লকডাউন ও জোন ভাগ নিয়ে সিলেটে সমন্বয়হীনতা, চরম বিভ্রান্তি

করোনা শনাক্তের সংখ্যা বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন এলাকাকে রেড, ইয়োলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ১৫ জুন রেড ও ইয়োলো জোনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে সিলেটে এখন পর্যন্ত কোন এলাকা কোন জোনে পড়েছে তা চিহ্নিত করতে পারেন নি সংশ্লিষ্টরা। এনিয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ থেকে একেক সময় একেক তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

একই অবস্থা সিলেটকে লকডাউন করা নিয়ে। মঙ্গলবার সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো বৃহস্পতিবার থেকে রেড জোন চিহ্নিত হওয়া এলাকাকে লকডাউন করা হতে পারে। তবে মঙ্গলবার রাতে সিটি করপোরেশনে এক বৈঠকে শনিবার থেকে সিলেট নগরীতে লকডাউন কার্যকরের প্রস্তাব দেন মেয়রসহ কাউন্সিলররা। অপরদিকে, বুধবার সিলেটে করোনা মোকাবেলায় মাল্টিসেক্টরাল কমিটির বৈঠকে এখনই লকডাউন না করার সিদ্ধান্ত হয়।

লকডাউন ও পৃথক জোনে ভাগ করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই সমন্বয়হীনতায় জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েকদিন থেকেই নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে অনেকেই সিলেটটুডে কার্যালয়ে ফোন করে কবে থেকে লকডাউন শুরু হবে এবং কোন এলাকা কোন জোনে পড়েছে এ ব্যাপারে জানতে চাইছেন। সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না পাওয়ায় জনগণের মধ্যে অনেক গুজব এবং ভুল তথ্যও ছড়িয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় বুধবার দুপুরে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও করোনা মোকাবেলায় জেলা মাল্টিসেক্টরাল কমিটির সভাপতি কাজী এম. এমদাদুল ইসলাম গণমাধ্যমে বলেছেন, সিলেটে জোনভিত্তিক লকডাউনের জন্য এখনও কোন নির্দেশনা আসেনি। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, কিছু কিছু ফেসবুক পেজ ও আইডি থেকে কখনও বৃহস্পতিবার কখনও শনিবার থেকে সিলেটে জোনভিত্তিক কঠোর লকডাউন কার্যকর করা হবে বলে প্রচার করা হচ্ছে। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে সংক্রমণের মাত্রা বিবেচনায় রেড, গ্রিন, এবং ইয়েলো জোন নির্ধারণ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী সিভিল সার্জনের কার্যালয় এবং সিটি করপোরেশন জোন নির্ধারণ করে তালিকা জমা দিয়েছেন। এই জোনগুলোর কোথায় কি ব্যবস্থা নেয়া হবে, সে ব্যাপারে এখনও সরকারের কোন নির্দেশনা আসেনি। ফলে বৃহস্পতিবার কিংবা শনিবার থেকে জোনভিত্তিক কড়া লকডাউন জারি করার খবর অসত্য এবং ভিত্তিহীন।

গত ১৪ জুন নগরীর ১৯ টি ওয়ার্ডকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে এসব এলাকা লকডাউন করার একটি প্রস্তাবনা সিলেট সিটি করপোরেশন থেকে সিলেটের সিভিল সার্জন কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়।

এরপর গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) এ বিষয়ে সিলেট সার্কিট হাউসে বৈঠকে বসে করোনা মোকাবেলায় গঠিত জেলা মাল্টিসেক্টরাল কমিটি। সিলেটের জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভা শেষে কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল বলেছিলেন, আমরা রেডজোন চিহ্নিত হওয়া এলাকাকে লকডাউন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে মানুষজনকে একদিনের সময় দিতে চাই। তাই বৃহস্পতিবার থেকে এটি কার্যকর হবে।

তিনি বলেছিলেন, নগরীর ভেতরে যেহেতু রোগী বেশি তাই নগরীর বেশিরভাগ এলাকায়ই রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত করে লকডাউন করা হবে। আর উপজেলার যেসব ইউনিয়নে সংক্রমণ বেশি সেসব ইউনিয়নকে লকডাউন করা হবে। তবে অনেক ইউনিয়নে দেখা গেছে, রোগী কেবল একটি এলাকায় বেশি। ইউনিয়নের অন্যান্য জায়গায় তেমন রোগী নেই। ফলে পুরো ইউনিয়ন লকডাউন না করে নির্দিষ্ট ওই এলাকাটি লকডাউনের ব্যাপারেও আমরা চিন্তা করছি। আজকালের মধ্যে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।

মঙ্গলবার আলাপকালে পুরো তথ্য না জেনে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন সিভিল সার্জন।

এরপর মঙ্গলবার রাতে লকডাউন ইস্যুতে বৈঠক বসে সিলেট সিটি করপোরেশন। ওই বৈঠকে বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে শনিবার থেকে নগরীতে লকডাউন কার্যকরের ব্যাপারে প্রশাসনে প্রস্তাব প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয়।

তবে বুধবার (১৭ জুন) সকালে সিলেট সার্কিট হাউসে ফের বৈঠকে বসে করোনা মোকাবেলায় গঠিত জেলা মাল্টিসেক্টরাল কমিটি। ওই বৈঠকে এখনই লকডাউন কার্যকর না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়।

বৈঠক শেষে সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল বলেন, আপাতত সিলেটকে লকডাউন করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে সিলেট জেলার মাল্টিসেক্টরাল কমিটির পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। নাগরিক সুবিধা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বুধবার বিকেলে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আসলাম উদ্দিন বলেন, সিভিল সার্জন থেকে জোন ভিত্তিক যে তালিকা করা হয়েছিল তা বুধবারের জেলা মাল্টিসেক্টরাল কমিটির বৈঠকে গ্রহণ করা হয়নি। ওই তালিকায় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। এজন্য আক্রান্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এই তালিকার উপর ভিত্তি করে রেড, ইয়োলো ও গ্রিন জোন করা হবে। পরে তা কেন্দ্রীয় কারিগরি কমিটিতে পাঠানো হবে। তারা এটা পর্যালোচনা করে মতামত দিবে।

তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় কারিগরি কমিটির মতামত নিয়ে জেলা মাল্টিসেক্টরাল কমিটি আবার বৈঠক করবে। ওই বৈঠকে জোন ভিত্তিক ম্যাপ তৈরি করা হবে। কারণ ম্যাপ না হলে সেনাবাহিনী, পুলিশ বা অন্যকেউ কাজ করতে পারবে না। সেই ম্যাপ নিয়ে সিভিল সার্জন ঘোষণা দিবেন কোন কোন এলাকা লকডাউন হবে।

আসলাম উদ্দিন বলেন, কাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে আমরা আশা করছি সকল প্রক্রিয়া শেষ হবে। এরপরই লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং কার্যকর হবে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ