাবধানে পা ফেলে পুকুরপাড়ে পৌঁছলাম। কিছুদিন আগে সেখানে একটি কটেজ বানানো হয়েছে। এরকম চারটি কটেজ পুকুরের পূর্ব পাড় ঘেঁষে তৈরি করা হবে। প্রতিটি কটেজে দুটি করে রুম এবং একটি চমৎকার বারান্দা। বারান্দাটার একটি অংশ পুকুরের মধ্যে চলে এসেছে। হুমায়ূন আহমেদ কটেজের নাম দিয়েছেন ‘ভূতবিলাস’। তাঁর পোষা ভূতরা এই পুকুরের আশপাশেই বেশির ভাগ সময় থাকে।

বিভিন্ন সময় নুহাশপল্লীতে আসা অতিথিদের পুকুরের পাড়ে এনে ভূত দেখানো হতো। ঘোর অমাবশ্যায় হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অতিথিদের নিয়ে পুকুরপাড়ে এসে দাঁড়াতেন। কিছুক্ষণের জন্য দেখা যেত পুকুরের ওপারে সাদা ধবধবে শাড়িপরা কেউ হেঁটে যাচ্ছে। নুহাশপল্লীর স্টাফদের কেউ একজন চিৎকার করে উঠত, স্যার দেখেন কে যেন হেঁটে যাচ্ছে। তারপর চিৎকার করে ডাকা হতো, কে ? কে ? মুহূর্তের মধ্যে সাদা শাড়িপরা মূর্তিটি অন্ধকারে মিলিয়ে যেত।

অতিথিদের কেউ কেউ বলতেন, এ তো দেখছি সত্যিকারের ভূত! ভাই তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলেন। এর মধ্যে পুকুরের পানিতে ক্রমাগত ইট-পাটকেল পড়ছে। হুমায়ূন আহমেদ বলতেন, ভাই চলেন, এখানে আসলেই থাকা ঠিক না। স্টাফদের কেউ কেউ ঘটনাটাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য জোরে চিৎকার করে বলত, কে ঢিল ছুড়ছে ? কে, কে, কে ? টর্চের আলো ফেলছে পুকুরে এবং এদিক-সেদিক। আর এর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ ভূতের ভয় দেখানোর মুগ্ধতা নিয়ে হেঁটে যেতেন সবার সঙ্গে।

অন্ধকারে সেই মুগ্ধতা আমি ছাড়া কেউ টের পাচ্ছে না। কারণ পুরো সাজানো নাটকের স্ক্রিপ্ট হুমায়ূন আহমেদের আর পরিচালক মাজহারুল ইসলাম। কলাকুশলী আগেই ঠিক করা থাকত। কে অন্ধকারে সাদা কাপড় পেঁচিয়ে হেঁটে যাবে, কখন অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে—সব ঠিক করা থাকত। মোবাইলে একটা মিসকল মানে অন্ধকার থেকে হেঁটে বেরিয়ে আসবে। দুটি মিসকল দিলে সে দ্রুত হাঁটতে থাকবে এবং তিন নম্বর মিসকলে আস্তে আস্তে অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে। আর পুকুরে ঢিল ছোড়ার জন্য আলাদা বাহিনী অন্ধকারে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকত। সংকেত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নাটক শুরু হয়ে যেত।

শুধু পুকুরের পাড় নয়। ঘন অন্ধকারে আমবাগান, সুইমিং পুলের উত্তর পাড়, এগুলো ছিল ভূতের আনাগোনার জায়গা। ভূত দেখে কারও কারও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নুহাশপল্লীতে দ্বিতীয়বার রাত্রিযাপন করবেন না বলে শপথও নিয়েছেন কেউ কেউ। আর এসব কারণেই পুকুরপাড়ের নির্মাণাধীন নতুন কটেজের নামকরণ করেছেন তিনি ‘ভূতবিলাস’।

আমরা ভূতবিলাসের বারান্দায় এসে বসলাম। রুমগুলোর সাজসজ্জা এখনো পূর্ণতা পায় নি। চিকিৎসা শেষে নিউইয়র্ক থেকে ফিরে এসে হুমায়ূন তাঁর বন্ধুদের নিয়ে প্রথম রাত্রিযাপন করবেন এখানে।

শুরু হলো ভূতবিলাসের বারান্দায় বসে আড্ডা। আলমগীর রহমান কাউকে না বলে একাই ফিরে গেলেন ঢাকায়। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় গরমের তীব্রতা নেই। আকাশে জোছনা নেই। তবুও চারদিকটা যেন উজ্জ্বল হয়ে আছে। হুমায়ূন আহমেদ স্ত্রীকে অনুরোধ করলেন তাঁর লেখা একটি গান গেয়ে শোনাতে। শাওন ভাবি গান শুরু করলেন খালি গলায়। প্রথমেই গাইলেন—

যদি মন কাঁদে/ তুমি চলে এসো এক বরষায়/ এসো ঝরঝর বৃষ্টিতে/ঝড়ো হাওয়া দৃষ্টিতে/ এসো কোমল-শ্যামল ছায়…

সবাই মনোযোগ দিয়ে গান শুনছেন। একটার পর একটা অনুরোধ। গান হচ্ছে। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিপোকার শব্দ। দূরে কোথাও জোনাকির আলো জ্বলছে। বেশ ক’টি গানের পর হমায়ূন আহমেদ অনুরোধ করলেন তাঁর প্রিয় ‘মৃত্যুসংগীত’ গাইতে। শাওন ভাবি কিছুতেই এই গান গাইবেন না। আনন্দময় এই রাত্রিটাকে বিষণ্ন করে তুলতে চান না তিনি। তবুও তাকে গাইতে হলো—

মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে, জাদুধন,/ মরিলে কান্দিস না আমার দায়/সূরা ইয়াসিন পাঠ করিও বসিয়া কাছায়/ আমার প্রাণ যাওয়ার বেলায়/ বিদায়কালে পড়ি না যেন শয়তানের ধোঁকায়/ রে জাদুধন…

বিষণ্ন সুর একটা তীব্র হাহাকার তুলে ভেসে গেল দূর বহু দূরে, শাল-গজারির গহিন অরণ্যে। রাত্রির গভীর নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে আকাশ আর গাছেরা তাদের ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুতে সিক্ত করে চলেছে ধরণীর বুক। আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। আমরা গেস্ট হাউজে ফিরে আসছি। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। বিষণ্নতা এসে ভর করেছে। কে জানত এটাই হবে নিজের তৈরি নন্দন-কাননে হুমায়ূন আহমেদের শেষ রাত!

লেখক: মাজহারুল ইসলাম, প্রধান নির্বাহী, অন্যপ্রকাশ এবং সম্পাদক, পাক্ষিক অন্যদিন।

এ বিভাগের আরো সংবাদ