ওই গোধূলি যেভাবে এসেছিল

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর গ্রীনিচমান সময় বিকেল ৫টা ১ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে। এটি ছিল ১-১-১৯৭১-এ সূচনা হওয়া নাটকের শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য। সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নবীন প্রজন্মের অবহিত হওয়া তৎপর্যপূর্ণ হবে। ১ মার্চ ছিল ঝকঝকে নীল আকাশ আর রৌদ্রকরোজ্জ্বল।

পূর্ব পাকিস্তানে কর্মজীবন আরম্ভ হয়েছিল ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল,’ ‘আকাশে সোনার রবি পুব দিকে উঠে’ এবং ‘শিশুগণ দাও মন নিজ নিজ পাঠে’র দৃশ্য ও শ্রুতি দিয়ে। মধ্যাহ্নের কিছু আগে রেডিও পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মো. ইয়াহিয়া খানের বরাতে (স্বকন্ঠে নয়) এক বিবৃতিতে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার কথা বলা হলে সারা পূর্ব পাকিস্তান ক্ষোভ ও হতাশায় ফেটে পড়ে। সব কর্মস্থল থেকে মানুষ রাস্তায় নেমে এসে স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে।

এর দুদিন আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গভর্নর ভবনে (বর্তমানে মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাসভবন) চায়ের নিমন্ত্রণ জানান গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল আহসান (ডেকান) ও পূর্ব পাকিস্তানের উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা মো. ইয়াকুব খান (রামপুরের নবাব)। দুজন শেখ মুজিবকে এই অধিবেশন স্থগিত করে আগাম সিদ্ধান্তের কথা অবহিত করেছিলেন। সংক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে শেখ মুজিব হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের এক সভা ডাকেন। তাতে দলীয় কর্মসূচি স্থির হয়। প্রদেশের প্রত্যেকটি শহরে ইয়াহিয়াবিরোধী বিক্ষোভ হতে থাকে। পুলিশ ও বিচার বিভাগ অকার্যকর করে দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসব স্থানে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে।

সান্ধ্য আইন জারি করে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা চলতে থাকে। ৩ মার্চ ইয়াহিয়া মন্ত্রিসভার সব বেসামরিক সদস্যকে বিদায় দেয়া হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের আহসান ও ইয়াকুবকে বরখাস্ত করা হয়। এরা দুজন বলপ্রয়োগ না করে বরং পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।

৭ মার্চ রেসকোর্সে শেখ মুজিব বেলা ৩টা ১ মিনিটে এক জনসভায় ভাষণে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ দেশের মানুষের ট্যাক্সের অর্থ দিয়ে যে অস্ত্র কেনা হয় বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য। রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দিব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ (উদ্ধৃতি ক্রমানুসারে নয়)। সভাস্থলের বাইরে পূর্ব পাকিস্তানের ১৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা (লায়ালপুর) ৩ কোম্পানি সৈন্য নিয়ে অপেক্ষমাণ ছিলেন।

মুজিব একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ফেললে খাদিম আশপাশের সব কিছু ধ্বংস করে দিতেন। পরদিন পশ্চিম পাকিস্তানের ওয়াহ সেনানিবাস থেকে লে. জেনারেল টিক্কা খান, কোর কমান্ডার, ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন গভর্নরের পদে। প্রধান বিচারপতি কালিয়াকৗরের বি. এ. সিদ্দিকী নতুন গভর্নরকে শপথ না দেবার দুঃসাহস দেখিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ৮ মার্চ থেকে সারা প্রদেশে পাকিস্তান সরকার অচল হয়ে পড়ে এবং শেখ মুজিবের মুখের নির্দেশে চলতে থাকে। সেনানিবাস ও গভর্নর হাউস ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানি পতাকা দেখা যায়নি।

অবসরপ্রাপ্ত সকল সরকারি চাকুরেরা শেখ মুজিবের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। পল্টন ময়দানে প্রাক্তন পুলিশ, আনসার, সশস্ত্র বাহিনী ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে আরম্ভ করেন। ১০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড ভিয়েতনাম হত্যাকাণ্ডের একজন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে ঢাকা এসে টিক্কা খানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানে একটি গণহত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আই এস আই প্রধান লে. জেনারেল মু. উমর (আম্বালা) তাদেরকে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেন।

পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক বিষয়ক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী (রোহটাক)ও এই সভায় যোগদান করেন। পাক সেনাবাহিনীর অস্ত্রের ভীতিজাগানিয়া পরিবেশের মধ্যেও বাঙালিরা সংগঠিত হয়ে সাহসী ভ‚মিকা পালন করতে থাকেন এবং ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ জাতীয় স্লোগানে প্রদেশকে মুখরিত করতে থাকেন। এই অবস্থায় ইয়াহিয়া শেখ মুজিবকে এই মর্মে খবর দেন যে, তিনি ঢাকায় এসে তার সঙ্গে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আলোচনা করবেন।

১৮ মার্চ তিনি ঢাকায় আসেন। টিক্কা খান তাকে তেজগাঁও (বর্তমান পিএসসির পরিত্যক্ত ভবন) বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। ইয়াহিয়ার সঙ্গে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন এম এম আহমদ, বিচারপতি কর্নেলিয়াস, এ কে ব্রোহী, লে. কর্নেল মাসুদ (বাঙালি)। পরদিন জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আগমন করলে শেখ মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা আরম্ভ হয়। মিন্টো রোডে (বর্তমানে ফরেন সার্ভিস একাডেমি ভবনে) পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ এবং কেন্দ্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে এই আলোচনা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিমা মহলের দীর্ঘদিনের শোষণ বন্ধের লক্ষে শেখ মুজিব প্রতিরক্ষা ছাড়া প্রায় সব বিষয় অর্থাৎ কর আদায়, পররাষ্ট্র চুক্তি, আধা-সামারিক বাহিনী ইত্যাদি বুনিয়াদী বিষয়গুলোর ক্ষমতা প্রদেশের হাতে ছেড়ে দেয়ার কথা বলেন।

ইয়াহিয়া এক পর্যায়ে বলেন, এতো দেখছি এক কনফেডারেশনের ব্যবস্থা। তবে জাতির পিতা জিন্নাহ যেখানে এমন ব্যবস্থায় সম্মত ছিলেন, সেখানে আমি না করার কে? কিন্তু এতে শোষণ বন্ধ হয়ে যাবে বলে ভুট্টো ও এম এম আহমদ আপত্তি করেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উচ্চতম কর্তা জেনারেল মিঠঠা, হামিদ (ভুপাল), পিএসও লে. জেনারেল পীরজাদা ইয়াহিয়াকে চাপ দিতে থাকেন। এতে সম্মত না হয়ে বরং বলপ্রয়োগ করেন বাঙালিদের রুদ্ধ করে দিতে। ইয়াহিয়া খানও তখন বাইরে এসে বলতে থাকেন, শেখ মুজিব বেশি দাবি করছে এবং ভালো ব্যবহার করছে না। তবে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের বলতে থাকেন, অগ্রগতি না হলে আলোচনা করছি কেন?

এই দিনগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেশ কিছুসংখ্যক সশস্ত্র বাহিনীর ইউনিটকে বদলি করে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসা হয়। ২৪ মার্চও আলোচনা অব্যাহত থাকে। ২৫ তারিখে আলোচনা হবার কথা থাকলেও প্রেসিডেন্টের টিম উপস্থিত হননি। এদিন সকালে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে কর্নেল এসডি আহমদকে ঢাকায় এনে তার কমান্ডো ইউনিট সদস্যদের দিয়ে মুজিবের ৩২নং রোডের বাড়ি রেকি করা হয়। ইয়াহিয়া খান বিকালে সেনা মেসে চলে যান।

সেনাপ্রধান হামিদের সাথে পানাহার শেষে তিনি তাকে বলেন, Sort the bastards out well and proper. এরপর একটি ছদ্মবেশী গাড়িতে করে তেজগাঁও এয়ারপোর্ট থেকে করাচিগামী পিআইএ ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনী শুরু করে তাদের অপারেশন সার্চ লাইট নামের বাঙালি নিধন অভিযান। খাদিম হোসেন রাজা টিক্কার নির্দেশে এটি পরিচালনা করেন।

এদিকে আহমদের বাহিনী শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করতে যায় মেজর বেলালের নেতৃত্বে। এর ঠিক আগে শেখ মুজিব ১২টা ১ মিনিটে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একটি বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন।

পূর্ব পাকিস্তানের একটি ছাড়া আর সব সামরিক ইউনিটের অধিনায়ক ছিলেন পাকিস্তানি। বাঙালি কর্তাটি ছিলেন লে. কর্নেল রেজাউল জলিল, যশোর সেনানিবাসে। তিনি আত্মসসর্পণ করেন। ওদিকে খাদিমের পরিচালনায় ঢাকাসহ সারা দেশে ৩২, ১৮, ৪৮ পাঞ্জাব, ২০, ২২ ও ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স, ২০ বালুচ, ৪৩ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারী, ৪ ক্যাভালরি ও ২১ নং ব্যাটারি ইউনিট পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, নীলক্ষেত এবং ঢাকা সেনানিবাসের বাঙালিদের গণহত্যা শুরু করে।

ঢাকায় মূলত বেসামরিক জনতা এর শিকার হলেও চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে ৮ বেঙ্গল ও ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে ১৭০৪ জন সৈন্য হত্যা করে। এসবের নেতৃত্বে ছিলেন খাদিম ছাড়াও আনছারী, আতিফ মোহাম্মদ, মজিদ, ইকবাল শফি, জাহান জেব আবরার, রাজা সুলতান মাহমুদ, শেরওয়ানী, সেঘাল, জাভেদ, সিদ্দীক রাজা, মনজুর হোসাইন, মো. খান, আমির গুলিস্তান জানযুয়া, ইয়াকুব মালিকী, আলী কুলী খান, দুররানী, খিজির খান, বশীর, শওকত রিজভী নামে মেজর থেকে ব্রিগেডিয়ার পদবির সামরিক কর্তারা। হত্যা ছাড়াও নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের ভয়ে ১ কোটি মানুষ ক্রমে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়।

বিদেশি সরকারগুলো এক বিরাট অংশ ইয়াহিয়া খানকে আলোচনার মাধ্যমে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরামর্শ দেন। শেখ মুজিবকে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবের লায়ালপুর জেলা কারাগারে বন্দি করে রাষ্ট্রদোহের অপরাধে বিচার করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে। পাকিস্তান সরকার হত্যাকাণ্ডের কথা অস্বীকার করতে থাকলেও সংবাদমাধ্যমগুলো তা ফাঁস করে দিতে থাকে।

৫ আগস্ট ইয়াহিয়া সরকার এক শ্বেতপত্র প্রকাশ করে দাবি করে যে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। লক্ষ লক্ষ বাঙালি যারা ভারতে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন তাদেরকে দুষ্কৃতকারী আখ্যা দিয়ে এই শ্বেতপত্রে তাদেরকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় আনা হয়।

দুই.

করাচি পৌঁছে ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবকে দোষারোপ করে এক বেতার ভাষণ দেন। পদগর্ণী ও হ্যারল্ড উইলসদের মতো বিশ্বনেতারা ইয়াহিয়া খানকে শান্তি স্থাপনের কথা বলতে থাকেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনসহ বিশ্বনেতাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই শরণার্থী সমস্যা ভারতের জন্য এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা নির্যাতিত এবং এদেরকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করানো এ অঞ্চলে শান্তির জন্য প্রয়োজন। এতে কোনো সুফল মিসেস গান্ধী আনতে পারেননি। তবে ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মিসর তাকে সমর্থন দেয়। বাংলাদেশের এই সংগ্রামে বিশ্ব সমর্থন আদায়ের লক্ষে বিদেশে খুব ভালো পরিশ্রম করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। দেশের ভেতর সামান্য প্রশিক্ষণ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের এবং নিয়মিত সৈন্যদের হাতে ভারী অস্ত্রের অভাব থাকায় যুদ্ধে খুব অগ্রগতি সাধিত হয়নি। কোনো থানা বা মহকুমা মুক্ত করা তাদের পক্ষে সম্ভব না হলেও তারা দখলদার পাকবাহিনীর মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। বিশেষ করে কাদের সিদ্দিকী অন্য যেকোনো নিয়মিত সৈন্যের চেয়ে বড় ভ‚মিকা পালন করতে থাকেন। টিক্কা খানের কার্যকলাপে ইয়াহিয়া বিরক্ত হয়ে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে লে. জেনারেল আমীর আব্দুলল্লাহ খান নিয়াজীকে (মিয়াওয়ালী) পূর্ব পাকিস্তানের অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেন। এ মাসেই বাঙালি নেতা এবং আওয়ামী বিরোধী এম এন এ নুরুল আমীন ইয়াহিয়া খানকে বলেন, ‘আপনার ঢাকায় গিয়ে জনসভা করা উচিত। তাতে পরিস্থিতি ভালো হবে।’ বাংলায় কথা বলতে পারি না। আমি ওখানে গিয়ে কি করতে পারি বলে ইয়াহিয়া খান এটা এড়িয়ে যান। এদিন রাওয়ালাপিন্ডিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে দাবি করেন।

অপরদিকে লে. জেনারেল শের আলী বাজ ঢাকায় থেকে গোপনে বাঙালি নিধনের অগ্রগতি দেখেন এবং বলেন মাটি চাই, মানুষ নয়। কর্ণালে জন্মগ্রহণকারী এই সেনাধ্যক্ষ গণহত্যায় দক্ষ ছিলেন। আগের এক নির্দেশে প্রেসিডেন্ট হাউসে ঝাড়া মোছা ও আলোকসজ্জার কাজ চলছিল। তা আজ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। গণহত্যা পরিস্থিতি, শরণার্থী ও প্রায় ৪৫০ জন বাঙালি আইন প্রণেতার দেশত্যাগের ঘটনায় পাকিস্তান ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকে।

সেপ্টেম্বর মাসেই ইউএনএইচসিআর, শরণার্থীরা পূর্ব পাকিস্তান না ফিরে আসার কারণ হিসেবে পাক সৈন্যদের নৃশংসতাকে দায়ী করে বিবৃতি দেয়। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষে বিশ্ব দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মুসলিম বিশ্বের প্রায় সবাই বিপক্ষে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপ, ব্রিটেন, পশ্চিম ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া পক্ষে অবস্থান নেয়। নিয়াজী বলে বেড়াতে লাগলেন যে এই যুদ্ধ ভারতীয় হিন্দুদের চাপিয়ে দেয়া, মুক্তিফৌজ নামে কোনো কিছু নেই এবং তিনি প্রতিটি সৈন্যও প্রতিটি বুলেট শেষ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন।

ইতিমধ্যে অর্থাৎ আগস্ট মাস থেকে মেজর জেনারেল জামশেদের সহায়তায় বাঙালি ও বিহারী পাকপন্থি পুরুষদের নিয়ে আলশামস, আলবদর ও রাজাকার নামে তিনটি খুনি বাহিনী তৈরি হয়ে তাদের হাতে মুক্তিকামী বাঙালি নিহত হতে থাকেন। তারা বিশেষ করে সনাতনী সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যা ও তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা পুল, কালভার্ট, ট্রেন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দিয়ে পাকবাহিনীর চলাচলকে বিপর্যস্ত করে দিতে থাকেন।

২২ নভেম্বর রোজার ঈদের আগে নিয়াজী হুংকার দিয়ে বলেন যে এবারের ঈদের নামাজ পড়া হবে কলকাতার গড়ের মাঠে। তিনি অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরে পিন্ডির কাছে নতুন নতুন সেনা ইউনিট চেয়ে পাঠাতে থাকেন। কিন্তু তা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নিরাপত্তা নাজুক হয়ে উঠায় ইয়াহিয়া সেনাপ্রধান হামিদ ও অন্যান্য কর্তা চালাকি করে নিয়াজীকে শুধু সান্ত্বনা আর সাহস দিতে থাকেন। সীমান্ত চৌকিতে মুক্তিযোদ্ধার আক্রমণ বাড়তে থাকে। পাক সেনা ইউনিটগুলো সেনানিবাসকেন্দ্রিক হতে থাকে।

এর আগে উপমহাদেশের সামরিক উত্তেজনা পর্যবেক্ষণ করে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সেপ্টেম্বর মাসে এক সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানে তার পজিশন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে একটি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন, যাতে করে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো প্রয়োগ করে যুদ্ধবিরতি এনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়া যায়। তিনি ৩ ডিসেম্বর ৭১-এ তাই অতর্কিতে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত আম্বালা, লুধিয়ানা, পাঠানকোট, অমৃতসর, জলন্ধর বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ চালান। ভারত সরকার আত্মরক্ষার্থে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাক সৈন্য, বিমানবাহিনী ও নৌ-ঘাঁটিতে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। যুদ্ধ দুই সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ভেতর তো বটেই পশ্চিম পাকিস্তানেও পাকিস্তানিদের পরাজয় ঘটতে থাকে।

তারা সেখানে পাঞ্জাব-রাজস্থান সেক্টরে ৫৫০০ সৈন্যের প্রাণ এবং ৫৬০০ বর্গমাইল ভ‚মি হারায়। পাকিস্তানের নেতা ভুট্টো জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনলেও পোলান্ড ও সোভিয়েতের দক্ষ কূটনীতির ফলে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে কার্যকরভাবে এগিয়ে আসে না। ভারতীয় বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পূর্ব পাকিস্তানের পতন অবশ্যম্ভাবী দেখতে পেয়ে নিয়াজী ইয়াহিয়ার কাছে নির্দেশনা চান। তিনি উত্তরে প্রতারণাপূর্ণ কথা বলে সিদ্ধান্ত তারই উপর ছেড়ে দেন।

উল্লেখ্য, ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো সেক্টরই স্বাধীন হয়নি। কিন্তু ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর সম্পূর্ণভাবে হানাদারমুক্ত হয়। এতে ভারতীয় বাহিনীর ১৭৬৪ জন সৈন্য ও অফিসার শহীদ হন। ভারতীয় কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার (রাওয়ালপিন্ডি) নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ঢাকার কাছে এগিয়ে এসে নিয়াজীর আত্মসমর্পণের সময় বেঁধে দেয়। নিয়াজী ১৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিকেল ৫টা ১ মিনিটে অরোরার কাছে চরম অপমানজনকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। তার সাথে ৯৩ হাজার নানা শ্রেণির সৈন্য, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী, রেঞ্জার ও স্কাউট ছিল।

এদের মধ্যে ৭৪ জন বাঙালি সেনা ছিলেন যারা পাকবাহিনীর সঙ্গে থেকে স্বজাতির বিরুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধ করেছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন পরবর্তী পুলিশ প্রধান আশরাফুল হুদা। তিনি একটি ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। আর একজন পুলিশ কমিশনার মির্জা রফিকুল হুদা। তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার চট্টগ্রাম সফরের সময় তার বাহিনীকে দিয়ে গুলিবর্ষণ করিয়ে ব্যাপক ত্রাসের সৃষ্টি করেন এবং ফৌজদারী মামলার আসামি হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হন।

ঢাকায় আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে নিয়াজী ও অরোরা স্বাক্ষর করলেও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল জ্যাকব, ভাইস অ্যাডমিরাল কোহলী, এয়ার মার্শাল পি সি লাল, ব্রিগেডিয়ার ত্রিলোকনাথ, ব্রিগেডিয়ার বকর সিদ্দীকি প্রমুখ পাকিস্তানি ও ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তারা। মিসেস গান্ধী দিল্লির লোকসভায় ঘোষণা দেন যে, ভারতীয় সময় বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে এই আত্মসমর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সেনা ও নৌ-ঘাঁটিতে আত্মসমর্পণ করেন কমোডর মুজাফফর, ব্রিগেডিয়ার জিকরুল্লাহ, দুররানী, শওকত হায়াত, এয়ার কমোডর মাসুদ। এর আগে খাদিম পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হন। লে. কর্নেল আলী কুলি খান বার্মা হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে যান।

আমাদের জন্য পরম গৌরবের এবং পাকিস্তানিদের জন্য চরম অপমানকর এই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আসার কারণ খুব জটিল ছিল না। এগুলো হচ্ছে প্রথম থেকেই গণতন্ত্র চর্চা না করা। সশস্ত্র সার্ভিসগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাজনীতিবিদদের মনোযোগ না দেয়া। শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ৮ বছর কালক্ষেপণ করা। এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন না থাকায় পেশিশক্তি তথা সশস্ত্রবাহিনী ক্ষমতা দখলের সুযোগ পেয়ে যথেচ্ছ সম্পদ ভোগ দখল করতে থাকে। দু অঞ্চলের মধ্যে সম্পর্ক না হবার ফলে অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে এবং ভুট্টোর পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি। সেনা শাসনে পশ্চিম পাকিস্তান খুব বেশি উপকৃত হয়, কারণ বাহিনীসমূহে ৯০%ই ছিল পাঞ্জাবি, পাঠান ও বালুচ।

সামরিক স্থাপনার সিংহভাগ পশ্চিমে ছিল, বাজেটের ৬৬% প্রতিরক্ষায় ব্যয় হওয়ায় এবং তাতে পূর্ব পাকিস্তানের অংশগ্রহণ যৎসামান্য হওয়াতে বাঙালিরা সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তা বলপূর্বক দমন করতে গিয়ে সশস্ত্রবাহিনী ভুলে যায় যে, রাজনীতি ও জনসম্পৃক্ততা যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কলম যে তরবারির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী একথাও তারা ভুলে যায়। পাকিস্তান এনেছিলেন যে জিন্নাহ সাহেব এবং তাতে সশস্ত্রবাহিনীর কোনো অবদান ছিল না এ কথাও তারা বিস্মৃত হয়ে যায়।

রাষ্ট্র যে জনগণের এবং সশস্ত্রবাহিনী সরকারের আদেশ পালনে বাধ্য একটি সার্ভিস মাত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অমোঘ সূত্র তারা ভুলে যাবার চেষ্টা করলেও ইতিহাস তা তাদেরকে মনে করিয়ে দেয়। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ’৭১-এর মুক্তি সংগ্রামে পাঠান, বালুচ ও সিন্ধীরা সাধারণভাবে বাঙালিদের সমর্থন দেয়। পাঠান নেতা ওয়ালি খান, তার বাবা, স্ত্রী ও ন্যাপ দলীয় সাংসদগণ শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা না দেয়ার পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

সিন্ধুর জি এম সৌয়াদও একই কথা বলেন। বুগতি, বালুচদের সঙ্গে একই মনোভাব প্রকাশ করেন। তার সঙ্গে যোগ দেন সরদার আতাউল্লাহ মেঙ্গল এবং গাউস বকাস। পাঞ্জাব আওয়ামী লীগ সভাপতি মালিক সরফরাজ হামিদ ’৭১-এর মার্চে একই বিবৃতি দেন। এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ’৭১-এর আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাসভবনে বেগম শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করে বলেন যে, এই দুর্দিন থাকবে না। তখন সেখানে দন্ডায়মান পাঞ্জাব পুলিশ ও পাক সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিষয়টি সরকারের কাছে রিপোর্ট করেন। তবে বিশাল ব্যক্তিত্ব ও গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার এ নিয়ে আর এগোয়নি।

এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। পাঠান ব্যাটালিয়নের বেশ কিছু সৈন্য ও অফিসার অনেক স্থানে বলে এই বাঙালিদের দেখে ভালো মুসলমান বলে মনে হচ্ছে। এদেরকে আমরা গুলি করতে পারব না। পাঠান কিছু বেসামরিক মানুষ মুক্তিযোদ্ধা হিসেব আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে। আর পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন কিজিলবাশা দল ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। পাঞ্জাবি সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে কারারুদ্ধ হন।

মানুষের মধ্যে শ্রেণিভেদ থাকবেই। তবে প্রত্যেকের ন্যূনতম অধিকারও থাকবে। রাজনীতিবিদের কাজ হচ্ছে সেই সংজ্ঞা নির্ধারণ করা। ১৬ ডিসেম্বর সেই পুরোনো বাণী আবার প্রতিষ্ঠা করেছে। ’৭১-এর যুদ্ধবন্দি সিএসপি হাছান জহীর কর্নেল হাছানের বরাতে এই কথাটি উচ্চকিত করেছেন। শ্রেণিবিভক্ত সমাজ এবং সম্পদ ও সম্মানের সর্বোত্তম বণ্টনের ব্যবস্থা সম্বলিত রাজনীতিকে অস্বীকারকারী কোনো শাসন ব্যবস্থা যে টিকতে পারে না তা রাজনীতিবিদ, আইন প্রণেতা এবং সশস্ত্র বাহিনীকে অবশ্যই বুঝতে হবে।

১৬ ডিসেম্বর পূর্বাপর এই অমর বাণী বহন করে যাবে। আর দুর্বৃত্তদের সংঘ স্থায়ী হয় না এই দিবসের আর এক বাণী। হিটলার তার বাহিনীকে মহাবিপদের মধ্যে ফেলে পরিত্যাগ করেছেন। ইতিহাস ও পরিণতিবোধহীন ইয়াহিয়া-হামিদ-পীরজাদা-ভুট্টো চক্রও নিয়াজীকে পরিত্যাগ করেছেন। ৯ মাসে একবারও ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা দেখতে আসেননি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের আরো সংবাদ