বড়লেখায় সরকারি চাল উদ্ধার: রহস্যের জট খুলছে না

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার এক দিনমজুরের বাড়ি থেকে গত ১০ এপ্রিল উদ্ধার করা হয় আট বস্তা চাল। এ ঘটনায় উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের ভাটাউচি গ্রামের দিনমজুর আব্দুস শুক্কুরের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়। তবে ওই দিনমজুরের বাড়িতে সরকারি চাল এলো কিভাবে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

যদিও অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় ডিলার মো. সুলেমানই দিনমজুর আব্দুস শুক্কুরের বাড়িতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালগুলো পাঠিয়েছিলেন।

গত ৯ এপ্রিল ঐ বাড়িতে ডিলার ৬ বস্তা চাল পাঠিয়েছিলেন। পরদিন ১০ এপ্রিল বিকেলে ওই বাড়ি থেকে ৩০ কেজি ওজনের আট বস্তা চাল উদ্ধার হয়।

এরপরদিন ১১ এপ্রিল একই এলাকার একটি জঙ্গল থেকে আরও ৪টি প্লাস্টিকের বস্তায় ১২২ কেজি চাল ও খাদ্য অধিদপ্তরের ৮টি খালি বস্তা উদ্ধার করা হয়। এই চাল উদ্ধারের ঘটনায় ঐ রাতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপখাদ্য পরিদর্শক প্রাণেশ লাল বিশ্বাস বাদী হয়ে বড়লেখা থানায় আব্দুস শুক্কুরকে আসামি করে একটি মামলা করেন।

দিনমজুরের বাড়ি থেকে উদ্ধারকৃত চাল স্থানীয় ডিলার পাঠিয়েছিলেন বলে স্থানীয় লোকজন জানালেও মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি।

এ বিষয়ে সিলেটটুডেতে গত ১২ এপ্রিল ‘বড়লেখায় চাল উদ্ধার, মামলায় ডিলারকে আসামি না করায় প্রশ্ন’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। যদিও শুরু থেকে ডিলার মো. সুলেমান এই চালের সাথে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে আসছেন।

তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ৯ এপ্রিল এলাকার বাসিন্দা রিকশাচালক জামালকে দিয়ে ৪ বস্তা ও কাদিরকে দিয়ে ২ বস্তা খাদ্যবান্ধবের চাল দিনমজুর শুক্কুরের বাড়িতে পাঠান ডিলার সুলেমান। এর আগের দিন শুক্কুরের কার্ডের ২ মাসের চাল পৌঁছানো হয়। একই দিন বিকেলে রিকশাচালক সেলিমের বাড়িতে খাদ্যবান্ধবের আরও ৪ বস্তা চাল পাঠান ডিলার। এদিন ৩জন রিকশা চালককে দিয়ে মোট ১০ বস্তা চাল শুক্কুর ও সেলিমের বাড়িতে পাঠান ডিলার। এর মধ্যে ১০ এপ্রিল শুক্কুরের বাড়ি থেকে ৩০ কেজি ওজনের আট বস্তা চালা উদ্ধার করা হয়। এই সময় তড়িঘড়ি করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার ইশাইয়ের ভাই আলখাইকে দিয়ে সেলিমের ঘরের বারান্দা থেকে চালগুলো সরিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা জয়নালের বাড়িতে রাখা হয়। পরদিন ১১ এপ্রিল এলাকার জঙ্গল থেকে ৪টি প্লাস্টিকের বস্তায় ১২২ কেজি চাল ও খাদ্য অধিদপ্তরের ৮টি খালি বস্তা উদ্ধার হয়।

এ নিয়ে কথা হয় দিনমজুর শুক্কুরের স্ত্রী হাজিরা বেগমের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমরাতো মাসে এক বস্তা পাই। গেছে আগন (অগ্রহায়ণ) মাসে টেকার (টাকার) অভাবে আনছি না। টাকা মিলাইয়া আনছি ২ বস্তা। ৯ এপ্রিল ১২টার সময় জামাল রিকশায় (রিকশা চালক জামাল) আনিয়া দিছে ৬বস্তা। আর ইশাই চৌকিদারের ভাই আলখাইয়ে আনিয়া দিছে ২ বস্তা। তারা কইছন (বলেছেন) সুলেমান ডিলারে পাঠাইছন (পাঠিয়েছেন)। ইগুলা (এগুলো) রাখার জন্য। পরে কার্ড বিতরণ করবা। আগর (আগের) মাসের চাউল রইছে। মাইনষর (মানুষের) কার্ডের চাউল দিছইন না। পরে চাউল বিতরণ করবা।’

দিনমজুর শুক্কুরের বাড়ি চাল নিয়ে যাওয়া রিকশা চালকদের একজন জামাল উদ্দিন বলেন, ‘৯ এপ্রিল সুলেমান ভাইয়ে আমারে ডাক দিছইন। রাস্তাত আছলাম। লগে লগে (সাথে সাথে) আমি গেছি (যাই)। এরপর শুক্কুর আলীর বাড়িতে ৪টা (বস্তা) চাউল নেওয়ার লাগি কইন। আমি শুক্কুর আলীর বাড়িতে নিয়ে যাই। তখন শুক্কুর আলী বাড়িত বওয়াত (বসা ছিলেন)। কামও (কাজও) থাকি আইছন। তখন আমি কইলাম চাচা তোমার চাউল আইছে ৪টা। তাইন (শুক্কুর) কইলা আমার চাউল তো আগে আইচ্ছে (চলে আসছে) বা। ইগুন (এগুলো) তো বেটার বা। এরপর চাউল তাইন ঘরো (ঘরে) নিয়া রাখছইন। পরে কইছন আমার চাউলর ভাড়া আমি দিলাইছি বা। ই-৪টার (এ চার বস্তার) ভাড়া বেটায় (সুলেমানে) দিবা (প্রদান করবেন)। পরবর্তীতে নদীর পাড় থাকি টিফ ধরিয়া বাজারে গেছি। গিয়া আরলে (বাজারে পৌঁছালে) সুলেমান ভাই আমারে ৬০টাকা ভাড়া দিছইন। আমি আমার খরচ করি বাড়িত আইছি। শুক্কুরবারে (শুক্রবারে) জুম্মার পরে হুনি (শোনেছি) চাউলটা ধরা খাইছে। বেটার বাড়িত (শুক্কুরের বাড়ি) চাউল অগুন বুলে (চালগুলো) অবৈধ। কিছু মাইনষে সমালোচনা করছইন। পুলিশ প্রশাসন ও আইছন। চাউল নিছইন। পরে কোন সিদ্ধান্ত নিছে কইতাম পাররাম না।’

ডিলার সুলেমানের কথামত রিকশাচালক সেলিম উদ্দিনের বাড়ি থেকে স্থানীয় বাসিন্দা জয়নালের বাড়িতে শুক্রবার বিকেলে ৪ বস্তা চাল রেখে আসার কথা নিশ্চিত করে রিকশা চালক আলখাই বলেন, ‘আমরা রিকশা চালাইয়া রোজগার করি। কেউ মালামাল নিয়ে যেতে বললে নিয়ে যাই। সেলিম ড্রাইভারের বাড়ি থেকে ৪ বস্তা চাউল শুক্রবার বিকেলে জয়নালের বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেন সুলেমান ভাই। আমি জয়নালের বাড়িতে দিয়ে আসি। ঐদিন শুক্কুরের বাড়িত সরকারি চাউল পাওয়ার খবর পাই সন্ধ্যায়। পরদিন জঙ্গল থেকে আরও চাউল উদ্ধার হয়। এ চালগুলো জায়নালের বাড়িতে রাখা চাল কি-না বলতে পারছি না।’

বিজ্ঞাপন

রিকশাচালক সেলিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। কথা হয় তার স্ত্রী হাছনা বেগমের সাথে। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ২টার দিকে সুলেমান ভাই আমরার রিকশা দিয়া চাউল পাঠাইছন রাখার লাগি। আবার শুক্রবারে বিকালে আলখাই ড্রাইভাররে দিয়া চাউল নেওয়াইছন (নিয়েছেন)।

অন্যদিকে এ ব্যাপারে জয়নালের বক্তব্য জানতে কয়েক দফায় বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এ জন্য তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে তার পার্শ্ববর্তী এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শুক্কুরের বাড়িতে সরকারি চাল উদ্ধারের খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে সেলিমের বাড়ি থেকে সরিয়ে জয়নালের বাড়িতে চাল পাঠান ডিলার। পরদিন ঐ এলাকায় আরও ১২২ কেজি সরকারি চাল উদ্ধার হয়।’

উদ্ধার করা চালের সাথে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই জানিয়ে ওই এলাকার ডিলার মো. সুলেমান বলেন, ‘এ চাল কার আমি বলতে পারবো না। এ চালের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার খাতা ও গুদামের সাথে সম্পর্ক। আমি বাইরে ছিলাম। চাবি আরেক ঘরে ছিল। সেখান থেকে নিয়ে খাতা ও স্টক দেখা হয়েছে। আমার সব ঠিক ছিল। পরে খাদ্য অফিসের নির্দেশে আমার চাল বিক্রি করেছি। এপ্রিল মাসে ২২ বস্তা চাল রয়েছে।’ উদ্ধার করা চালের বস্তা পাঠানো ও রিকশা চালকদের ভাড়া দেওয়ার সাথে তার নাম আসা প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রচার একজন করতে পারে। আমার খাতা ও মজুদের সাথে সম্পর্ক।’

এদিকে চাল উদ্ধারের ঘটনায় শুরু থেকে উপজেলা খাদ্য বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। শুক্কুরের বাড়িতে থেকে চাল উদ্ধারের দিন ঘটনাস্থলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ কোনো কর্মকর্তা যাননি। তিনিসহ খাদ্য অফিসের কোনো কর্মকর্তাই এদিন কর্মস্থলে না থাকায় ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় নিরাপত্তা প্রহরী মাছুম আহমকে। নিরাপত্তা প্রহরী স্থানীয় প্রশাসনকে অবগত না করে গোপনে ডিলারের কাছ থেকে স্টক রেজিস্টার নিয়ে চলে আসেন। কিন্তু এদিন থানায় কোনো মামলা হয়নি। পরদিন শনিবার বিকেলে স্থানীয় ডিলার সুলেমানের বাড়ির অদূরে মুজম্মিল আলীর বাড়ির পাশের জঙ্গলে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৪টি প্লাস্টিকের বস্তায় আরও ১২২ কেজি চাল ও খাদ্য অধিদপ্তরের ৮টি খালি বস্তা উদ্ধার করা হয়। পরে আলাদা আলাদা দুটি ঘটনায় মামলা হয় একটি।

এ মামলার বিষয়ে বাদী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপখাদ্য পরিদর্শক প্রাণেশ লাল বিশ্বাসের সাথে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই বিষয়ে কোথাও বক্তব্য না দেওয়ার জন্য বড়লেখা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের নিষেধ আছে।’

খাদ্যবান্ধবের চাল উদ্ধার ঘটনার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহবাজপুর তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রতন কুমার হালদার শুক্রবার (৮ মে) মুঠোফোনে বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলমান। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও চালের উৎস পাওয়া গেছে। মামলা তদন্তের প্রয়োজনে আপাতত প্রকাশ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে মামলার এজাহার নামীয় আসামি পলাতক। তাকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত আছে।’

এ বিভাগের আরো সংবাদ