করোনা দুর্যোগে বিনা বেতনে সেবা দিচ্ছেন অ্যাম্বুলেন্স চালক ক্ষিরোদ

করোনাভাইরাস সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও চালাচ্ছে তাণ্ডব। প্রতিনিয়ত মানুষ করোনা উপসর্গ নিয়ে ছুটছেন হাসপাতালের দিকে। তাছাড়া শরীর বেশি খারাপ হলে ক্লিনিক বা হাসপাতাল অথবা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন হয় অ্যাম্বুলেন্সের। ফোন করে হাসপাতালে জানালে জরুরী সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও একজন চালক। ঠিক তেমনি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স চালক ক্ষিরোদ কুমার হাজং।

একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে ২০১১ সালে অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে যোগদান করলেও এখন তার জীবন চলে অনিয়মিত সম্মানিতে। কারণ প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে উপজেলা পরিষদের সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে তাকেই রেখে দেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনিও অন্য কোথাও না গিয়ে রয়ে গিয়েছেন নিজ জন্মস্থানে।

টানা দুইবছর বিনা বেতনে চালিয়েছেন অ্যাম্বুলেন্স। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে তার জীবন চলছে কোন রকমে। ঠিকমতো সম্মানী পান না গেলো ১ বছর হবে। পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে থাকার চাইতে একটু ভয়েই থাকেন করোনা পরিস্থিতির সম্মুখসারির এ যোদ্ধা।

জানা যায়, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভপুর উপজেলা ৫০ শয্যা হাসপাতালে ২০১১ সালে এমএনএইচআই এর একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে যোগদান করেন ক্ষিরোদ। ২০১১-২০১৬ সাল পর্যন্ত ২২০০০ টাকা বেতনে চাকরি করেছেন অ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে পরবর্তীতে প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি রয়ে যান বিশ্বম্ভরপুরেই। কারণ ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার এবং বাবা ভিটা এখানেই। পরবর্তীতে ২০১৭-১৮ সালে বিনা সম্মানীতে কাজ করেছেন দুইবছর। মানুষদের নিয়ে আসলে খুশি হলে যা দেওয়া হতো তাই খুশি হয়ে নিতেন ক্ষিরোদ।

পরবর্তীতে উপজেলা পরিষদের মিটিংয়ে রেজুলেশনের মাধ্যমে উপজেলাবাসীর সেবা দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেওয়া ক্ষিরোদকে। বেতন অর্ধেকের থেকেও কমে যায় তার। সে সময় সিদ্ধান্ত হয় নিয়মানুযায়ী উপজেলার ৭ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা ১০০০ হাজার করে এবং উপজেলার পরিষদের চেয়ারম্যান ২০০০ টাকা করে দেওয়ার কিন্তু বর্তমানে সেটিও অনিয়মিত। কখনো মন চাইলে তাদের টাকা দেন কখনো টাকা দেওয়াই হয় না।

ক্ষিরোদ জানান, তার জীবনের প্রথমে একজন সেনা সদস্যের কাছ থেকে গাড়ি চালানো শিখেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে মার্কেনটাইন ব্যাংকের গাড়ি চালক হিসেবে কাজ করেছেন কয়েক বছর। পরবর্তীতে ওই এমএনএইচআই প্রজেক্টের সাথে পরিচয় হয়ে একজন সেনাবাহিনীর লেফট্যান্টন জেনারেলের গাড়ি চালিয়েছেন অনেক বছর। বর্তমানে করোনা উপসর্গ রোগী নিয়ে আসতে বা নমুনা পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয় উপজেলার একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি। যার কারণে ক্ষিরোদেরও সেখানে আসা যাওয়া করতে হয় প্রতিনিয়ত। একেতো বেতন অনিয়মিত অন্যদিকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা সেই ক্ষিরোদের একটিই দাবি তার চাকুরি সরকারিকরণ।

অ্যাম্বুলেন্স চালক ক্ষিরোদ কুমার হাজং এর সাথে এই প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি জানান, আমার কোন স্বার্থ নাই শুধু দুঃখ চাকরিটা সরকারি হচ্ছে না। যদি সরকারি হয়ে যায় তাহলে ছেলে-মেয়ে মা বউ নিয়ে সুন্দরভাবে জীবনটা কাটাতে পারবো। ছেলে রোজ বায়না ধরে ওকে সাইকেল কিনে দেওয়ার জন্য তাকেও সান্ত্বনা দেই দিচ্ছি দিবো বলে। কিভাবে দিবো বেতনইতো ঠিকমতো পাই না। ইউএনও ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা খুশি হয়ে মাঝে মধ্যে যা দেন তা দিয়েই চলতে হয়, মাস্টার রোলে চাকরী হয়েও সেটার টাকাও ঠিকমতো পাই না। তাছাড়া উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের পর থেকেতো কেউ দিতেও চায় না।

তিনি আরও বলেন, উপজেলার পরিষদের মাধ্যমে সকলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমার চাকরী হওয়ার উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন আছে তারা প্রত্যেকে আমাকে ১ হাজার করে এবং উপজেলা চেয়ারম্যান ২ হাজার টাকা করে সম্মানী দেওয়ার কথা থাকলেও তারা সেটা করছেন না। অনেকের কাছে চাইতে গেলে বলেন দিয়ে দিবো। পরিবারের খেয়াল রাখার জন্য বাবা কিছু জমি আছে সেখানে বোরো ধানের চাষাবাদ করি এবং একটি ছোটখাটো বাঁশের বাগান আছে। কিন্তু ফসল ঘরে উঠলে কয়েকটা দিন ভালো যাবে পরবর্তীতে ওই ঋণ ধার করে চলতে হয়। ইউএনও স্যার ও আরএমও স্যার আমারে হাত খরচের টাকাটা দিয়ে দেন কারণ তারা আমাকে আদর করেন। কিন্তু চাকরিটা যদি সরকারি হয়ে যেতো তাহলে এমনটা হতো না।

ক্ষিরোদ কুমার বলেন, আমার জীবনে আমি কখনো কোন জরুরী রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য ফোন আসলে কেটে দেই নাই। যখনই ফোন পেয়েছি সেখানে দ্রুততার সাথে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। আমি সৎভাবে আমার কাজ পালন করেছি, কারণ রোগীদের সেবা দেওয়াই আমাদের ধর্ম। আমি আমার কাজকে অনেক ভালোবাসি বলেই অনেক টাকার অফার পেয়েও যায়নি। রোগী নিয়ে আসলে তারাও খুশি হয়ে আমাকে ১-২ শত টাকা দেন এটাও আমার ঘরে খাবার আসে।

বর্তমানে সংসার চলছে কিভাবে চলছে জানতে চাইলে বলেন, চলছে সৃষ্টিকর্তার কৃপায়। করোনার মধ্যে যে বিভিন্ন জায়গায় যাই একটু ভয়েই থাকি। কারণ দিনশেষে আমিতো ঘরেই ফিরবো আমার কারণে যেনো আমার পরিবারের কিছু না হয় সেই প্রার্থনাই করি। সংসার চলতেছে কোন রকমের আমার স্ত্রী রস্মীতা দেবী হাজং সেও কিছুটা হাতের কাজ জানে সেলাই করে ২০০-৩০০ টাকা পায় এ নিয়ে আমাদের জীবন চলছে।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ জানান, এম্বুলেন্সের চালকের পদ শূন্য থাকায় টেম্পোরারি হিসেবে ক্ষিরোদ হাজং কাজ করছে। সে সৎ, নিবেদিত ও কর্তব্যনিষ্ঠ একজন কর্মী। বর্তমান সংকটে সে নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সংক্রমণের ভীতি থাকা সত্ত্বেও সে সম্মুখসারির একজন হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছে। এলাকার লোকজন তার কাজে সন্তুষ্ট।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সফর উদ্দিন বলেন, হাজং অত্যন্ত ভালো ছেলে। তার সাথে আমার এখনো তেমন একটি পরিচয় হয়নি। তাছাড়া তার যে সম্মানীর কথাটি বলেছে সেটি আমাকেও কেউ এখনো জানায় নাই। আমি বিষয়টি জেনে তারপর ব্যবস্থা নিবো।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীর বিশ্বাস বলেন, ক্ষিরোদ কুমার আমাদের উপজেলার একজন সন্তান। সে অত্যন্ত সৎভাবে কাজ করে, জরুরী রোগী নিয়ে আসার কাজে সে কখনো না বলে না। তার আচার আচরণ ব্যবহার সবদিক দিয়ে সে একজন ভালো মানুষ। আমিও তাকে অনেক পছন্দ করি। করোনা পরিস্থিতিতেও সে সাহসের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ