বহুমুখী অনুসন্ধানের জালে পাপুল

অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার বাংলাদেশের সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী শহীদ ইসলাম ওরফে পাপুলের বিষয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বহুমুখী অনুসন্ধান চলছে। কুয়েতের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশের সিআইডি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এ অনুসন্ধান করছে।

এর বাইরে আরও অন্তত দুটি গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে। এসব তদন্তে পাপুলের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। এ অবস্থায় পাপুলের সংসদ সদস্য স্ত্রী, মেয়ে এবং শ্যালিকা দেশ ত্যাগের চেষ্টা করছেন বলে জানতে পারে দুদক।

এজন্য দুদক সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম ওরফে পাপুল, তার স্ত্রী ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলাম, তাদের মেয়ে এবং সেলিনা ইসলামের বোনের বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বুধবার এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

এদিকে, কাজী শহীদ ইসলামকে ৮ দিন জিজ্ঞাসাবাদের পর জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে কুয়েতের কর্তৃপক্ষ। কুয়েতের কূটনীতিক ও ব্যবসায়িক সূত্রগুলোর জানায়, পাবলিক প্রসিকিউশন মঙ্গলবার সংসদ সদস্য কাজী শহীদকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

কুয়েতের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে দেশটির বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্যকে ঘুষ দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। এছাড়া ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে বিপুল অর্থ যে কাজী শহীদ পাচার করেছেন, তার প্রমাণ পেয়েছেন কুয়েতের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরেফ আবাসিক এলাকা থেকে মানব পাচার ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের অভিযোগে দেশটির সিআইডি এমপি পাপুলকে গ্রেফতার করে। তাকে গ্রেফতারের পর তদন্ত চলার মধ্যে এটিকে ‘সবচেয়ে বড়’ মানব পাচারের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন কুয়েতের উপ-প্রধানমন্ত্রী আনাস আল-সালেহ।

আটকের পরদিন তার জামিন আবেদন নাকচ করে আদালত সিআইডির রিমান্ডে পাঠায়। লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ১১ জন মানব পাচার ও ভিসা নবায়নের জন্য বাড়তি টাকা আদায়ের সাক্ষ্য দেয় বলে জানায় কুয়েতের গণমাধ্যম।

বৃহস্পতিবার সিআইডির কর্মকর্তারা বাংলাদেশি এ সংসদ সদস্যকে নিয়ে মুশরেফ এলাকায় তার বাসার কার পার্কিংয়ে যান। সেখানে তার একটি গাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় কয়েকটি চেক বই। ওই চেক বইগুলো থেকে তিন মাসে কুয়েতের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও কানাডায় বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

কুয়েতে সংসদ সদস্য আটকের বিষয়টি বাংলাদেশেও বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ফলে ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে বাংলাদেশের সিআইডি। সিআইডি সূত্র জানায়, তাদের হাতে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হওয়া মানব পাচারকারীদের কাছ থেকেও নেয়া হচ্ছে তথ্য।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে সিআইডি। এ ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে মানব পাচার ও অর্থ পাচার আইনে মামলাও হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রসিডিউর অনুসরণ করে যা যা করার আমরা করছি।’

এদিকে পাপুলের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে পাপুল, তার স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকাকে দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দুদক।

যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করে সংস্থাটির পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, চিঠিতে বিদেশে অবস্থান করায় তার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। আর দেশে এসে থাকলে যেন বিদেশ যেতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর পাঠানো চিঠিতে বুধবার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার এ অনুরোধ জানিয়েছে দুদক। নিষেধাজ্ঞা পাওয়া অন্যরা হলেন- পাপুলের স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও সেলিনার বোন জেসমিন প্রধান।

চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ মানি লল্ডারিং করে বিদেশে পাচার এবং শত শত কোটি টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত একটি অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। দুদকের কাছে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যাওয়ার তথ্য থাকায় এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এর আগে ৯ জুন অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. সালাহউদ্দিনের পাঠানো চিঠিতে পাপুল, তার স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, টিআইএন নম্বর, আয়কর রিটার্নসহ ব্যক্তিগত সব নথিপত্র তলব করা হয়েছিল। এরই মধ্যে কিছু নথিপত্র দুদকে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। তবে সব নথিপত্র এখনও পাওয়া যায়নি। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এর বাইরে কুয়েতে আটক হওয়া বাংলাদেশি এমপি কাজী শহীদ ইসলাম ওরফে পাপুলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটি থেকে রোববার এ সংক্রান্ত চিঠি দেশের সব ব্যাংকে পাঠানো হয়। চিঠিতে জরুরি ভিত্তিতে এ তথ্য দিতে বলা হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, পাপুলের ব্যাংক হিসাবের বর্তমান এবং পেছনে লেনদেন হয়ে থাকলে জানাতে হবে। যেসব তথ্য জানাতে হবে এরমধ্যে রয়েছে- খোলা থেকে শুরু কেওয়াইসি (গ্রাহক পরিচিতি) ফর্ম, লেনদেনের প্রোফাইল এবং লেনদেনের সর্বশেষ তথ্য।

এ বিষয়ে বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মো. রাজী হাসান বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারের কোনো সংস্থা তথ্য চাইলে আমরা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে খোঁজ নিই। এছাড়াও সংবাদপত্রে কারও ব্যাপারে সংবাদ ছাপা হলেও আমরা অ্যাকাউন্টের খোঁজ নিই।

এ বিভাগের আরো সংবাদ