উঠছে লকডাউন, বাড়ছে সংক্রমণ

অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে ইউরোপ-এশিয়ার অনেক দেশ শর্তসাপেক্ষে চলমান লকডাউন শিথিল করতে শুরু করেছে। আর মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। সে কারণে বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। ফলে লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার বিপরীতে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

২৪ মার্চ থেকে টানা লকডাউনে রয়েছে ভারত। শুরুর দিকে ভারতজুড়ে লকডাউন কঠোরভাবে মানা হলেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। মানুষকে ঘরে আটকে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ১৭ মে পর্যন্ত দেশটিতে লকডাউন চলার কথা। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি বাঁচাতে দেশটির সরকারও চাইছে চলমান লকডাউন ধাপে ধাপে শিথিল করতে। এর অংশ হিসেবে আজ থেকে ভারতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে যাত্রীবাহী রেল চালু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে নয়াদিল্লি থেকে প্রতিদিন ১৫ জোড়া ট্রেন চলবে।

যখন কেন্দ্র সরকার রেলসেবা চালুর অপেক্ষায় রয়েছে, ঠিক তখনই কভিড-১৯ সংক্রমণে নতুন রেকর্ড গড়েছে ভারত। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গতকাল একদিনেই নতুন করে ৪ হাজার ২১৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ভারতে একদিনে আক্রান্তের এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে ৬৭ হাজার ১৫২-এ উন্নীত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতে করোনায় মারা গেছেন ৯৭ জন। দেশটিতে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে মোট মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ২০৬ জন।

শুধু ভারত নয়, ইউরোপের দেশগুলোয়ও একই চিত্র দেখা গেছে। একদিকে লকডাউন শিথিল হচ্ছে, বিপরীতে বাড়ছে সংক্রমণ। গতকাল থেকে জার্মানিতে কিছু কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কারখানা খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে শর্ত হলো ঘর থেকে বেরোনোর সময় অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। গণপরিবহন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। এর মধ্যেই জার্মানিতে গতকাল ৬৬৭ জনের কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি। দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজারে। গত ১৪ ঘণ্টায় ২৬ জনসহ মারা গেছেন ৭ হাজার ৫৮০ জন।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে শুরু থেকে কঠোর লকডাউন মেনে চলেছে ফ্রান্স। তবে গতকাল থেকে দেশটিতে আট সপ্তাহ পর কিছু দোকান, কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে যখন ফরাসিরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার অনুমতি পেল, ঠিক তখনই দেশটিতে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০৯ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণের তথ্য দিয়েছে ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯৪-এ। দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টার ৭০ জনসহ মোট মারা গেছেন ২৬ হাজার ৩৮৩ জন।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সোমবার এক ভাষণে ধাপে ধাপে লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। জনগণকে বাড়িতে তৈরি কাপড়ের মাস্ক পরা ও গণপরিবহন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কারখানা পর্যায়ক্রমে খুলে দেয়া হবে। যদিও জনসনের এ পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা। বরিস জনসন যখন এ পরিকল্পনার কথা জানান, তার পর পরই যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে ৩ হাজার ৯২৪ জনের শরীরে নতুন করে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৩২৭-এ। দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩২ হাজার ১৪০ জন। যুক্তরাষ্ট্রের পর দেশটিতে সবচেয়ে বেশি কভিড-১৯ রোগী মারা গেছেন।

নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর সূচনা হয়েছিল চীনের উহান শহরে। তবে কঠোর লকডাউনের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণ কমিয়ে আনে উহান। টানা লকডাউন শেষে এপ্রিলের শুরুতে সংক্রমণ শূন্যে নেমে আসায় লকডাউন পুরোপুরি তুলে নেয়া হয়। এবার এক মাসের মাথায় উহানে ফের করোনা সংক্রমণের খবর মিলেছে। শহরের একটি আবাসনের পাঁচজনের শরীরে নতুন করে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চীনে নভেল করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় সংক্রমণের আশঙ্কা সামনে এসেছে।

চীন থেকে ভারত, এমনকি ইউরোপেও করোনা সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই এ পরিস্থিতিতে চলমান লকডাউন শিথিল করে সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার অনুমতি দেয়াটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন অনেকেই। তাদের মতে, অর্থনীতি রক্ষার কথা বলে মানুষের জীবন বাজি রাখার খেলায় নামতে যাচ্ছে করোনা আক্রান্ত এসব দেশের সরকারকে।

সূত্র : এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসি।

এ বিভাগের আরো সংবাদ