স্মরণ : বদর উদ্দিন আহমদ কামরান

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এক তারকার নাম। অনেকেই তাঁকে সিলেটের কামরান, সিলেটের রাজনীতির অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র বলেছেন, বলছেন এবং হয়ত আগামীতেও বলবেন। বিষয়টি ঠিক নয়। সিলেটের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের আঞ্চলিক মানদণ্ড যেভাবে নেই, সেটা পুরো দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একইভাবে সিলেটের বা অন্য কোনও জায়গার রাজনীতি ও রাজনীতিবিদ দেশের রাজনীতির অংশ আর তার উপরে যখন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান একটি দেশের অন্যতম প্রধান দলের, শাসক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তখন তো আর প্রশ্নই ওঠে না। তিনি নিঃসন্দেহে জাতীয় নেতা।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কামরান ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সোমবার ভোর রাতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তাঁর অকাল মৃত্যুতে দেশ একজন প্রকৃত, জনদরদী, ত্যাগী, জনপ্রিয় নেতাকে হারালো। তাঁর শূণ্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। এই মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই আর প্রার্থনা করি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য। আজ সকালে শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহর কাছ থেকে পাওয়া টেলিফোনে এই দুঃসংবাদ পেয়ে এই প্রিয়জনের বিদায়ে অনেকটা বাকহারা হয়ে যাই। দুপুরে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দুচারটি কথা লিখতে বসি। কলম ধীর গতিতে চলে। বারবারই মনে পড়ে যায় অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী, নিরহংকারী এই নিকটজনকে।

আমাদের দেশে মৌলিক রাজনীতি যেভাবে ফুরিয়ে যাচ্ছে একইভাবে মৌলিক রাজনীতিবিদ বা কেরিয়ার পলিটিশিয়ানও দিনদিন কমে যাচ্ছেন। যত দিন যাচ্ছে রাজনীতির অঙ্গনে পদচারণা বাড়ছে ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা ও গৃহবধু। ৫০টি সংরক্ষিত আসনে মধ্যে তৃণমূল থেকে আসা মহিলাদের সংখ্যাও কম, মূল্যায়নও হচ্ছে তবে তাও কম। সেই জায়গায় বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের মতো নেতার গুরুত্ব আরও কিছুদিন পর টের পাওয়া যাবে। মৌলিক রাজনীতিবিদ যাঁরা আছেন তাঁরাও দিন দিন রাজনৈতিক সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছেন।

সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একটি অবিচ্ছেদ্য নাম ছিল বদর উদ্দিন আহমদ কামরান । তিনি ছিলেন তৃণমূল থেকে ওঠে আসা এক জননন্দিত নেতা। গণিত শাস্ত্রের এলগোরিদমের মতো তাঁর পর্যায়ক্রমিক উত্তরণ। সিলেটের প্রথম মেয়র। ছিলেন জননন্দিত। এই হিসেবেই পরিচিতি পান বেশি। আগের পরিচয়গুলোও কম উজ্জ্বল ছিল না।

তিনি সিলেট নগরীর ছড়ারপার এলাকার বাসিন্দা। প্রথম নির্বাচনে অংশ নেন ১৯৭৩ সালে। তৎকালীন সিলেট পৌরসভার ৩ নং তোপখানা ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল কামরানের পথচলা। সেই থেকেই সিলেট পৌরসভার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন, প্রায় তিন দশক সিলেট শহর ও পরবর্তীকালে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। টানা ১৫ বছর সিলেট পৌরসভার কমিশনার ছিলেন। মাঝখানে প্রবাসে থাকায় একবার নির্বাচন থেকে বিরত ছিলেন। ফিরে এসে ১৯৯৫ সালে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সিটি কর্পোরেশন ঘোষণার পর ২০০২ সালে ভারপ্রাপ্ত মেয়র এবং ২০০৩ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে কারাগারে থেকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেন । সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীর চেয়ে প্রায় ৮৫ হাজার ভোট বেশি পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে প্রায় ৩৫ হাজর ভোটে পরাজিত হয়ে যান। ২০১৮ সালের সিটি নির্বাচন ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি তিনি। ২০১৩ ও ২০১৮ সালে তাঁর পরাজয় নিয়ে নানামূখী, বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ, আলোচনা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। যত কূট, তত সফল। তিনি কূট কম ছিলেন, তাই ভোগান্তিও ছিল অবধারিত।

২০০৪ সালের ৭ আগস্ট সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর তালতলাস্থ গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। অনেকের সাথে সেদিন তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইব্রাহিম মারা যান। সেই দুর্বিষহ স্মৃতি মনে করে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তাঁর স্মৃতিচারণ ছিল হৃদয়বিদারক। চোখের জল ফেলে কান্নায় ভেঙে পড়তেন কামরান। স্থানীয় রাজনীতি ও স্থানীয় পর্যায়ে কেন্দ্রের কৌশলগত ছলাকলায় তিনি কখনও অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সিলেট মহানগরের সভাপতির দায়িত্ব হারান। মূল্যায়নও হয়েছে। সর্বশেষ দুটি কাউন্সিলে কামরান আওয়ামী় লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও দলের প্রয়োজনে পুরো সিলেট বিভাগ চষে বেড়িয়েছেন কামরান। প্রত্যেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের পক্ষে সরব ছিলেন তিনি। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায়ও নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে সবসময় প্রচার চালিয়েছেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। বক্তা হিসেবে, সংগঠক হিসেবে তাঁর যে দক্ষতা ছিল তার অনেক কদর ছিল সর্বত্র সবসময়।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, সদা হাস্যজ্জ্বল, জনদরদী, জনবান্ধব নেতা ছিলেন। পৌরসভার চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র থাকাকালীন তিনি শত শত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। সেখানে অনেক বড় ক্যানভাসের অনুষ্ঠান ছিল ঠিক একইভাবে ছিল রেস্তোরা বা টেইলরিং এর উদ্ধোধনও। অনেকেই বলতেন পৌরসভার চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের পক্ষে এতো ছোট মান ও মাত্রার অনুষ্ঠানে তাঁর যাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু তিনি জানতেন তিনি জনগণের নেতা। কোনও কোনও ব্যবসায়ী সৎভাবে উপার্জনের জন্য রেস্তোরা বা টেইলরিং খুললে তিনি তাঁদের উৎসাহিত দিতেন। আর এজন্যই যেতেন। অহং বোধটা ছিল না তাঁর।

সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়রের মেয়াদকালে বৈরী বিএনপি সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেনি বা কম করেছে। মানমর্যাদাও কম দিয়েছে। ওই মেয়াদে সরকার স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে মেয়রের সমকক্ষ বা উপরে রাখতেন। তা উচিৎ ছিল না । বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার ভিন্ন দলের মেয়রকেও প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন । এই প্রতিকূল অবস্থায়ও তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। যখন মেয়র ছিলেন না, তখনও সমভাবে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন, ছিলেন সম্মানিত।

আমার সাথে মাননীয় নগরপিতা জনাব বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের পরিচয় দীর্ঘদিনের, পৌরসভার কমিশনার থাকার সময় থেকে। যখনই পেতেন পুরো পরিবারের কুশল জিজ্ঞেস করতেন। তাঁর হাসির নাম দিয়েছিলাম, ‘মিলিয়ন ডলার স্মাইল’। আমার বন্ধুবান্ধরা বলেছেন যে ঠিকই তাই ছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে দামটা কমই ধরেছি। তাঁর ছেলে আদনান আমার ছাত্র ছিল । ভাবী মিসেস আসমা কামরান ও আরেক ছেলে ডাঃ শিপলুর সাথে আমার অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক ছিল । মিসেস আসমা কামরান মহিলা আওয়ামী লীগের এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও নেত্রী। নিজের পরিচয় ও গুণের বাইরে জনাব বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের স্ত্রী হিসেবে দলসহ বিভিন্ন মহলে যেভাবে সম্মানিত ছিলেন, একইভাবে কোনও কোনও সময় জনাব কামরানের সাথে আনুপাতিক হারে ভোগান্তির শিকারও হয়েছেন।

২০০৩ সালে আমার পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একাডেমি অব টু আরস্ আয়োজিত গুণিজন সংবর্ধনায় তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন। তৎকালীন সাইফুর রহমান অডিটোরিয়ামে তাঁর আপত্তি ছিল। তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতাম । তাই প্রধান অতিথি ঠিক রেখে অনুষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন করি। অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয় গুলশান সেন্টারের উভয় তলায় (দর্শক বেশি হওয়াতে প্রজেক্টরের ব্যবস্থায়)। সিলেট বিভাগের দশ জন বিশিষ্ট গুণি ব্যক্তিত্বের সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলাম আমরা। অনেক জাকজমক করে, গুরুগম্ভীর পরিবেশে । বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত ব্যক্তিত্বরা ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম, বিশিষ্ট দানবীর শিল্পপতি মহিউস সুন্নত চৌধুরী, শিক্ষাবিদ ইয়াকুতি বেগম (অগ্রগামী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাক্তন স্বনামধন্য প্রধানশিক্ষিকা), বরণ্যে কূটনীতিবিদ জনাব সি.এম. শফি সামি, অপরাজেয় বাংলাখ্যাত ররণ্যে স্থপতি প্রফেসর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ, দেশবিদেশে খ্যাতিমান চিকিৎসক প্রফেসর ডাঃ এম. এ. খালেক, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী ও আজীবন দেশব্রতী সুহাসিনী দাস, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য প্রফেসর হাবিবুর রহমান, বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যতত্ত্ববিদ ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন (পরবর্তীকালে উপাচার্য) প্রফেসর ড. তপোধীর ভট্টাচার্য এবং বিশিষ্ট জীবনানন্দ গবেষক ড. স্বপ্না ভট্টাচার্য। এই সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও ছিল। এই আয়োজনের অনেক প্রশংসা করেছিলেন মাননীয় নগরপিতা। যখনই তাঁর সাথে দেখা হতো ওই অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টানতেন আর সংবর্ধিত ব্যক্তিত্বদের অসাধারণ প্রতিভা ও গুণের কথা বলতেন। এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তাঁর সাথে গুণি ব্যক্তিত্বদের অনেক ছবি আজ শুধুই স্মৃতি । আমার সাথেও তাঁর কয়েকটি ছবি সারাজীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে।

জনাব বদর উদ্দিন আহমদ কামরান অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ভাবনার অধিকারী ছিলেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কত লোক তাঁর সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছে তার শেষ নেই।

মিষ্টভাষী কামরান সবার সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহারের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার অনন্য নজির গড়ে তুলেছিলেন যা সিলেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। নিজের দলের বাইরে, আদর্শের বাইরের লোকজনের কাছে, নেতাকর্মীর কাছেও সহনীয় ছিলেন, ছিল তাঁদের সাথে সুসম্পর্ক। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাঁকে স্নেহ করতেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি জননেতা কামরানকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমরা মনে করি, স্বীয় কর্মের মাধ্যমে জননেতা কামরান গণমানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

মিহিরকান্তি চৌধুরী: লেখক, গবেষক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

এ বিভাগের আরো সংবাদ