রাজাকারের তালিকা সংশোধন না প্রত্যাহার!

রাজাকারের তালিকায় গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসায় সর্বত্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন স্থানে এর প্রতিবাদে পালিত হয়েছে কর্মসূচি। তালিকা পোড়ানো হয়েছে বরিশালে। রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নাম আসার ঘটনাকে কেউ কেউ ষড়যন্ত্র বলেও মনে করছেন।

এই তালিকা সংশোধন কিংবা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। একই সঙ্গে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসার ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেছেন, বেশি ভুল থাকলে প্রয়োজনে তালিকা প্রত্যাহার বা সংশোধন করা হবে।

স্বাধীনতার চার যুগ পর ৪৯তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে গত ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের তালিকা প্রকাশ করে। সেদিন সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ করা নথি পর্যালোচনা এই তালিকা করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরও তালিকা করা হবে।

রাজাকারের তালিকা প্রকাশের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়ন হলেও তা পুরোপুরি সাধুবাদ পায়নি। বরং সেখানে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, উপ-কমান্ডার, ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম থাকায় তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ হয়।

ঘৃণিত রাজাকার তালিকায় এমন ভুলকে সহজভাবে নিচ্ছেন না বিশিষ্টজনরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাভাবে এর সমালোচনা করছেন শ্রেণিনির্বিশেষে সবাই।

স্বাধীনতার পক্ষের বিশিষ্টজনরা রাজাকারের এই তালিকা প্রস্তুতের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এ ধরনের তালিকা প্রকাশ করতে হলে যে ধরনের তথ্য অনুসন্ধান, যাচাই-বাছাই প্রয়োজন, তা করা হয়নি বলে মনে হয়। ফলে এত বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো। এখন অবিলম্বে একটা শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন।’

রাজাকারের তালিকায় বিশিষ্টজনের নাম থাকার ঘটনাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ কেন্দ্রীয় কমিটি অবিলম্বে তালিকা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে।

তালিকা সংশোধন করা হবে জানালেও ভুলের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায় অস্বীকার করেন মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মল হক। মঙ্গলবার দুপুরে তিনি বলেছেন, ‘এই তালিকা ১৯৭১ সালের করা। আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংগ্রহ করেছি। এটা এডিট না করে দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন যেভাবে এসেছে, সেটা প্রকাশ করেছি।’

কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুরনো নথির সঙ্গে অনেকের বিষয়ে নোট দেয়া ছিল, সেটি আমলে নিলে এত বড় ভুল হতো না।

দালাল আইনে যাদের নামে মামলা হয়েছিল সে অনুযায়ী রাজাকারের তালিকা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ জন্য অসংগতি সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তালিকার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি নোটও দেয়া হয়েছিল। সেটা আমলে নেয়া হয়নি। নোট অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করলে সমস্যা কেটে যাবে।’

রাজাকার তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, ‘ব্যাপকভাবে অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রকাশিত তালিকা প্রত্যাহার করা হবে। আর ‘দুই-এক শ’ নামে ভুল হলে সংশোধন করা হবে।’

পরে বিকালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই তালিকায় স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া কারও নাম ভুল করে এলে তদন্ত করে তা বাদ দেয়া হবে।

বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ

রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম থাকার প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও সংবাদ সম্মেলন হয়েছে রাজশাহী, বগুড়া, ঝালকাঠি, বরগুনা ও বরিশালে।

রাজশাহী জেলার তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপুর নাম আসায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। তিনি নিজেও এই ঘটনায় বিস্মিত ও মর্মাহত হয়েছেন। কীভাবে এই তালিকার তার নাম এসেছে সে উৎস খোঁজার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি অবাক হয়েছেন তার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম ও মহসিনের নাম তালিকায় আসায়।

এই ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করায় ক্ষোভপ্রকাশ করে বিতর্কিত এ তালিকা তৈরিতে জড়িতদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা।

এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন বলেন, ‘এই তালিকা কেবল আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জাতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’

বগুড়ার তালিকায় ১৮ নম্বরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি কছিম উদ্দিন আহম্মেদের নাম এসেছে। কছিম উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। ভুল তালিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ সেখানকার মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত তালিকা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।

বরগুনার পাথরঘাটা মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মজিবুল হকের নাম রাজাকারের তালিকায় আসায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

এদিকে রাজাকারের তালিকায় ঝালকাঠি জেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক জেলা কমান্ডার প্রয়াত শামসুল আলম ওরফে সামশুর নাম আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার পরিবারসহ স্থানীয়রা।

সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে বরিশালের ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী ও তার মা শহীদজায়া উষা রানী চক্রবর্তীর নাম স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় আসায়। তপন কুমারের বাবা সুধীর কুমার মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করায় পাকিস্তান বাহিনী তাকে হত্যা করে। সেখানে গতকাল রাজাকার তালিকায় আগুন ধরিয়ে প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ। এ সময় তারা পুনরায় তালিকা প্রকাশের দাবি জানায়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ