ডা. রাকিব হত্যা: আমাদের চাওয়াটা আগে নির্ধারণ হোক

আমরা কী চাই— সর্বাগ্রে সেই লক্ষ্যটি স্থির করুন। আমরা কি শুধু ডা. রাকিব হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামির গ্রেপ্তারেই সন্তুষ্ট থাকবো, নাকি দ্রুত বিচারের মাধ্যমে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চাইবো? অন্যসময় হলে আসামিকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যাওয়ার যে দাবি আমরা করি সঙ্গত কারণে আজ সেই দাবি করলাম না। সেই দাবি করলে তথাকথিত মানবতাবাদীদের অত্যাচারে দেশে টেকাই দুরূহ হয়ে পড়বে!

তাই আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে আমরা চাই অতিসত্বর চার্জশিট প্রদানপূর্বক দ্রুত বিচারের মাধ্যমে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। যেহেতু এই পৈশাচিক ঘটনার ভিডিওফুটেজ আছে সেহেতু দ্রুত চার্জশিট দিতে বা দ্রুত বিচার পেতে তা সহায়ক হবে বলে মনে করি। তবে আমাদের এযাবতকালের যে অভিজ্ঞতা তা মোটেও ইতিবাচক বা সুখকর নয়।

আমরা দেখেছি আজ পর্যন্ত এই দেশে চিকিৎসক নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনার কোনটারই বিচার আমরা পাইনি। দু’একটি ঘটনায় অনলাইনে বা অফলাইনে আমাদের দুর্বল আকৃতির প্রতিবাদের কারণে দু’একজন আসামি গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তীতে আইনের ফাঁক গলে তারা বেরিয়ে গেছে! আমরাও আর সেইসব ঘটনার কোন ফলোআপ রাখিনি!

আমার মনে আছে, আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের ডা. মুরাদকে তার কর্মস্থলে হত্যা করে পাশের পানাপুকুরে ফেলে আত্মহত্যা বা ড্রোওনিং হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিলো! প্রথম কয়েকদিন আমরা খুব প্রতিবাদ, মানববন্ধন, কালোব্যাজ ধারণ সব করেছিলাম। তারপর আর কোন ফলোআপ রাখা হয়নি। মুরাদের পরিবারও কোন বিচার পাইনি! জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড!

এবারও তাই ই হবে যদি আমরা মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করতে না পারি! যদি আমরা মনে করি যে, আসামির গ্রেপ্তারই যথেষ্ট তাহলে এখানেই আমাদের থেমে যাওয়া উচিৎ কিংবা খুলনা বিএমএ যে কর্মসূচি দিয়েছে তাতেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ!

আর যদি আমরা মনে করি যে, গ্রেপ্তারকৃত আসামি আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে না যাক বরং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তার সর্বোচ্চ শাস্তি (ফাঁসি বা যাবজ্জীবন) নিশ্চিত হোক এবং মামলা নিতে টালবাহানা করায় সংশ্লিষ্ট ওসিরও ডিপার্টমেন্টাল পানিশমেন্ট হোক তাহলে আমাদের ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। এক সপ্তাহ না, তিন দিন না, দু’দিন না, এক দিনও না মাত্র ১২ ঘন্টা, মাত্র ১২টা ঘণ্টা সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সারাদেশের সকল সরকারি-বেসরকারি কভিড-ননকভিড আউটডোর ইনডোর চেম্বার ইমারজেন্সি সবরকম মানে এ্যাবসোল্যুটলি সবরকম সেবা বন্ধ রাখা হোক। রাষ্ট্র বুঝুক দেশের প্রায় দশকোটি প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটারের বিপরীতে মাত্র একলাখ চিকিৎসকের ভোটের কোন মূল্য না থাকলেও তাদের জীবনের মূল্য আছে!

বস্তুত আজ পর্যন্ত যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন কোন সরকারই চিকিৎসকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিকে পাত্তাই দেয়নি! ভোটার হিসেবে তারা হয়তো আমাদের সংখ্যাকে একেবারেই নগণ্য মনে করে তাই আমাদের দাবি মেনে নিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভোট হারাতে চায় না তারা! অথবা আমাদের পেশাজীবী নেতারা এইসব জাতীয় দলের নেতাদের কাছে পেশার মানমর্যাদা খুইয়ে নিজেদেরকে এমনভাবে বিকিয়ে দিয়েছে যে তারা আমাদের কোন দাবি দাওয়াকে গোনাই ধরার প্রয়োজনই মনে করে না!

নিয়তির নির্মম পরিহাস, যে দেশে শিকড় থেকে শিখর পর্যন্ত চরম মাত্রায় চিকিৎসক বিদ্বেষ, যে দেশে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে চিকিৎসকদের আত্মত্যাগকে কোনরকম স্বীকৃতি না দিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে উল্টো আরও উষ্মা প্রকাশ করা হয় সেই দেশের জনগণ পুনঃপুনভাবে কর্মস্থলে চিকিৎসকদের এমন হত্যা নির্যাতন করবে এটাই তো স্বাভাবিক!

এইসব হত্যা নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে ন্যূনতম একটা প্রবল আকারের ঝাঁকুনি বা ওয়েভ তুলতেই হবে। এবং সেই ঝাঁকুনি বা ওয়েভ তুলতে গেলে এমন অলআউট নন-কো-অপারেশনের কোন বিকল্প নেই!

যদি এইরকম অলআউট নন-কো-অপারেশন করতে পারেন শুধুমাত্র তাহলেই রাষ্ট্র বুঝবে যে, এই পেশাজীবীদেরও গুনতে হবে এবং তখনই হয়তো রাষ্ট্র কনভিন্স হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে। আর রাষ্ট্র যদি কনভিন্স হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের নির্দেশনা দেয় তাহলেই কেবল আমরা ডা. রাকিব হত্যার দ্রুত বিচার পাবো।

আর আমরা যদি কোন জাতীয় নেতার আশ্বাস পেয়ে বা কোন মন্ত্রী খসে যাওয়ার দরদে বা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কায় আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ি তাহলে বছরের পর বছর চলে যাবে, ডা. মুরাদের মতো ডা. রাকিবের বিচারও লালফিতার দৌড়ে হারিয়ে যাবে! এর মাঝে আরও শত শত মুরাদ বা রাকিব এইভাবে অঘোরে মরতেই থাকবে! জানিনা সত্যিকারের বিচার পেলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে কি-না তবে ডা. রাকিবের বিদেহী আত্মা নিশ্চয় শান্তি পাবে।

তাই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করার আগে আমরা যেন ডা. রাকিবের পরিবারের পুরো পৃথিবীটাই ক্ষয়ে যাওয়ার চিন্তা করি। যদি এইভাবে চিন্তা না করতে পারি তাহলে মনে রাখবেন আগামীকাল আপনার বা আমার পরিবারের পুরো পৃথিবীটাই ক্ষয়ে যাবে!

এ বিভাগের আরো সংবাদ